মৃত্যু নিশ্চিত জেনে তওবা করতে চেয়েছিলেন মামুন

মৃত্যু যখন সনি্নকটে, তখন তওবা করার সময় চেয়েছিলেন মেজর আবদুল্লাহ আল মামুন। বলেছিলেন, মৃত্যুর আগে আমার সন্তানদের যেন একটু দেখতে দেওয়া হয়; কিন্তু তারা কোনো কথা না শুনে রাইফেলের বাঁট দিয়ে আঘাত করে। এতে তার মাথা ফেটে যায়। গুলি করার জন্য পিঠে অস্ত্র ঠেকায়। অসহায় হয়ে তখন মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেন। আর মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে থাকেন। পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যাযজ্ঞে ভাগ্যগুণে বেঁচে যাওয়া মেজর আবদুল্লাহ আল


মামুন এমন কথাই জানিয়েছেন আদালতকে। তিনি পিলখানা হত্যা মামলার ২২ নম্বর সাক্ষী হয়ে গতকাল আদালতে জবানবন্দি দেন। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ জহুরুল হক তার জবানবন্দি গ্রহণ করেন।
অপারেশন ডাল-ভাত কর্মসূচির সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মেজর মামুন বলেন, '২৫ ফেব্রুয়ারি আমি ছুটিতে ছিলাম। সকালে গুলি ও বিডিআর সদস্যদের দৌড়াদৌড়ি দেখে সিভিল ড্রেসে অফিসে যাই। দ্বিতীয় তলায় আলমারির পেছনে লুকিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সেনাসদর দফতরে যোগাযোগের চেষ্টা করি। র‌্যাবের এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ হয়।'
মেজর মামুন বলেন, 'বিদ্রোহীরা প্রতিটি ভবনে অস্ত্র ও গোলা-বারুদসহ অবস্থান নিয়েছে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে চাইলে ৩ নম্বর গেট বরাবর আরম্ভ করতে হবে এবং ফাইটিং ইন বিল্ডআপ এরিয়া ও যুদ্ধকৌশল গ্রহণ করতে হবে। রাত ১০টার দিকে বিডিআরের সব সদস্যকে অস্ত্র তুলে নিতে মাইকিং করা হয় এবং বলা হয়, মেজর মামুন কোথাও লুকিয়ে আছে। সেসব তথ্য ক্যান্টনমেন্টে জানিয়ে দিচ্ছে। রাত ২টার দিকে ৫-৬ বিদ্রোহী আমার রানার তাহেরকে সঙ্গে নিয়ে লুকিয়ে থাকা ঘরে প্রবেশ করে। আলমারির পেছন থেকে আমাকে খুঁজে বের করেই গুলি করতে উদ্যত হয়। করজোড়ে অনুনয় করে তাদের বলি, আমার শিশুসন্তান রয়েছে। তোমরা তাদের এতিম করে দিও না। কথা না শুনে তারা আমার চোখ বেঁধে ফেলে। রাইফেলের বাঁট দিয়ে আঘাত করতে থাকে। আমার মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে। তারা আমাকে দোতলা থেকে নামিয়ে গাছপালা আছে এমন জায়গা দিয়ে নিয়ে যায়। পিঠে অস্ত্রের নল ঠেকায় এক বিদ্রোহী। এ সময় দুনিয়া অন্ধকার হয়ে আসে। নিরুপায় হয়ে প্রস্তুতি নিই মৃত্যুর। অনুনয় করে বলতে থাকি, মৃত্যুর আগে যেন স্ত্রী-সন্তানের মুখ একটু দেখতে দেওয়া হয়। আমি কোনো অন্যায় করিনি। তবু যেন তওবা করার জন্য কিছুটা সময় দেওয়া হয়। আর উপুড় হয়ে মনপ্রাণ দিয়ে আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকি।
মেজর মামুন আদালতকে বলেন, যারা ধরে এনেছিল তাদের মধ্যে দু'জন ওই এলাকায় আমাকে গুলি করে হত্যা করার পক্ষে ছিল না। ওরা বলছিল, কমান্ডারের অর্ডার আছে, তাকে এখানে মারা যাবে না। ক্যান্টনমেন্টে কী কী তথ্য দেওয়া হয়েছে তা জানার পরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ছিনিয়ে নেওয়া মোবাইলের কললিস্ট দেখে যখন গুলি করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল, তখন আরেকজন বিদ্রোহী টেনেহিঁচড়ে ছোট একটি রুমে নিয়ে যায়। চোখ খোলার পর দেখি সেটি একটি কোয়ার্টার প্রিজন সেল। সেখানে সেনা অফিসারসহ অনেক নারী ও শিশু ছিল।

No comments

Powered by Blogger.