আরেক আলোকে-বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি ও প্রয়াত উপাচার্য বজলুল মুবিন by ইনাম আহমদ চৌধুরী

শিক্ষাব্রতী বজলু প্রায়ই বলত_ আমাদের শিক্ষাঙ্গনগুলো কেমন যেন বিদ্যাপীঠ না হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যেখানে থাকার কথা সত্য, সুন্দর এবং আলোকিত মনের মাঙ্গলিক দীপশিখা, সেখানে বিরাজ করছে হানাহানি, মারামারি, রাজনীতির সাংঘর্ষিক উপস্থিতি এবং নির্বিচার দলীয় আনুগত্য। শুধু ছাত্রমহলেই তা আজ সীমাবদ্ধ নয়, শিক্ষক সমাজেও রয়েছে এই পরম রাজনৈতিক ও দলীয় আনুগত্য সম্প্রতি খবরের কাগজে প্রকাশিত একটি সংবাদ বিশেষ করে নজরে


এলো। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত শিক্ষা বাস্তবায়ন করতে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস করেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকার। বিধানসভায় পাস হওয়া এ আইনে দুর্নীতি, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং কাজে ব্যর্থতার দায়ে উপাচার্যকে অপসারণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট-সিন্ডিকেটে শিক্ষার্থী বা সাবেক শিক্ষার্থী প্রতিনিধি, যারা অধিকাংশই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা বিশেষ রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ থাকতেন, তাদের আধিপত্য ছিল। সে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাঙ্গন রাজনীতিমুক্ত করে পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্যই এ প্রচেষ্টা। শিক্ষার্থীদের যদিও ছাত্ররাজনীতি করার সুযোগ থাকছে। তবে তা হচ্ছে ছাত্রদের সমস্যা এবং মুখ্যত ইউনিয়ন কার্যাবলি সংক্রান্ত। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রীয় রাজনীতির প্রভাবকে কুনজরে দেখে ওটাকে তাড়ানোই জাতীয় লক্ষ্য বলে ধরা হচ্ছে। কেউ কেউ যদিও এ পদক্ষেপকে দেখছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত বাম-রাজনীতির শক্ত ভিত উৎপাটনের একটি কার্যক্রম হিসেবে, দূরদর্শীরা, এমনকি বামপন্থিরাও ভাবছেন। বর্তমান সরকার আর ভবিষ্যতের প্রতিকূল সরকারও তো বিশ্ববিদ্যালয়-রাজনীতিকরণের সুযোগ পাবে না। আশ্চর্য! ছাত্রসমাজ এবং সাধারণ্যেও এ উদ্যোগ সুগৃহীত হয়েছে। অর্থাৎ দেশ, জাতির স্বার্থ ও শিক্ষার উন্নয়ন সব রাজনৈতিক দল এবং ছাত্র সংগঠন সর্বোচ্চ বিবেচনায় রেখেছে।
আমার মনে পড়ল, এ প্রসঙ্গ নিয়ে প্রয়াত ভাইস চ্যান্সেলর বজলুল মুবিন চৌধুরীর সঙ্গে আমার আলাপ-আলোচনার কথা, যা প্রায়ই হতো। শিক্ষাক্ষেত্রই ছিল বজলুর আজন্ম বিচরণভূমি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ষাটের দশকের শুরুতে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন, ষাটের দশকের প্রান্তে বিলেতে ইস্ট এঙ্গলিয়ার নরইচ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন-পরবর্তী সময়ে স্কটল্যান্ডের আবার্ডিনে উন্নয়নের সমাজতত্ত্ব বিষয়ে পিএইচডি অর্জন ও তারপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৯৪ সাল থেকে ঠিক এক বছর আগে ইন্তেকালের মুহূর্ত পর্যন্ত ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, আইইউবি হয়ে দাঁড়ায় এ নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষাবিদের কর্মময় ফলপ্রসূ বিচরণভূমি। সত্যিকার অর্থে আজীবন। ওর পিতা_ আমার মামা আবদুল মুবিন চৌধুরীও ছিলেন মূলত শিক্ষাবিদ। গত শতাব্দীর তৃতীয় দশকে তৎকালীন অবিভক্ত ভারতবর্ষে কৃষিবিদ্যার অন্যতম পীঠস্থান নাগপুর কৃষি মহাবিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি সংগ্রহ করে তিনি মূলত কৃষিবিদ্যা সম্প্রসারণেই সারাজীবন কাটিয়েছেন_ সরকারি কৃষি বিভাগের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হয়েও। ওর মমতাময়ী সহচরী সহধর্মিণী জাকিয়া_ স্বনামখ্যাত ইংরেজির অধ্যাপক (ব্যারিস্টার) অধ্যক্ষ আসকার আলী সাহেবের দুহিতা_ নিজেও শিক্ষানুরাগী। তিনি তো আমারও প্রত্যক্ষ শিক্ষক ছিলেন, আমি জানি সেই সুবেশ জ্ঞানদাতা কীভাবে নিজের পারিপাশ্বিকতায় একটি শিক্ষানুকূল পরিমণ্ডল গঠন করে নিতেন।
শিক্ষাব্রতী বজলু প্রায়ই বলত_ আমাদের শিক্ষাঙ্গনগুলো কেমন যেন বিদ্যাপীঠ না হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যেখানে থাকার কথা সত্য, সুন্দর এবং আলোকিত মনের মাঙ্গলিক দীপশিখা, সেখানে বিরাজ করছে হানাহানি, মারামারি, রাজনীতির সাংঘর্ষিক উপস্থিতি এবং নির্বিচার দলীয় আনুগত্য। শুধু ছাত্রমহলেই তা আজ সীমাবদ্ধ নয়, শিক্ষক সমাজেও রয়েছে এই পরম রাজনৈতিক ও দলীয় আনুগত্য। এ অগ্রহণযোগ্য অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি কী করে পাওয়া যায়_ এ ছিল বজলুর চিন্তা ও সাধনা। প্রাইভেট ও পাবলিক, দেশি ও বিদেশি সব রকম বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ছিল তার গভীর প্রত্যক্ষ পরিচিতি। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে_ এমনকি উন্নয়নকর্মী দেশগুলোয়ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে লেজুড় হয়ে শিক্ষক ও ছাত্রগোষ্ঠীর লেগে থাকা ক্রমেই বিলীয়মান। ইউরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়া-জাপানে একদম নেই। উন্নয়নকামী দেশগুলোতে যেখানে সময়ের প্রয়োজনে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এককালে এসেছিল বিশেষত দেশগুলোর স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে, সেখানেও তা ক্রমেই অপসৃয়মাণ। অন্তত রাষ্ট্র ও সমাজ সেখানে ওই ধরনের সম্পৃক্ততাকে নিচু নজরে দেখছে, অগ্রহণযোগ্য ভাবছে_ সরিয়ে দেওয়ার বা নির্মূল করার চেষ্টা করছে। ষাট ও সত্তরের দশকেও ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের আধার হয়ে উঠেছিল_ বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গন ছিল রাজনৈতিক গ্রাফিটি, স্লোগান ও সংঘর্ষে ভরপুর।
আজ সে অবস্থা অনেকটা বিতাড়িত। আজ সেখানে একজন উপাচার্য বা শিক্ষকের রাজনৈতিক আনুগত্যের বিষয় যেন একটি অবমাননাকর ঘটনা। তার ইমেজের জন্য নেতিবাচক। ক্রমেই শিক্ষাঙ্গনকে রাজনীতির কালো মেঘের ছায়া থেকে অবমুক্ত করা একটি জাতীয় লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
পঞ্চাশের দশকে কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলাম। ১৯৫২-৫৩ সালে ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের জেনারেল সেক্রেটারি ছিলাম_ ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছি, কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছি। এসএম ইউনিয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিয়ন করেছি। সংস্কৃতি সংসদের সভাপতি ছিলাম। এসব কারণে বজলু প্রায়ই জিজ্ঞেস করত অধ্যয়নের কথা। আমাদের আলোচনা হতো। একটা ব্যাপার খুব পরিষ্কার ছিল, এতসব কর্মকাণ্ডেও কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের যোগাযোগ বা নির্দেশ গ্রহণ করা হতো না। কোনো রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থাকাকে যে কোনো ছাত্র একটি লজ্জাকর অবস্থিতি বলে গণ্য করতেন, আর শিক্ষকদের তো কোনো কথাই ছিল না। তদুপরি অধ্যয়ন এবং পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করাকে সম্মানীয় ও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য বলে ধরা হতো। যারা সফল ছাত্ররাজনীতি করতেন, দেখা যেত তারা ভালো ছাত্রও বটে। এখন এ অবস্থার আমূল পরিবর্তন হয়ে গেছে। বজলু বলত, আজকাল কোনো কোনো শিক্ষক গর্বভরে তার রাজনৈতিক আনুগত্য ঘোষণা করেন আর ছাত্রদের জন্য তা তো তাদের অস্তিত্বেরই আরেক নাম। শিক্ষক সমিতির নির্বাচন পুরোপুরি রাজনৈতিক দলের আনুগত্য অনুসারে নির্ধারিত হয়। হলুদ, নীল, সাদা, লাল_ কত দল আর সবাই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড় বা সক্রিয় সমর্থক। ভর্তি, হলে আবাসিক সুবিধাপ্রাপ্তি, নিয়োগ, পদোন্নতি_ সবই এখন হয়ে পড়েছে রাজনৈতিক দল নিয়ন্ত্রিত। তূলনামূলকভাবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এগুলো এখনও অনেক কম। কোনো কোনো স্থানে নেই বললেও চলে। অথচ দুঃখের বিষয়, সরকারি মেডিকেল এবং কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনীতিকরণ চরমে এসে দাঁড়িয়েছে। বজলুর ধারণা ছিল_ সমাজ, জাতি ও রাষ্ট্র চাইলে নিশ্চয়ই দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনীতির রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত করে নিয়ে আসা যায়। যদি সমাজনেতারা এ ব্যাপারে উচ্চকণ্ঠ হন এবং রাজনৈতিক দলগুলো দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হয়ে বুঝতে পারে আসলে এ পরিস্থিতি তাদের জন্যও দীর্ঘকালের পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলজনক নয়, তাহলে রাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এ পরিস্থিতিকে অপসারণযোগ্য বিবেচনা করে যথাযথ আইন করতে পারেন।
শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নয়ন বা এগিয়ে থাকা আপন অস্তিত্বের জন্যই আবশ্যিকভাবে প্রয়োজন। দল-মত নির্বিশেষে এটা সবারই লক্ষ্য হওয়া উচিত। সামাজিক আচারে, সেমিনার-গোলটেবিলে, দলের আলোচনায়, পাবলিক মিডিয়ায় যদি এ প্রসঙ্গ আলোচিত হয় এবং সরকার ও পার্লামেন্টের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায় তাহলে আমার মনে হয়, আমাদের শিক্ষাঙ্গনকে রাজনীতিমুক্ত করার প্রয়াসে সরকারও এক মুখ্য ভূমিকা নেবে। রাষ্ট্রীয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ দল বদল হয়। তাই দীর্ঘকালের পরিপ্রেক্ষিতে যেখানে সরকারে দল বদলের ঘটনা হবে সেখানে সব দলই আসলে সমানভাবে উপকৃত হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসবে শিক্ষা প্রসারের এক অনুকূল পরিবেশ। সবদিক থেকে জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এর বিকল্প নেই।
বজলুল মুবিনের তিরোধানের এ মাসে তাকে স্মরণ করতে গিয়ে আমার এসব চিন্তা এসে গেল। গত বছর ওর স্মরণে ৭ জানুয়ারি সমকালে মুদ্রিত আমার একটি লেখায় ওর আমৃত্যু অবিচল শিক্ষানুরাগের কথা উল্লেখ করেছিলাম। সম্প্রতি ভারতে প্রণীত বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনীতিমুক্ত রাখার আইনের কথা জেনে মনে হচ্ছে আমাদেরও এ জাতীয় প্রয়াস নেওয়ার অতীব প্রয়োজন রয়েছে। প্রাথমিকভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ জাতীয় আলোচনা হতে পারে এবং সমাজনেতা ও শিক্ষাবিদরা এ ব্যাপারে দিকনির্দেশনা দিতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গভর্নিং বডি এবং নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোও এ ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠতে পারে। এক বছর আগে স্নেহভাজন বজলু আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিল। আজ তাকে স্মরণ করতে গিয়ে এ কথাগুলোই মনে এলো।

ইনাম আহমদ চৌধুরী : সাবেক সচিব ও কলাম লেখক

No comments

Powered by Blogger.