খুনিকে ক্ষমা!-ন্যায়বিচার যেন বাধাগ্রস্ত না হয়

'অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে/তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে'_কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার এ পঙ্ক্তি যেন কারো মনে আজ আর কোনো অনুপ্রেরণা জোগায় না। রাজনৈতিক বিবেচনায় যখন চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের মামলা একের পর এক খারিজ করে দেওয়া হয়, তখন নৈতিক শক্তিরই পরাজয় হয়েছে বলে মনে হয়। সরকার পরিবর্তনের পর সরকারপক্ষীয় দলের কর্মী-সমর্থকদের মামলা রাজনৈতিক বিবেচনায় খারিজ করে দেওয়ার রেকর্ড অসংখ্য।


অন্যদিকে রাজনৈতিক বিবেচনায় ফাঁসির আসামিও ক্ষমা পেয়ে গেলে দেশের প্রচলিত আইনি ব্যবস্থার ওপর থেকেই যেন মানুষের আস্থা ওঠে যায়। অনেকেরই তখন মনে হতে পারে, রাজনৈতিক বিবেচনার কাছে বিচারের বাণী যেন 'নীরবে-নিভৃতে' কেঁদে ফেরে। সম্প্রতি এক ফাঁসির আসামি রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমা পেয়ে যাওয়ার পর এই বাস্তবতাটিই যেন নতুন করে আবার সবার সামনে স্পষ্ট হয়ে গেল। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পেয়েছেন লক্ষ্মীপুরের আওয়ামী লীগ নেতা ও পৌর মেয়র আবু তাহেরের ছেলে এইচ এম বিপ্লব। রাজনৈতিক সরকারের আমলে এমন ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। বিগত বিএনপি সরকারের আমলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় খুনের মামলায় ফাঁসির দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামির প্রাণদণ্ড মওকুফ করা হয়েছিল। বর্তমান মহাজোট সরকারের আমলে এটা দ্বিতীয় ঘটনা।
লক্ষ্মীপুরের পৌর মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা আবু তাহেরের ছেলে এইচ এম বিপ্লবের একটি মামলায় ফাঁসির আদেশ হয়। ঘটনাটি ঘটেছিল ২০০০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে। লক্ষ্মীপুর শহরের বাড়ি থেকে অপহরণ করা হয় অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলামকে। এরপর তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। পাওয়া যায়নি তাঁর মরদেহও। শোনা যায়, তাঁর মরদেহ টুকরো টুকরো করে কেটে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ঘটনার পর থেকেই পলাতক ছিলেন এইচ এম বিপ্লব। এ নিয়ে যে মামলা হয়েছিল, সে মামলার আসামি ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা আবু তাহেরের ছেলে বিপ্লব। তাঁর অনুপস্থিতিতেই বিচার হয়। দ্রুত বিচার আদালতের বিচারে বিপ্লবের ফাঁসির আদেশ হয় ২০০৩ সালে। সে রায়ে আবু তাহেরের তিন ছেলেসহ পাঁচজনের ফাঁসির আদেশ হয়েছিল। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল ৯ জনকে।
পুরনো পত্রপত্রিকা থেকে দেখা যায়, লক্ষ্মীপুর এলাকায় আবু তাহের ও তাঁর পুত্রদের পরিচিতি সন্ত্রাসী হিসেবে। আবু তাহেরের অন্য ছেলেরাও অনেক সন্ত্রাসী ঘটনার আসামি। আবু তাহের সেই সময় সাংবাদিকদের হাত-পা ভেঙে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন। তাঁর আরেক ছেলেও একটি হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। এইচ এম বিপ্লবও একটি মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে এখন কারাগারে। কাজেই তাহের ও তাঁর ছেলেদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ, তা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ধরেই নেওয়া যায়, আবু তাহের রাজনৈতিক নেতা হিসেবে রাজনৈতিক বিবেচনায় তাঁর পুত্রের দণ্ডাদেশ মওকুফ করা হয়েছে। এর আগে নাটোরে গামা হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত ২০ আসামির জন্য ঘোষণা করা হয় সাধারণ ক্ষমা। কারাগার থেকে বেরিয়ে আসা মুক্তিপ্রাপ্ত সেই ফাঁসির আসামিদের ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিয়েছিলেন সরকারের এক প্রতিমন্ত্রী। রাজনৈতিক বিবেচনায় নৈতিকতাবোধও যে পরাজিত হতে পারে, তারই উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছিল সেদিনও। রাজনৈতিক বিবেচনায় ফাঁসির আসামির দণ্ডাদেশ মওকুফের ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। বিগত জোট সরকারের আমলে জোড়া খুনের মামলায় ফাঁসির দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি জিন্টুকে রাজনৈতিক বিবেচনায় দণ্ডাদেশ মওকুফ করা হয়েছিল। ২২ বছর পর ২০০৪ সালে দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত ওই আসামি আদালতে হাজির হলে রীতিমতো হৈচৈ পড়ে যায়। তখনকার পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে সরকারের কড়া সমালোচনা করা হয়েছিল।
রাজনৈতিক বিবেচনায় বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নৈতিক বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার। নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু রাষ্ট্র কারো কারো নিরাপত্তা হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে কি না, সে প্রশ্নটাও কখনো কখনো বড় হয়ে দেখা দেয়। আদালতের রায়ের পর রাষ্ট্রের এমন কোনো ঘোষণা আসা উচিত নয়, যাতে বাধাগ্রস্ত হবে ন্যায়বিচার। বিচারপ্রার্থী যেন নিজেকে বঞ্চিত মনে করতে না পারে, সেটাও সবার বিবেচনায় থাকা উচিত।

No comments

Powered by Blogger.