ভোক্তা ও উৎপাদক—উভয়ের স্বার্থ রক্ষিত হোক-ধান-চালের দাম

সারা বিশ্বে যখন অর্থনৈতিক মন্দা চলছে, তখন বাংলাদেশে ধানের ফলন ভালো হওয়া নিশ্চয়ই আশাব্যঞ্জক খবর। গত দুই বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও ধানের উৎপাদন বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী বোরো উৎপাদনও ভালো হবে।
প্রশ্ন হলো, ধানের ভালো ফলনে কৃষক লাভবান হচ্ছে কি না? ভোক্তারাই তার সুবিধা কতটা পাচ্ছে? কৃষক তখনই লাভবান হবে, যখন উৎপাদন-ব্যয়ের চেয়ে পণ্যের দাম বেশি থাকবে।


তাতে কৃষক পরেরবার ফসল উৎপাদনেও উৎসাহিত হবে। আবার এও জানি, উৎপাদিত পণ্যের দাম খুব বেশি হলে সাধারণ ভোক্তারা বিপদে পড়ে। আসলে এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি।
এক জরিপে দেখা গেছে, এ বছর ধান বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকায়। উৎপাদন খরচ কমবেশি মণপ্রতি ৫০০ টাকা পড়েছে। গত বছর ধানের দাম ছিল মণপ্রতি ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা। গত বছর উৎপাদন খরচও এ বছরের চেয়ে কম ছিল। এ বছর কৃষকের লাভের পরিমাণ কমে গেছে, সন্দেহ নেই।
গত শনিবার এক সেমিনারে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী আশ্বস্ত করেছেন, এই মুহূর্তে ধান-চালের দাম কিছুটা কম হলেও উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। বাজারে ইতিমধ্যে দাম বাড়তে শুরু করেছে। একই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ধান-চালের দামের ব্যাপারে হিতোপদেশ না দিয়ে জ্বালানি ও সারের দাম কমানোর পরামর্শ দেওয়ার তাগিদ দেন। ধান-চালের দাম কম হওয়ার কারণও ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, এবার কৃষকদের ৩৫ কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলে ধান উৎপাদন অনেক বেড়েছে, ফলন ভালো হওয়ায় আড়তদারেরা আগের মজুদ ছেড়ে দিয়েছেন।
অস্বীকার করার উপায় নেই, জ্বালানি ও সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার কৃষকের উৎপাদন-ব্যয়ও বেড়েছে। ভোক্তা ও কৃষক উভয়ের স্বার্থ নিশ্চিত করতে হলে উৎপাদন-ব্যয় কমানোর বিকল্প নেই। বাজার ঊর্ধ্বগতির কারণে সম্প্রতি ন্যায্যমূল্যে খোলাবাজারে চাল বিক্রি করা হয় এবং এখনো সেই কার্যক্রম অব্যাহত আছে। দাতা সংস্থাগুলো একদিকে জ্বালানি ও সারের ভর্তুকি কমানোর পরামর্শ দেয়, অন্যদিকে ধান-চালের ন্যায্যমূল্য দেওয়ার কথা বলে। এটি স্ববিরোধী। কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করতে হলে উৎপাদন-ব্যয় কমাতেই হবে।
কৃষিপণ্যের দাম বেশি হলে ভোক্তারা বিপদে পড়ে, আর কম হলে কৃষকের ঝুঁকি বাড়ে। আরেকটি কথা, কৃষক ধান-চালের দাম মোটামুটি পেলেও শাকসবজির দামে তার বঞ্চনা আরও বেশি। যে সবজি ঢাকায় খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, সেই সবজির জন্য দিনাজপুরের কৃষক পাঁচ টাকাও পান না। আমাদের যোগাযোগ ও বিপণনব্যবস্থার দুর্বলতার কারণেই এটি হচ্ছে। কৃষকের উৎপাদন-ব্যয় কমানোর পাশাপাশি সরকারকে দেশব্যাপী আধুনিক বিপণনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পণ্য পরিবহনও করতে হবে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ।

No comments

Powered by Blogger.