কল্পকথার গল্প-তৈলাস্ত্র প্রয়োগে দক্ষতা অর্জন করুন by আলী হাবিব

তেলের দাম বাড়ছে। খবর বেরিয়েছে কাগজে। বাড়ছে তেলের সংকট। চাহিদা আর সরবরাহের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে সংকট দেখা দেবেই। ব্যবসা সূত্রে ভোজ্য ও জ্বালানি তেল অনেকেরই জীবিকা। নানা ধরনের জীবিকা আছে। জীবিকার ওপর নির্ভর করে সমাজে নানা ধরনের 'জীবী' পাই আমরা।


চাকরিজীবী, পেশাজীবী- এসবের পাশাপাশি একটি বুদ্ধিজীবী শ্রেণী সমাজে সব সময় ছিল, আছে। এর বাইরে মেধাজীবী বলে কি একটি শ্রেণী থাকতে পারে? পারবে না কেন? মেধার ব্যবহার করেন যাঁরা, তাঁরা তো মেধাজীবী হতেই পারেন। মেধাজীবী কারা? কারা মেধার চূড়ান্ত ব্যবহার করতে পারেন? তারও আগের প্রশ্ন, মেধা কোথায়, কেমন করে ব্যবহার করা যেতে পারে? মেধা অনেকেরই আছে। কিন্তু মেধার সঠিক ব্যবহার কি সবার দ্বারা সম্ভব? সবাই মেধা ব্যবহারে কি দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেন? মেধা ব্যবহারের নানা রকম কায়দা-কানুন আছে। কে, কিভাবে, কতটা দক্ষতার সঙ্গে মেধাকে তাঁর জীবিকা হিসেবে ব্যবহার করবেন, সেটা তাঁর দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। এই দক্ষতা অর্জন করতে হয়। সবার দ্বারা এটা সম্ভব হয় না। এই মেধা প্রকাশের সেরা এবং আধুনিকতম মাধ্যম বোধহয় তেল। এটা প্রয়োগ করতে হয়। প্রয়োগের আগে ক্ষেত্রটি নিয়ে ভাবতে হবে। কোথায়, কখন, কেন তেল প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োগের আগে এসব বিষয়ে চুলচেরা হিসাব করতে পারলে তেলের ভেতর দিয়ে মেধার চূড়ান্ত পরিচয় ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হবে।
প্রয়োগের চিন্তাটি করতে হবে পরে। আগে আরো কিছু বিচার্য বিষয় আছে। প্রথম বিচার্য বিষয়টি হচ্ছে অস্ত্র। সেই অস্ত্র আবার তেলের। এর পর দক্ষতা। দক্ষতা অর্জন না করলে প্রায়োগিক দিকটি অন্ধকারে থেকে যায়। কাজেই দক্ষতা অর্জন করতে হবে আগে। দক্ষতা না থাকলে চারদিক থেকে সমালোচনা শুনতে হবে। অদক্ষ চালক যেমন গাড়ি চালাতে গেলে বারবার দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে, তেমনই দক্ষতা অর্জন না করে কোনো অস্ত্র প্রয়োগ করা যায় না। অস্ত্র প্রয়োগের ক্ষেত্রে সাবধানী হওয়ার পাশাপাশি কুশলীও হতে হয়। সময় ও সুযোগ বুঝে প্রয়োগ করতে হয়। অস্ত্রের ক্ষেত্রে আধুনিক বিশ্বে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আধুনিক সব অস্ত্র তৈরি হয়েছে। সেসব অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। আকাশ থেকে ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে, সেই অস্ত্র মাটি ফুঁড়ে লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করছে। প্রযুক্তি কোথায় নিয়ে গেছে অস্ত্রকে! কিন্তু আদি ও অকৃত্রিম একটি অস্ত্র ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে। এই অস্ত্রটি হচ্ছে তৈলাস্ত্র। তেল যখন অস্ত্র- তৈলাস্ত্র। ব্যাকরণের মতে না হোক, এ অধম লেখকের মতে, নিপাতনে সিদ্ধ। কোনো একসময় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তৈলাস্ত্র প্রয়োগের কথা শুনেছি আমরা। সেই তৈলাস্ত্র প্রয়োগ করতে গিয়ে দক্ষতার অভাবে অনেকের অস্ত্র বুমেরাং হয়ে গেছে। আবার এই অস্ত্র সংগ্রহে রাখাটাও অনেকের জন্য ক্ষতিকর হয়েছে। কাজেই তৈলাস্ত্র ব্যবহার বা প্রয়োগ করাই উচিত। কিন্তু সেটা করার আগে জানা দরকার তেল কী ধরনের অস্ত্র। কোথায়, কখন, কিভাবে তৈলাস্ত্র প্রয়োগ করতে হয়।
কোত্থেকে কেমন করে তেল জিনিসটা এলো, সেটা নিশ্চয় নতুন করে বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা সাধারণত কয়েক ধরনের তেলের সঙ্গে পরিচিত। এক ধরনের তেল আমাদের রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। আরেক ধরনের তেল ব্যবহৃত হয় গাড়িতে। এ ছাড়া তেল ব্যবহৃত হয় ছবি আঁকার কাজে। তেল ব্যবহার করা হয় রাসায়নিক নানা দ্রব্য তৈরিতেও। অর্থাৎ তেল ছাড়া আমরা অচল। নিজের চরকায় তেল দেওয়ার উপদেশ আমরা আশৈশব শুনে আসছি। আবার আমরা এটাও বিলক্ষণ জানি, তেলা মাথাতেই তেল দিতে হয়। এই যে তেল দেওয়া, এটাই হচ্ছে প্রয়োগের মোক্ষম ব্যাপার। তেল দিতে জানতে হয়। তেলকে সেহ জাতীয় পদার্থ উল্লেখ করে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মশায় লিখেছেন, 'বাস্তবিকই তৈল সর্বশক্তিমান। যাহা বলের অসাধ্য, যাহা বিদ্যার অসাধ্য, যাহা ধনের অসাধ্য, যাহা কৌশলের অসাধ্য, তাহা কেবল একমাত্র তৈলের দ্বারা সিদ্ধ হইতে পারে।' সেটা কেমন করে সম্ভব? তাঁর মতে, 'যে সর্বশক্তিময় তৈল ব্যবহার করিতে জানে সে সর্বশক্তিমান। তাহার কাছে জগতের সকল কাজই সোজা,- তাহার চাকরির জন্য ভাবিতে হয় না...' ইত্যাদি। শাস্ত্রী মশায় লিখছেন, 'যে তৈল দিতে পারিবে তাহার বিদ্যা না থাকিলেও প্রফেসর হইতে পারিবে...।' শাস্ত্রী মশায়ের কথা অমৃত সমান/তেল নিয়ে করেছেন বিচিত্র বয়ান।
তো এই তেল দেওয়ার নমুনা দেখা যাক। একটা গল্পই বলা যাক। সুকুমার রায়ের এই গল্পটির নাম বাজে গল্প। ঘটনার জায়গা কলকাতা। সেই কলকাতার সাহেববাড়ি থেকে গোষ্ঠবাবুর ছবি এসেছে। তাই নিয়ে বাড়িতে হৈহৈ কাণ্ড রৈরৈ ব্যাপার। সবাই সেই ছবি দেখার জন্য ছুটছে। যে দেখে সেই বলে, 'কী চমৎকার ছবি!' না বলারও কোনো কারণ নেই। সাহেবদের আঁকা বলে কথা! কেউ বলে, 'সবচেয়ে সুন্দর হয়েছে বাবুর মুখের হাসি।' সেটা শুনে আরেকজন বলে, 'সাহেব হাসিটুকু ধরেছে খাসা।' কেউ বলে, 'চোখ দুটো যা এঁকেছে, একেবারে হাজার টাকা দাম।' এমনকি বাড়িতে কাপড় নিতে এসেছিল যে ধোপা, সেও বলে, 'তোফা ছবি!' সবাই মিলে এভাবেই এক এক করে ছবির নাক-মুখ, দাড়ি-গোঁফ ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করে প্রমাণ করে দিলেন যে ছবিটি একেবারে নিখুঁত। তেলের কী চমৎকার ব্যবহার! কিন্তু এখানেই থেমে থাকলে তো তেল ব্যবহারের আরেকটি দিক বাকি থেকে যাচ্ছে। সবাই যখন এই কাজে ব্যস্ত, তখন বাবু এলেন। তিনি এসে ছবির পাশে দাঁড়ালেন। সবাই বাবুর সঙ্গে ছবি মিলিয়ে দেখে আরেক দফা প্রশংসা করার আগেই বাবু বললেন, 'মস্তবড় ভুল হয়ে গেছে। ছবিটা ভুল করে পাঠানো হয়েছে। ওটা অন্য ছবি। এখন ওটা ফেরত দিতে হবে।'
এমন কথা শোনা মাত্র আবার কলরব। বাড়ির সরকার এবার বললেন, 'এই তো আমাদের ঠকাতে চেয়েছিল। পারেনি।' একজন বলে উঠলেন, 'ছবি তো নয় যে গঙ্গাযাত্রার জ্যান্ত মড়া।' ধোপা বলল, কাপড় পরেছে যেন চাষার মতো।' নাপিত বলল, 'চুল কাটা দেখে মনে হচ্ছে মাথার ওপর কাস্তে চালানো হয়েছে।' ইত্যাদি। তো, এই হচ্ছে তেল। অর্থাৎ বাজারে আমরা যে তেল কিনি, তার বাইরে আরেক ধরনের তেল হচ্ছে মুখের কথা। যদিও বলা হয়ে থাকে, শুকনো কথায় চিঁড়ে ভিজে না, কিন্তু ভেজাতে কিংবা ভজাতে কথার চেয়ে ভালো তেল আর নেই। কথাই তেল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই কথার তেল যাঁরা ব্যবহার করতে পারেন, তাঁদের আর পেছনের দিকে তাকাতে হয় না। আজকের দিনে তাঁরাই বলতে পারেন, 'স্কাই ইজ দ্য লিমিট'। এই তেল যাঁদের সম্পদ, তাঁদের কী বলা যায়? তেলবাজ? শব্দটি কি আইনসিদ্ধ হলো? নিপাতনে সিদ্ধ ধরে নেওয়া যাক।
তেলবাজ যাঁরা, তাঁদের জয়জয়কার সর্বত্র। তেল মেরে যাঁরা চলেন, তাঁদের শুধু একটি বিষয়ে ভীষণ হিসাবি হতে হয়। যেখানে তেল দিচ্ছেন, সেই জায়গাটি ঠিক আছে তো? তেলের নির্দিষ্ট কাজ আছে। কিন্তু জায়গা মতো তেল না পড়লে তাতে উল্টো ফল হতে পারে। কিছু সময় আসে, যখন তেল খুবই মহার্ঘ্য হয়ে দাঁড়ায়। আবার এমন মানুষও পাওয়া যায়, একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর তেল যাঁদের খুবই কাম্য হয়ে দাঁড়ায়। সে রকম একটি গল্পের সন্ধান করা যাক।
পৌরাণিক আমলের গল্প। দ্রোণাচার্যের কথাই ধরা যাক। দ্রোণাচার্যকে ধরে নেওয়া হয় সেই আমলের সেরা মেধাজীবী। কিন্তু সঠিকভাবে তেল প্রয়োগে ব্যর্থ হওয়ায় এই মেধাবীকেও একসময় নিতান্ত দুঃসময় কাটাতে হয়েছে। সেই গল্পটাই করা যাক।
বাবা ভরদ্বাজ মুনির আশ্রমে যাগযজ্ঞের বৈদি আচারসম্মত পরিবেশে বড় হয়েছেন দ্রোণ। ছোটবেলা থেকেই এই শিক্ষা পেয়েছেন। নিজেকে একজন বড় অস্ত্র শিক্ষক হিসেবে গড়ে তোলেন তিনি। কিন্তু দারিদ্র্য তাঁর পিছু ছাড়েনি। নিদারুণ দারিদ্র্যের অভিজ্ঞতা তাঁর। সে আমলে নিজের ছেলের জন্য একটু দুধ সংগ্রহ করাও একসময় দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছিল তাঁর জন্য। দারিদ্র্যের কশাঘাতে একসময় তিনি দেশত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু যাবেন কোথায়? ভাবলেন, একবার ধনীদের দ্বারস্থ হবেন? কার কাছে যাওয়া যায়? মনে পড়ে গেল দ্রুপদের কথা। শৈশবের বন্ধু দ্রুপদ। দ্রুপদের বাবা তাঁকে পাঠিয়েছিলেন ভরদ্বাজ মুনির কাছে নানা বিদ্যায় শিক্ষিত হতে। শৈশব বা কৈশোরের সরলতার কারণেই দুই কিশোর সব কিছুকে সমদৃষ্টিতে দেখতে ও ভাবতে অভ্যস্ত ছিল। আবেগের বশে কিশোর দ্রুপদ একসময় বলে ফেলে, তোমারও যা, আমারও তাই। আমি পাঞ্চাল দেশের রাজা হলেও কখনো এটা ভুলব না। তো, হতদরিদ্র বন্ধু গেলেন পাঞ্চালের রাজার দরবারে। শুরুতেই ভুল করে ফেললেন তিনি। কারণ দ্রুপদ তো তখন আর সেই শিশুটি নেই। তিনি তখন রাজা। রাজারা এক ধরনের তেলে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। তা সে পুরাণ হোক বা যে কোনো কাল- তেল ক্ষমতার চরকার পাশে পাশেই থাকে। তো দ্রোণ স্ত্রী-পুত্র নিয়ে পাঞ্চালের রাজধানীতে গিয়ে হাজির হলেন রাজসভায়। পুরনো দিনের বন্ধুত্বের কথা মনে করিয়ে দিলেন রাজাকে, 'সখায়ং বিদ্ধি সামিতি।'
না, এমন সম্ভাষণের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না রাজা দ্রুপদ। তিনি ততদিনে সিংহাসনে বসে তেলে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তিনি বললেন, 'ব্রাহ্মণ তুমি নিতান্তই অশিক্ষিত। তাই তোমার কোনো কাণ্ডজ্ঞান জন্মায়নি। তুমি জানো না, রীতি অনুযায়ী কাকে কেমন করে সম্ভাষণ করতে হয়।'
দ্রোণ বুঝলেন, যে উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি এসেছেন, তা এখানে পূরণ হবে না। তিনি ফিরে গেলেন। এরপর তো অন্য ইতিহাস।
ইতিহাসের শিক্ষা এই, তেল ছাড়া চলে না। সব দক্ষতার সেরা দক্ষতা হচ্ছে তেল প্রয়োগ। অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে তেল প্রয়োগ করতে জানতে হবে। তা হলে ক্ষমতাধর হওয়া যাবে। এই তৈলাস্ত্র প্রয়োগের দক্ষতা অর্জন করতে পারলেই জীবনে সাফল্য আসবে। অতএব, সবাই মিলে তৈলাস্ত্র প্রয়োগে দক্ষতা অর্জন করুন। অন্যথায় অবস্থা হলেও হতে পারে করুণ।
লেখক : সাংবাদিক
habib.alihabib@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.