পার্বত্য চট্টগ্রাম-সংঘাত বন্ধে সমঝোতাই পথ by হরি কিশোর চাকমা

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। দূরত্ব বাড়ছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে তিনটি রাজনৈতিক দল সক্রিয় রয়েছে। সেই সুযোগে কিছু সশস্ত্র গ্রুপও নানা অপকর্মে তৎপর বলে শোনা যায়।


তিনটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে রয়েছে জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, প্রসিত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ এবং রূপায়ণ দেওয়ান ও সুধাসিন্ধু খীসার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা)। এ তিনটি রাজনৈতিক দলের দাবি অনুযায়ী নিজেদের মধ্যে এই সংঘাত ও সহিংসতায় গত এক দশকে তাদের সক্রিয়কর্মী মারা গেছেন ৫৪১ জন। সমর্থক মারা গেছেন প্রায় একই সংখ্যক। এর মধ্যে জনসংহতি সমিতির ২০০ জন, ইউপিডিএফের ৩২৫ জন এবং জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) ১৬ জন নেতা-কর্মী মারা গেছেন। আবার শুধু গত এক বছরে তিন দলের নেতা-কর্মী মারা গেছেন ৩১ জন। পাহাড়ি জনগোষ্ঠির তিনটি সংগঠনের নিজেদের মধ্যে এই লড়াইকে ভ্রতৃঘাতী সংঘাত ছাড়া আর কী বলা যায়!
কেন এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত? প্রায় সব মহলের যে অভিমত তা হলো, রাজনৈতিক মতবিরোধ, প্রভাব বিস্তারের প্রয়াস এবং কায়েমি স্বার্থ জড়িত রয়েছে এ সংঘাতের পেছনে। আবার পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি রাজনৈতিক দল পরস্পরের বিরুদ্ধে কায়েমি স্বার্থবাদী মহলের স্বার্থরক্ষার অভিযোগ করে। এ তিনটি দলের নেতা-কর্মীরা একসময় একসঙ্গে কাজ করেছেন। ১৯৯৭ সালে পার্বত্যচুক্তি সই হওয়ার পর প্রথমে ১৯৯৮ সালে ইউপিডিএফ এবং পরে ২০০৮ সালে জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা) সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি থেকে পৃথক হয়ে যায়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের রাজনৈতিক, ভূমি, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বে দীর্ঘ দুই দশক ধরে চলেছিল সশস্ত্র সংগ্রাম। সরকারের সঙ্গে যখন জনসংহতি সমিতির আলোচনা শুরু হয়, তখন মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিল পাহাড়ে শান্তি আসবে। কিন্তু পার্বত্যচুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই শুরু হয় ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের। চুক্তি পূর্ববর্তী আদিবাসী ছাত্রদের মধ্যে যে দলটির জনসংহতি সমিতির সঙ্গে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক ছিল তারাই চুক্তির বিরোধিতা করতে শুরু করায় এ সংঘাতের সৃষ্টি হয়। পাহাড়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখন মানুষ রাজনীতির কথা বলে না, সামাজিক শৃঙ্খলা ও শান্তির কথা বলে না, অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বপ্ন দেখতে পারে না। একে অন্যের দিকে তাকায় সন্দেহের দৃষ্টিতে। এমনকি জীবন যে নিরাপদ-নির্বিঘ্নে চলবে তারও তেমন আশা করতে পারে না। পরিস্থিতি এমন হয়ে যাচ্ছে, যা পার্বত্যচুক্তি পূর্ববর্তী সময়েও আশা করা যায়নি।
জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত শুরু হওয়ার পরপরই পার্বত্য চট্টগ্রামের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের উদ্যোগে সমাঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে ঐক্য প্রক্রিয়া একসময় ভেঙে যায়। তার জন্য ইউপিডিএফ ও জনসংহতি সমিতি পরস্পরকে দোষারোপ করে। এখন ইউপিডিএফ নানাভাবে ঐক্যের ডাক দিচ্ছে। তাদের নানা প্রচার-প্রচারণায় ঐক্য সমঝোতা না হওয়ার জন্য একমাত্র সন্তু লারমাকে দায়ী করছে। বলছে, সন্তু লারমার গোয়ার্তুমি ও একগুঁয়ে মনোভাবের কারণে সমঝোতা বা ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে না।
সন্তু লারমার সমঝোতায় আসতে না চাওয়ার কিছুটা কারণ অবশ্যই আছে। সমঝোতার অতীত অভিজ্ঞতা তাঁর খুবই তিক্ত। ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতেই তো সন্তু লারমা তাঁর দুই বড় ভাইকে হারিয়েছিলেন। তিনিও অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। সে অভিজ্ঞতায় একজন রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে সন্তু লারমার রাগ, ক্ষোভ, বিদ্বেষ, সন্দেহ-অবিশ্বাস থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। অপরদিকে ইউপিডিএফ বা পৃথক হয়ে যাওয়া জনসংহতি সমিতির নেতা-কর্মীরা সমঝোতার আহ্বান জানান ঠিকই, কিন্তু নানাভাবে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে সন্তু লারমাবিরোধী প্রচারণাও চালান। সেটাও সমঝোতা বা ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু হতে না পারার আরও একটা কারণ হতে পারে। সন্তু লারমার সম্মতি ছাড়া যে সমঝোতা সম্ভব নয়, সেটা যে কারও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। যাঁরা ঐক্যের আহ্বান জানান, তাঁদের বুঝতে হবে কাউকে এককভাবে দোষারোপ করে সমঝোতা বা আলোচনার টেবিলে আনা সম্ভব নয়।
সন্তু লারমা ইউপিডিএফ বা পৃথক হয়ে যাওয়া জনসংহতি সমিতিকে নীতি-আদর্শ ও রাজনৈতিক কর্মসূচিহীন দল মনে করেন। সে রকম নীতি-আদর্শ ও রাজনৈতিক কর্মসূচিহীন কারও সঙ্গে ঐক্য নয় বলে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন। এর আগে সন্তু লারমা বহুবার ইউপিডিএফকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে আখ্যায়িত করে নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবি জানিয়েছিলেন। সেটা না করার বিষয়ে অভিযোগ তুলে তিনি বলেছিলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে যে রক্ত ঝরছে, তা বন্ধ করার কোনো পদক্ষেপ সরকার নিচ্ছে না।... যেকোনো মুহূর্তে আমাদের জীবন চলে যেতে পারে (সূত্র: প্রথম আলো, ১১ নভেম্বর ২০১১, পৃষ্ঠা-৩)।
সন্তু লারমার কথায় এটা স্পষ্ট বোঝা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি কী পর্যায়ে চলে গেছে। এটা ঠিক যে সংঘাত-হানাহানি করে কোনো দলকে নির্মূল করা সম্ভব নয়, সে দল যদি কোনো উদ্দেশ্যে গঠিত হয়ে থাকে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে এটা বলা যায় যে ভুল রাজনৈতিক কর্মসূচি আর জনগণকে আস্থায় নিতে না পারলে সে দলের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি প্রায় ৪০ বছর ধরে টিকে আছে তার রাজনৈতিক আদর্শ আর জনগণের আস্থার কারণে। ইউপিডিএফও প্রায় ১২ বছর অতিক্রান্ত করে সাবালকত্ব ধারণ করছে। অপরদিকে জনসংহতি সমিতি দল হিসেবে নতুন হলেও সবাই রাজনীতিতে পোড়খাওয়া নেতা। তাই সবাইকে বুঝতে হবে হানাহানিতে লিপ্ত থাকলে ভালো ফল আসবে না।
পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা আদিবাসী জনগণ এখন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। পার্বত্যচুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়া ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি না পাওয়া আদিবাসীদের মনের বড় ক্ষত। সেই ক্ষত মুছে ফেলার জন্য প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। সেই আন্দোলনে দেশি-বিদেশি অনেক বন্ধুর সহানুভূতি রয়েছে। কিন্তু ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের কারণে সেসব বন্ধুর সহায়তাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
সব রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর একটি দলে পরিণত হওয়ার দরকার নেই। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও আদিবাসীবিষয়ক সুনির্দিষ্ট ইস্যুতে একই প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে আন্দোলন করা গেলে সহানুভূতিশীল বন্ধুদের সহায়তা কাজে লাগানো যাবে। তার আগে বন্ধ করতে হবে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত। আর যেসব রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বেসরকারি সংগঠন আদিবাসী ও পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতি সহানুভূতিশীল, ওই সব সংগঠনও আদিবাসী রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য সমঝোতার বিষয়ে উদ্যোগ নিতে পারে। বিবদমান রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য সমঝোতা অসম্ভব কিছু নয়।
হরি কিশোর চাকমা: প্রথম আলোর রাঙামাটি প্রতিনিধি।

No comments

Powered by Blogger.