মাত্র ১০ ব্যাংকের কাছে ৭৬ ভাগ খেলাপি ঋণ by শেখ আবদুল্লাহ

দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট খেলাপি ঋণের সিংহভাগ রয়েছে মাত্র ১০টি ব্যাংকে। এই ১০টি ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্র মালিকানাধীন চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংক, চারটি বেসরকারি ব্যাংক ও দুটি বিশেষায়িত ব্যাংক। এতে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়ে পড়ছে। এগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক সবচেয়ে খারাপ ব্যাংক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের


প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১০ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে এই ১০টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৭ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা। যা মোট খেলাপি ঋণের ৭৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ। আর বাকি ২৩ দশমিক ৬১ শতাংশ খেলাপি ঋণ রয়েছে অপর ৩৭টি ব্যাংকে। অপরদিকে রাষ্ট্র মালিকাধীন চার বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং একটি বিশেষায়িত ব্যাংকের কাছে ব্যাংকিং খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৬৩ দশমিক ১০ শতাংশ বা ১৪ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা রয়েছে। তবে চলতি বছরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। চলতি ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে এ সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৭৩ কোটি টাকা। গত জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকা। এ হিসাবে তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬৮৯ কোটি টাকা। মূলত বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় সার্বিক পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে সামান্য। আর বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে তহবিল ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ প্রদান খেলাপী ঋণ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর কাছে বিপুল পরিমাণে খেলাপি ঋণ থাকার অন্যতম কারণ হলো, সত্তর ও আশির দশকে বাণিজ্যিক ভিত্তি বিবেচনা না করে এবং নির্দেশিত খাতে বিশাল অংকের ঋণ প্রদান। দুর্বল মূল্যায়ন, অপর্যাপ্ত তদারকি ও তত্ত্বাবধানের ফলে রাষ্ট্র্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত বিতরণকৃত এ ঋণের অধিকাংশ মন্দ ঋণে পর্যবসিত হয়েছিল। যার অধিকাংশ অংশ এসব ব্যাংকের ঋণ কাঠামোতে এখনও রয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংকগুলো অপর্যাপ্ত জামানতের কারণে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত মন্দ ঋণ অবলোপন করতে পারছে না। তবে সম্প্রতি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ আদায় ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়া জোরদারকরণের জন্য অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার পুনর্গঠন এবং অবলোপন কার্যক্রম গ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে খেলাপি বা মন্দ ঋণ আদায়ে কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ৪টি বাণিজ্যিক ব্যাংকে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ১৯৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। যা তাদের মোট ঋণের ১৪ দশমিক ১৭ শতাংশ। রাষ্ট্রীয় খাতের ৫টি বিশেষায়িত ব্যাংকে সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৮৭১ কোটি ১৩ লাখ টাকা, যা তাদের মোট ঋণের ২১ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পের গুণগত মান বিবেচনা না করা এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ দেওয়ায় ব্যাংকগুলোতে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া সম্প্রতি দেখা যায়, ব্যাংকগুলোর ভোগ সহায়ক খাতে বিতরণকৃত ঋণখেলাপি হচ্ছে। যে কারণে মোট খেলাপি ঋণ বাড়ছে। তিনি বলেন, এসব ঋণ আদায়ে কেন্দ্রীয় ও সরকারের পক্ষ থেকে নানা সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাজ কিছু হয়নি। ঋণ অবলোপন হচ্ছে, পুনঃতফসিল হচ্ছে, বেসরকারি কোম্পানির কাছে বিক্রির মাধ্যমে আদায় হচ্ছে তারপরও খেলাপি ঋণ কমছে না। এ জন্য ধরে নিতে হবে, ব্যাংকগুলোর ভেতরে কোথাও ঝামেলা আছে।

No comments

Powered by Blogger.