সরকারের রাজনৈতিক ব্যয়-দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর কাঁধে বাড়তি বোঝা

যে দেশের সিংহভাগ মানুষ দারিদ্র্যের কষাঘাতে পিষ্ট, সে দেশের সরকারের অদূরদর্শী পরিকল্পনা কিংবা রাজনৈতিক কারণে ব্যয়ের আয়োজন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। গতকাল সহযোগী একটি দৈনিকে প্রকাশ, উল্লেখযোগ্য কাজ না থাকলেও জেলা প্রশাসকের পেছনে রাষ্ট্রের প্রতি মাসে ব্যয় হবে প্রায় অর্ধকোটি টাকা!


সম্মানী ভাতা, আপ্যায়ন ও জ্বালানি খাতে এ টাকা খরচ হবে। খবরে প্রকাশ, ইতিমধ্যে প্রশাসকদের গাড়ি কেনা বাবদ সরকারের ৪৩ কোটি টাকা এককালীন ব্যয় হয়ে গেছে।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালীকরণের দীর্ঘদিন ধরে সঙ্গত দাবি রয়েছে। কিন্তু জেলা প্রশাসকদের পেছনে যে বিপুল ব্যয়ের আয়োজন হলো, এর কোনোই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে না জনপ্রতিনিধিত্বশীল স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে। বিদ্যমান আইনে জেলা প্রশাসকদের হাতে তেমন কোনো ক্ষমতাই নেই। দায়-দায়িত্বের বিষয়টিও তেমনই। এমতাবস্থায় জেলা প্রশাসকদের পেছনে যে ব্যয় হবে তা স্রেফ রাজনৈতিক ব্যয় ছাড়া কিছুই নয়। গত ১ জানুয়ারি দেশের ৬১টি জেলা পরিষদে প্রশাসক হিসেবে যাঁরা দায়িত্ব নিয়েছেন, তাঁরা ক্ষমতাসীন জোটের নেতৃত্বদানকারী দলের স্থানীয় নেতা। একটি বিষয় স্পষ্ট যে, নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে স্থানীয় সরকার পরিচালনার পরিবর্তে দলের লোকদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার রাজনৈতিক সুবিধার ক্ষেত্রটি বিস্তৃত হবে এবং এর ফলে কাজ যা হবে তা সরকারের জন্য, জনকল্যাণে ভূমিকা থাকবে না। এর পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালীকরণের অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতিও ব্যাহত হতে বাধ্য। জেলা প্রশাসকদের যেসব দায়িত্ব সরকারের তরফে দেওয়া হয়েছে, এসব কাজ সরকারি কর্মকর্তারাই যাঁর যাঁর অবস্থানে থেকে করতে পারেন। স্থানীয় সরকারের প্রতিটি স্তরে জনপ্রতিনিধিদের নেতৃত্ব যেখানে নিশ্চিত করা খুব জরুরি, সেখানে বিদ্যমান চিত্র জনআকাঙ্ক্ষা কিংবা জনদাবির বিপরীত। অবশ্য সরকারের তরফে বলা হয়েছে, এ ব্যবস্থা সাময়িক, অচিরেই আইন অনুযায়ী মৌলিক গণতন্ত্রের আদলে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, আগে কি এ কাজটিই সম্পাদন করা জরুরি ছিল না? যদি তা হতো, তাহলেই এই বাড়তি ব্যয়ের প্রয়োজন পড়ত না, কারো কোনো প্রশ্ন তোলারও অবকাশ থাকত না এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালীকরণের অঙ্গীকার প্রতিশ্রুতিও পূরণ হতো। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক কল্যাণ, গণপূর্তবিষয়ক এবং কর আদায়, টোল নির্ধারণ ও আদায় ইত্যাদি কাজের পাশাপাশি জেলার সব উন্নয়ন কার্যক্রমের পর্যালোচনা ও উপজেলার উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন-অগ্রগতি পর্যালোচনার জন্য জেলা প্রশাসকদের নিয়োগ দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে এমনিতেই জনমনে গুঞ্জন কথা আছে বিস্তর।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালীকরণের কাজটি সম্পাদন করা অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় সরকারের সব স্তরে জনপ্রতিনিধিদের প্রতিনিধিত্ববিহীন জবাবদিহিতা, দায়বদ্ধতা এবং উন্নয়ন-অগ্রগতি নিশ্চিত করা দুরূহ। উল্লেখযোগ্য কাজ না থাকলেও জেলা পরিষদ প্রশাসকদের পেছনে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ রাষ্ট্রের খরচ হবে, তা অপচয়েরই শামিল। এত ব্যয় বহনের সামর্থ্য কিংবা সংগতি কোথায় এই গরিব দেশের? যেকোনো সরকার যদি রাজনৈতিক বিবেচনাকে প্রাধান্য দিয়ে রাষ্ট্রের উন্নয়ন-অগ্রগতির কথা ভাবে, তাহলে তা জনকল্যাণে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, তাও প্রশ্নের ঊধর্ে্ব নয়। জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে হলে জনগণের প্রতিনিধির মাধ্যমেই তা করা সম্ভব এবং গণতন্ত্রের বিকাশে কিংবা গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের পথটিও এর মধ্য দিয়েই সুগম করা যেতে পারে।

No comments

Powered by Blogger.