চারদিক-বিবিসি বাংলার ৭০ বছর

বিবিসি বাংলার কথা বলছি। দীর্ঘ ৭০ বছরের পথপরিক্রমায় নানা মজার ঘটনাও ঘটেছে এই বেতারে। তারই একটি গল্প দিয়ে শুরু করছি। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভাই অধ্যাপক শাহেদ সোহরাওয়ার্দী একবার ভাইসরয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে বিলেত ভ্রমণে যান। এ সময় বিবিসি বাংলা বিভাগ তাঁর একটি ভাষণের ব্যবস্থা করে।


ভাষণটি সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। তুখোড় ইংরেজি বলতে পারতেন শাহেদ সোহরাওয়ার্দী। কিন্তু বাংলাটা ঠিক ওইভাবে আসত না তাঁর। ব্যাপারটা জেনে নিয়ে বিষয়টার একটা রফা করা হলো। সরাসরি সম্প্রচার হওয়া অনুষ্ঠানটায় কঠিন বাংলা শব্দের উচ্চারণ ফিসফিস করে বলে দিচ্ছিলেন সুধীন ঘোষ। কিন্তু এই ফিসফিসানির সবটা কি আর যাচ্ছিল শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর কানে? একটা শব্দ বুঝতে না পেরে অধৈর্য হয়ে তিনি ধমকের সুরে বলে উঠলেন, ‘কান্ট ইউ হুইসপার লাউডার?’ অর্থাৎ ‘তুমি কি আরও জোরে ফিসফিস করতে পার না?’
এখন খবরভিত্তিক বিভিন্ন ওয়েবসাইট তো রয়েছেই, সেই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী টুইটার, ফেসবুক, মাইস্পেস, স্কাইপে, বিভিন্ন ব্লগিং সাইটের উত্থানের ফলে মূলধারার গণমাধ্যমগুলো যখন চাপের মুখে, ঠিক সে সময়েই বিবিসি বাংলা পা দিয়েছে ৭০ বছরে। ১৯২২ সালে ব্যক্তিমালিকানায় বিবিসির যাত্রা শুরু। তখন এর পরিচয় ছিল ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কোম্পানি লিমিটেড। ব্রিটেনের পোস্টমাস্টার জেনারেলের অনুমোদন নিয়ে তখন কেবল সন্ধ্যার দিকে অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হতো।
দুটি সাংবিধানিক দলিল, রয়্যাল চার্টার ও পোস্টমাস্টার জেনারেলের সনদের মাধ্যমে ১৯২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে পাবলিক কোম্পানি হিসেবে পথ চলা শুরু হয় বিবিসির। নতুন নাম ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন, সংক্ষেপে বিবিসি। ১৯৭৩ সালে ব্রিটেনে বাণিজ্যিক বেতার সম্প্র্রচার শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত বিবিসি একচেটিয়া সম্প্র্রচার অধিকার ভোগ করে। ব্রিটেনের বাইরে অন্যান্য ভাষার কার্যক্রমকে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস বলা হয়। ১৯২২ সালে বিবিসির নিয়মিত সম্প্র্রচারের ১০ বছর পরে ১৯৩২ সালের ডিসেম্বর মাসে বহির্দেশীয় অনুষ্ঠান সম্প্র্রচার শুরু হয়। তখন এই অনুষ্ঠান প্রচার হতো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে, যার নাম ছিল এম্পায়ার সার্ভিস। ব্রিটেন থেকে প্রথম বহির্দেশীয় অনুষ্ঠান প্রচারিত হয় ১৯৩৮ সালে। প্রথম দিকে আরবি আর পর্তুগিজ—এই দুই ভাষায় এ অনুষ্ঠান হতো। বিবিসির বিভিন্ন দলিলপত্রে বলা হয়েছে, ১৯৩৮ সালে মিউনিখ-সংকটের পর সে বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ সরকার জার্মান, ফরাসি, ইতালিয়ান প্রভৃতি ইউরোপীয় ভাষায় অনুষ্ঠান প্রচারের নির্দেশ দেয়। এরপর ভারতীয় বিভিন্ন ভাষার মধ্যে প্রথমে হিন্দি ভাষার অনুষ্ঠান প্রচার শুরু হয়। দিনটি ছিল ১৯৪০ সালের ১১ মে। এরপর একে একে তামিল, বাংলা, গুজরাটি, মারাঠি, উর্দু আর নেপালি ভাষাতেও অনুষ্ঠান শুরু হয়। (সূত্র: মুক্তিযুদ্ধ ও বিবিসি, আবু নাসের রাজীব)।
১৯৪১ সালের ১১ অক্টোবর সপ্তাহে ১৫ মিনিটের বাংলা অনুষ্ঠান প্রচারের মধ্য দিয়ে বিবিসি বাংলা বিভাগের অভিযাত্রা শুরু হয়। শুরুতে বাংলা বিভাগের জন্য স্থায়ী কোনো কর্মী না থাকায় বিখ্যাত ঔপন্যাসিক জর্জ অরওয়েলের ওপর দায়িত্ব পড়ে প্রথম অনুষ্ঠান আয়োজনের। অক্সফোর্ডের সুধীন ঘোষ অরওয়েলের বার্তালিপি বাংলায় অনুবাদ করে প্রচার করতেন। বাংলা অনুষ্ঠানের আয়োজনে ভিন্নতা আনতে বিশিষ্টজনদের ভাষণ প্রচারিত হতো।
গণমাধ্যম যেহেতু ঘটমান ইতিহাসের সাক্ষ্য দেয়, স্বাভাবিকভাবেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং যুদ্ধোত্তর পৃথিবীর নতুন নতুন জাতিরাষ্ট্রের অভ্যুদয়েরও সাক্ষী বিবিসি বাংলা। ঐতিহাসিক তাগিদেই বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সঙ্গেও বিবিসির ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা ঘটে যায়। একাত্তরের অবরুদ্ধ বাংলাদেশের সব গণমাধ্যমই ছিল তৎকালীন সেনা কর্তাদের অবৈধ সেন্সরশিপের শিকার। তখন যুদ্ধাবস্থার গতি-প্রকৃতি জানার ও বোঝার জন্য বিবিসি বাংলাই ছিল অন্যতম বাংলা বেতারমাধ্যম। পাকিস্তানি সেনাশাসকেরা এই বেতারটিকেও শত্রুজ্ঞান করত। বিবিসির অনুষ্ঠান শোনা এবং তথ্য সরবরাহ করাকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে এর শাস্তি হিসেবে দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান রেখে এক অদ্ভুত ফরমান জারি করেন সে সময়কার সেনা কর্মকর্তারা। যুদ্ধ শেষে বিবিসিকে লেখা এক চিঠি থেকে জানা যায়, পাকিস্তানি সেনারা বিবিসি শোনার দায়ে দু-একজন শ্রোতাকে গুলিও করে। তবে শুধু এখানেই শেষ নয়, বিবিসি বাংলার তখনকার সংবাদদাতা নিজামুদ্দীন আহমদ মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। বিজয়ের চার দিন আগে ১২ ডিসেম্বর মুখোশ পরা স্বাধীনতাবিরোধীরা ধরে নিয়ে যায় তাঁকে।
শুধু পাকিস্তান শাসনামলেই নয়, স্বাধীন বাংলাদেশেও ১৯৮৭ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও বিবিসির সম্প্র্রচার বন্ধ এবং বিবিসি বাংলার সাংবাদিক আতাউস সামাদকে গ্রেপ্তারের মতো ঘটনা ঘটে।
কয়েক বছর ধরে বিবিসির ব্যয় কমাতে কর্তৃপক্ষের নেওয়া বিভিন্ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যাপকভাবে কর্মী ছাঁটাইয়ের কারণে বিবিসির সাংবাদিকেরা আন্দোলনও করেন। এর রেশ লাগে বিবিসি বাংলা বিভাগেও। তার পরও ৭০ বছরে পা—এ তো খুব সহজ কথা নয়। আজকের ইন্টারনেটের যুগে হাতের কাছে নানা ধরনের ব্লগ, ফেসবুক, টুইটার সাইটে খবর মেলে। তরুণ প্রজন্মের কাছে এসব বিকল্প গণমাধ্যমের দারুণ জনপ্রিয়তা। এসব মাধ্যমকে মূলধারার গণমাধ্যমের জন্য হুমকি নয়, বরং এগুলো তথ্য পরিবেশনের নতুন সম্ভাবনা, তথ্য প্রকাশের নতুন জানালা—এমনটাই মনে করেন বিবিসি বাংলার সম্পাদক সাবির মুস্তাফা।
বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপ, নদীপথে বাংলাদেশ দুটো বিশাল সাফল্যময় সংযোজন। বর্তমানে এক কোটি ৩০ লাখ নিয়মিত শ্রোতা সকালে প্রভাতি ও প্রত্যুষা এবং সন্ধ্যায় প্রবাহ ও রাতে পরিক্রমা—বিবিসি বাংলার এই চারটি অধিবেশনে। বিবিসি তার স্বকীয় ভঙ্গি ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে যাবে আরও সামনের দিকে—সেই প্রত্যাশায় ৭০ বছর বয়সী বিবিসি বাংলার প্রতি রইল শুভ কামনা।
এম এম খালেকুজ্জামান
Khaliik@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.