দেশবাসীর আবেগ-অনুভূতির প্রতি অবমাননা-পররাষ্ট্রসচিবের উক্তি

শরিয়াহর নামে সৌদি আরবের রাজতান্ত্রিক বিচার, সেই বিচারে একজনের জীবনের বদলা হিসেবে আট বাংলাদেশির শিরশ্ছেদের ঘটনা যখন বিশ্বব্যাপী অমানবিক ও নিষ্ঠুর বলে আখ্যায়িত, তখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব সাফাই গাইছেন। শনিবার পররাষ্ট্র দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন করে তিনি দাবি করছেন, ‘অযৌক্তিক কিছু হয়নি’। পররাষ্ট্রসচিবের এমন মন্তব্য যেমন দায়িত্বহীন তেমনি নিহত ও তাঁদের স্বজনদের প্রতি সহানুভূতিহীন।


প্রতিটি দেশেরই নিজস্ব আইন ও নীতিনৈতিকতার অধিকার রয়েছে। কিন্তু আজকের বিশ্বে কোনো দেশই বিচ্ছিন্ন নয়। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের ধারণাও কোনো বিশেষ দেশের বেলায় বিপরীত হতে পারে না। সে কারণেই সৌদি আরবে আট বাংলাদেশি নাগরিকের শিরশ্ছেদ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। পৃথিবীর বহু দেশে মৃত্যুদণ্ড বৈধ হলেও প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদের নজির খুব বেশি নেই। বিচারের অর্থই হচ্ছে, দোষী ও ক্ষতিগ্রস্ত উভয়েই উপলব্ধি করবে যে, বিচারের রায় পক্ষপাতহীন ও প্রতিহিংসাহীন হয়েছে। সেটাই শাস্তিপ্রাপ্ত ও তাঁদের স্বজনদের সান্ত্বনা। কিন্তু যে আট বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ করা হয়েছে, তাঁদের কোনোই সান্ত্বনা রইল না। তাঁদের স্বজনেরা কি মানতে পারবেন যে, অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে ন্যায়বিচার হয়েছে?
পররাষ্ট্রসচিবই বা কীভাবে নিশ্চিত হলেন, একজনের জীবনের বিনিময়ে আটজনের প্রাণ হরণ যৌক্তিক? সৌদি আরবের রাজতান্ত্রিক স্বৈরশাসকের বিচারের মানদণ্ডই কি তাঁর যৌক্তিকতার মানদণ্ড? পাশাপাশি এই প্রশ্নও উঠবে, দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে চলা বিচারে বাংলাদেশ সরকার তার নাগরিকদের সুবিচার প্রাপ্তির জন্য কী কী ব্যবস্থা নিয়েছিল?
পররাষ্ট্রসচিব মিজারুল কায়েস বলেছেন, ‘আইনের শাসনে বিশ্বাস করলে সৌদি আরবের বিচার মানতে হবে।’ বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত বলেছেন, নিহতের পরিবার আসামিদের ক্ষমা না করায় বিচারের ব্যাপারে তাঁদের কিছু করার ছিল না। অর্থাৎ তাঁর বক্তব্যেও একধরনের কৈফিয়তের সুর ছিল, যা আমাদের পররাষ্ট্রসচিবের কথায় ছিল না। এটি খুবই দুঃখজনক। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থার নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বাংলাদেশের মানুষ যখন বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে এই বিচারের প্রতিবাদ জানিয়েছে, তখন পররাষ্ট্রসচিবের এই উক্তি তাদের আবেগ-অনুভূতির প্রতি চরম অবমাননারই শামিল।

No comments

Powered by Blogger.