বিপর্যয়ের মুখে অর্থনীতি? by হায়দার আকবর খান রনো

আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরে এসেছে। হাইকোর্টের একটি রায়ের দ্বারা সংবিধান তার আদি চরিত্র ফিরে পেয়েছিল। কিন্তু মহাজোট সরকার সেই জায়গায় থাকেনি। তারা ১৫তম সংশোধনী এনে নতুন করে বেশ কাটাছেঁড়া করেছে। সংবিধানকে বর্তমান শাসক শ্রেণী নিজের মতো করে সাজিয়েছে।


'ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম'- সামরিক শাসক এরশাদের ভণ্ডামিপূর্ণ অষ্টম সংশোধনীকে অপরিবর্তিত রেখে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র আবারও নস্যাৎ করে দিয়েছে। একইভাবে সমাজতন্ত্রের নামেও চলছে ভণ্ডামি ও প্রতারণা।
সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শিল্প, ব্যাংকিং, ব্যবসা-বাণিজ্যে থাকে রাষ্ট্রের প্রধান ভূমিকা। পুরোপুরি সমাজতন্ত্র মানে হলো ব্যক্তিগত ব্যবসা ও আর্থিক প্রতিপত্তির অবসান। একই সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্র প্রত্যেক নাগরিকের জন্য অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও বিনোদনের নিশ্চয়তা প্রদান করে। সমাজে থাকে না বড় ধরনের আর্থিক বৈষম্য। অনাথ শিশু বালক-বালিকার সব দায়িত্ব রাষ্ট্র গ্রহণ করে। কবি রবীন্দ্রনাথ সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার অনাথ বালক-বালিকাদের প্রতি রাষ্ট্রের এই মনোযোগ ও দরদ দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলেন। আমাদের দেশে এখন যা চলছে তা হলো, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার ঠিক বিপরীত। যার টাকা আছে তার জন্য আছে বিলাসী জীবন। যার টাকা নেই তার জন্য না খেয়ে মরার অধিকারই কেবল আছে। শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো বিষয়গুলো ক্রমাগত সরকারি দায়িত্ব থেকে সরে গিয়ে ব্যক্তি খাতে স্থানান্তরিত হচ্ছে। শিক্ষা, চিকিৎসার ওষুধ, পানি সরবরাহসহ সব কিছুই এখন টাকায় কেনাবেচা হবে। এই সমাজে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য এমনই প্রকট এবং বিকট ও বীভৎস আকারে আছে যে তাকে অমানবিক বললেও কম বলা হয়। অথচ সংবিধানে লেখা আছে, রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হলো সমাজতন্ত্র। ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময়ও প্রণেতারা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন না। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জনগণের আকাঙ্ক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা বাধ্য হয়েছিলেন সংবিধানে 'সমাজতন্ত্র' শব্দটি রাখার জন্য।
বর্তমানের আওয়ামী লীগ সরকার অবশ্য ভুলেও 'সমাজতন্ত্র' কথাটি উচ্চারণ করে না, যদিও সংবিধানে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে তা রাখা হয়েছে। আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য হিসেবেও ভালো ভালো কথা লেখা আছে। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো জীবনের নূ্যনতম চাহিদা পূরণ করার মতো বিষয়টি কেবল নীতিগতভাবে আছে, শুধু রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য হিসেবেই আছে, কিন্তু নাগরিকের অধিকার হিসেবে স্বীকৃত হয়নি। সমাজতন্ত্র যদি রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হয়ে থাকে, তাহলে অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ইত্যাদি অধিকার হিসেবে যেকোনো নাগরিক রাষ্ট্রের কাছে দাবি করতে পারে। না পেলে কোর্টে যাওয়ার অধিকারও তার থাকবে। সার্বিক শোষণমুক্তির লক্ষ্য নিয়ে যে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ হয়েছে, সেই রাষ্ট্রে শুধু নামকাওয়াস্তে লক্ষ্য নয়, বাস্তবে এই দাবিকে কার্যকর করতে হবে। সংবিধানে সে জন্য প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা দরকার, যাতে প্রত্যেক নাগরিক রাষ্ট্রের কাছ থেকে উপযুক্ত কাজ, প্রয়োজনীয় খাদ্য, উপযুক্ত চিকিৎসা এবং বালক-বালিকা ও তরুণ-তরুণীর জন্য উপযুক্ত শিক্ষা আদায় করতে পারে। ৪০ বছর পর এই অধিকারের কথা বলা এবং সংবিধানে এ রকম সংযোজন মোটেও বাড়তি কথা নয়। শিক্ষা, চিকিৎসা, বাণিজ্য, প্রাইভেটাইজেশন সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। অতএব পুরো শিক্ষা ও চিকিৎসা জাতীয়করণের দাবি অবান্তর নয়; বরং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গেই সংগতিপূর্ণ। একইভাবে মুক্তবাজার অর্থনীতির আদর্শকেও পরিত্যাগ করতে হবে। অন্যথায় বলতে বাধ্য হব যে আগের সরকারের মতোই বর্তমানের সরকার ও দল হিসেবে আওয়ামী লীগও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে।
হায়! কার কাছে কী আশা করছি। স্বাধীনতাযুদ্ধের নেতৃত্বের দাবিদার আওয়ামী লীগও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যে বিশ্বাস করে না, তা কি নতুন করে বলার দরকার আছে? আওয়ামী লীগ কি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করে? সাম্রাজ্যবাদের কাছে প্রাকৃতিক সম্পদ তুলে দিতে যারা কোনো দ্বিধা করেনি, যাদের নেতৃত্বের বড় অংশ নিজেরাই ধনিক বুর্জোয়া এবং যাদের কাজ হলো লুটেরা ধনিক শ্রেণীর স্বার্থে কাজ করা, তাদের কাছ থেকে সমাজতন্ত্র আশা করা কি নেহাত হাস্যকর ও মূর্খতা নয়?
তাহলে আপাতত সমাজতন্ত্রের কথা থাকুক। তবে আমরা কি অন্তত কিছুটা জনমুখী অর্থনীতি আশা করতে পারি না? অন্যথায় জনগণ কী কারণে, কোন ভরসায় এত বিপুল ভোট দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারকে বিজয়ী করেছিল? ২০০৮ সালে নির্বাচনী প্রচারে শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সস্তায় চাল খাওয়াবেন, প্রতিটি পরিবারের একজনের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন, দুর্নীতি বন্ধ করবেন। সরকার নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণেও ভীষণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। দেশে এখন রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মতো অর্থনৈতিক নৈরাজ্য চলছে। প্রতিশ্রুতিমতো সস্তায় চাল খাওয়াতে পারেনি সরকার। দ্রব্যমূল্যের চাপে গরিব শ্রেণী তো বটেই, মধ্যবিত্তেরও নাভিশ্বাস উঠেছে। একদিকে ফ্যাসিসুলভ রাজনৈতিক আচরণ, ক্রসফায়ার, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম এবং নির্যাতনের কারণে গণতন্ত্র সঙ্কুচিত; অন্যদিকে দলবাজি-টেন্ডারবাজির দৌরাত্মায় শিল্প ব্যবসাও সঙ্কুচিত। কোনো কোনো মন্ত্রীর বিরুদ্ধে রয়েছে দুর্নীতির পাহাড়সমান অভিযোগ। একে তো অর্থনীতির অবস্থা খারাপ, তার ওপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি। কয়েক লাখ মধ্যবিত্ত-স্বল্পবিত্তের মানুষকে সর্বস্বান্ত করে পথে বসিয়ে কিছু লোক লুটে নিয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। বর্তমান সরকারও যে লুটেরা ধনিক শ্রেণীর প্রতিনিধি, তা আরেকবার প্রমাণিত হলো।
দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা যে ভালো নেই তা খানিকটা খালি চোখেই দেখা যায়। সবচেয়ে বড় কথা এই যে মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মুদ্রাস্ফীতির হার যখন দুই অঙ্কের ঘরে গিয়ে ওঠে, তখন তা বিপদ সংকেতরূপেই দেখতে হবে। ইতিমধ্যেই তা ১০ শতাংশের বেশি উঠেছে। এর মধ্যে আবার খাদ্যদ্রব্যের মূল্যস্ফীতি ১৪ শতাংশের বেশি হয়েছে। এখন প্রায় সব মানুষই চাল-ডালসহ সব খাদ্যদ্রব্য কিনে খায়। এমনকি উৎপাদক কৃষকের বড় অংশ, ছোট ও মাঝারি কৃষক উৎপাদিত ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হয়। দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ আয়ের ৮০ শতাংশ ব্যয় করে খাদ্য ক্রয়ের জন্য। তাই সহজেই বোঝা যায়, মানুষের দুর্দশা কোন পর্যায়ে রয়েছে। সরকারের পক্ষে যাঁরা সাফাই গান, তাঁরা বলেন, গ্রামাঞ্চলেও এখন নাকি ক্ষেতমজুর বা দিনমজুর পাওয়া যায় না এবং তাঁদের মজুরির হারও নাকি খুব বেশি। তবে তাঁরা এই তথ্যটি গোপন করেন যে টাকার অঙ্কে মজুরি বাড়লেও মূলস্ফীতি বর্ধিত আয়ের সবটুকু খেয়ে ফেলে, তাই আসল মজুরি কমেছে। গার্মেন্টশিল্পে নিম্নতম মজুরি সরকার নির্দিষ্ট করে দিয়েছে মাসিক দুই হাজার টাকা মাত্র। বাসাভাড়া বাবদ ৮০০ টাকা এবং চিকিৎসাভাতা ২০০ টাকা। আজকের বাজারদরে এই মজুরিতে মনুষ্যজীবন যাপন সম্ভব কি না তা কাণ্ডজ্ঞান যাঁদের আছে, তাঁরাই বুঝবেন। কিন্তু সরকার ও লুটেরা ধনিক শ্রেণী শ্রমজীবী জনগণকে মানুষ বলেই জ্ঞান করে না। ওরা যেন শ্রমদাস মাত্র।
লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, টাকার বিপরীতে ডলারের ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ব্যাংকের তারল্য সংকট পুরো অর্থনীতিকে অতি নাজুক জায়গায় এনেছে। অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা। এতে যে শুধু গরিব মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাই-ই নয়, সব শ্রেণীই সংকটে নিমজ্জিত হবে এবং গোটা অর্থনীতি এক বেসামাল অবস্থায় পড়তে পারে।
ডলারের দাম বেড়েই চলেছে। কিছুদিন আগে আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে ডলারের মূল্য হ্রাস পেলেও তখন ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছিল। কমতে কমতে এখন ডলারের দাম দাঁড়িয়েছে ৮৩ টাকায়। কারণ কী? বিভিন্নভাবে দুর্নীতির মাধ্যমে ক্ষমতাসীন যারা প্রচুর অর্থ সংগ্রহ করেছে, তারা সেই টাকা বিদেশে জমা রাখছে। ফলে ডলারের চাহিদা বাড়ছে। শুধু বামপন্থী সমালোচকরাই নন, ব্যবসায়ীরা পর্যন্ত বলছেন, দেশে পর্যাপ্ত ডলার থাকার পরও ডলারের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, যা অর্থনীতির বিপর্যয়ের পূর্ব সংকেত।
এদিকে ব্যাংকে তারল্য সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ কমে যাওয়া বিপদসংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে। সরকার এর আগে রেন্টাল পাওয়ার প্লান্টের জন্য যেসব চুক্তি করেছিল, সে জন্য তেল সরবরাহ করতে বাধ্য। উপরিউক্ত প্লান্টগুলো চালু রাখতে বিপুল জ্বালানি তেলের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। চাপ পড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। দুই মাস আগেও রিজার্ভ ছিল ১০ বিলিয়ন ডলারের মতো। এখন তা ৮ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অনেকে বলছেন, বর্তমানে যে রিজার্ভ আছে, তাতে বড়জোর দুই মাসের আমদানি-ব্যয় মেটানো যাবে।
লক্ষণীয় যে আমাদের রেমিট্যান্স-প্রবাহ হার কিন্তু বেড়েছে। ২০১০ সালে এই হার ছিল ৩ শতাংশ। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই হার ছিল ১০ দশমিক ৫৫ শতাংশ। ২০১০ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বরে রেমিট্যান্স থেকে আয় ছিল পাঁচ হাজার ৫৫৫ মিলিয়ন ডলার। আর গত বছর জুলাই থেকে ডিসেম্বরে সেই আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ছয় হাজার ৬৫ মিলিয়ন ডলারে।
রেমিট্যান্স বাড়লেও আমদানি ব্যয় ও রেন্টাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য জ্বালানি তেল আমদানির ব্যয় মেটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। টাকার মুদ্রামান কমলে রপ্তানি বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। কিন্তু সেটাও আশানুরূপ হচ্ছে না। ফলে আমদানি ব্যয় আর রপ্তানি আয়ের মধ্যে ফারাক বেড়েই চলেছে।
ব্যাংকের তারল্যের সংকট আরেকটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের পূর্বাভাস। অন্যদিকে ব্যাংক থেকে সরকার যে মাত্রায় ঋণ নিয়েছে, তা এখন ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় পৌঁছেছে। ব্যাংকিং উৎস থেকে সরকারের মাত্রাতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের বিষয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকও মুখ খুলেছে। ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ না করতে আনুষ্ঠানিকভাবেই বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারকে জানিয়ে দিয়েছে। চলতি অর্থবছরের বিশাল ঘাটতি বাজেটের প্রস্তাবনায় ঘাটতি পূরণের জন্য বৈদেশিক ঋণ (১৭ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা) এবং দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণ (১৮ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা) নেওয়ার কথা ছিল (অন্যান্য উৎস থেকে আরো কিছু ঋণের প্রস্তাব ছিল)। বৈদেশিক ঋণ এ পর্যন্ত তেমন পাওয়া যায়নি। বৈদেশিক ঋণ বেশি বেশি করে নিলে ভবিষ্যতের জন্য বিপদের আশঙ্কা থাকলেও আপাতত অবস্থা সামাল দেওয়া যেত। অন্যদিকে দেশীয় ব্যাংকিং উৎস থেকে ১৮ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকার মতো।
আর্থিক সংকটের কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিকে কাটছাঁট করতে হয়েছে। এতে অর্থনীতি সঙ্কুচিত হবে, যদিও মূল্যস্ফীতি কমছে না মোটেও। এ অবস্থা থেকে উদ্ধারের জন্য যে ধরনের দৃঢ়চিত্ত, নীতিনিষ্ঠ ও রেডিক্যাল বা বলা যেতে পারে বিপ্লবী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, সেটা বর্তমান সরকারের কাছ থেকে আসা করা যেতে পারে না। কোনো বুর্জোয়া সরকারের কাছ থেকেই আশা করা যায় না। সম্ভবত গ্রহণ করতে হবে জাতীয় কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি, যেখানে ধনীদের স্বার্থই ক্ষতি করে দরিদ্র মানুষকে সাহায্য করতে হবে পুরোপুরি রেডিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে, যা অবশ্যই হবে সমাজতন্ত্র অভিমুখী।
না, তেমন চিন্তা ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতার বাইরের বুর্জোয়া শাসকরা করতে পারেন না। তাহলে সংকট থেকে উদ্ধারের কী উপায় রয়েছে তাদের জন্য? হয় সাম্রাজ্যবাদকে আরো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কনসেশন দিয়ে অনেক কঠিন শর্তে কর্জ সংগ্রহ করা অথবা টাকা ছাপানোর ব্যবস্থা করা। সাম্রাজ্যবাদের কাছে সব কিছু বিকিয়ে দেওয়া হবে রাজনৈতিক উপায়ে সার্বভৌমত্বকে দারুণভাবে ক্ষুণ্ন করা এবং অর্থনৈতিকভাবেও ভবিষ্যতের জন্য আরো বড় সর্বনাশ ডেকে আনা। আর টাকা ছাপালে মুদ্রাস্ফীতি আরো ভয়াবহ রূপ নেবে। এককথায় অর্থনৈতিক বিপর্যয় আসন্ন বললে খুব একটা ভুল বলা হবে না।
কিছুদিন আগে কালের কণ্ঠের পাতায় এক লেখায় বলেছিলাম, বর্তমানে দেশে গণতন্ত্র প্রায় শূন্যের কোঠায় এসে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। কিন্তু কথায় বলে পেটে খেলে পিঠে সয়। এখন দেখা যাচ্ছে যে পেট ও পিঠ দুটোই আক্রান্ত। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট দুটোই যদি একসঙ্গে আত্মপ্রকাশ করে, তবে তা হবে মারাত্মক ধরনের সর্বগ্রাসী সংকট। আমার ভয় হচ্ছে, আমরা বুঝি তেমন ভয়াবহ পরিণতির দিকে যাচ্ছি। এমন পরিণতি থেকে দেশকে বাঁচানোর এখনো কি কোনো পথ খোলা নেই? সব সুস্থ বুদ্ধির বিবেকবান মানুষকে ভেবে দেখার জন্য অনুরোধ করব।
লেখক : রাজনীতিক ও কলামিস্ট

No comments

Powered by Blogger.