বিশ্বব্যাংক ও 'শাঁখের করাত'-এই সর্বনাশা খেলার শেষ কোথায়!

বাংলায় একটি বহুল প্রচলিত গান আছে, 'তুমি হাকিম হইয়া হুকুম করো, পুলিশ হইয়া ধরো/সর্প হইয়া দংশন করো, ওঝা হইয়া ঝাড়ো।' বিশ্বব্যাংকের অবস্থা যেন অনেকটা তেমনি। আবার বিশ্বব্যাংককে 'শাঁখের করাত'-এর সঙ্গেও তুলনা করা যায়। সম্ভবত সবাই জানেন, এই করাতটি আসতেও কাটে, যেতেও কাটে। আমরা নিকটঅতীতে বিশ্বব্যাংক, আবুল হোসেন ও তাঁর প্রতিষ্ঠান সাকো ইন্টারন্যাশনাল নিয়ে অনেক মুখরোচক খবর-মন্তব্য পড়েছি।


আবুল হোসেনকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর ভাবা গিয়েছিল, এবার হয়তো 'বিশ্বব্যাংক ও আবুল' উপাখ্যানের সমাপ্তি ঘটবে। কিন্তু না, বাস্তবে দেখা গেল সেই উপাখ্যানটি এখনো জীবন্ত। তবে এবার উপাখ্যানটি আমাদের কাছে এসেছে ভিন্ন রূপে এবং সম্পূর্ণ বিপরীত মেজাজে। যে আবুল হোসেনকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে সরানো হয়নি বলে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন স্থগিত করেছিল, এবার সেই বিশ্বব্যাংক আবুল হোসেনের প্রতিষ্ঠানকেই একটি বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ প্রদানের সুপারিশ করেছে। আর তা করা হলে বাংলাদেশ সরকারের গচ্চা যাবে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। গতকাল রবিবারের কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনামে প্রকাশিত খবরটি আগ্রহী পাঠকরা পড়ে দেখতে পারেন।
প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ৪৫০ মেগাওয়াটের একটি সাইকেল পাওয়ার প্লান্ট স্থাপনের জন্য ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেড (ইজিসিবি) গত বছর দরপত্র আহ্বান করেছিল। এতে অংশ নিয়ে স্পেন ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ কম্পানি আইসোলেঙ্-স্যামসাং জেভি ৩৪২ মিলিয়ন ডলার এবং ফ্রান্সের কম্পানি কোবরা ৩০০ মিলিয়ন ডলারের দরপত্র জমা দিয়েছিল। বিভিন্ন কারণে ইজিসিবি দুটি দরপত্রই অযোগ্য ঘোষণা করেছিল। আইসোলেঙ্-স্যামসাংয়ের স্থানীয় প্রতিনিধি হচ্ছে সাকো ইন্টারন্যাশনাল। বিশ্বব্যাংক এখন এই কাজটি আইসোলেঙ্-স্যামসাংকে দেওয়ার জন্য সুপারিশ ও তদবির করে চলেছে। যেহেতু এই প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক একক বড় ঋণদাতা, তাই তাদের তদবির মেনে নিয়ে আইসোলেঙ্-স্যামসাং তথা সাকো ইন্টারন্যাশনালকেই কাজটি দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। এতে বাংলাদেশের যে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে, তা এ দেশের দরিদ্র জনগণকেই বহন করতে হবে।
বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনেক খেলাই দরিদ্র দেশের বাসিন্দা হিসেবে আমাদের দেখতে হয়। আমরা নিরুপায়, তাই চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া যেন আমাদের আর কিছুই করার নেই। আমাদের গ্যাসক্ষেত্র, কয়লা খনি তাদের সুপারিশে লিজ দিতে হয়, দেশের জন্য ক্ষতিকর চুক্তি করতে হয় তাদের পছন্দসই বিদেশি কম্পানির সঙ্গে। এক ঋণ তারা বহুভাবে আদায় করে নেয়। তবুও আমরা তার প্রতিবাদ করতে পারি না। কারণ তাদের ঋণপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের অর্থনীতিতে ধস নামে। আমরা সেই ধসের মোকাবিলা করতে অক্ষম। কিন্তু এ অবস্থা কি অনন্তকাল ধরেই চলতে থাকবে।
পদ্মা সেতু যেমন আমাদের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য, তেমনি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গতি সঞ্চারের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। সেতুটির কাজ শুরু হতে যাবে, এমন সময় বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন স্থগিত করে দিল। স্থগিত করার অজুহাত হিসেবে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিল এবং দুর্নীতির জন্য নানাভাবে তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন ও তাঁর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান সাকো ইন্টারন্যাশনালকে দোষারোপ করা হয়েছিল। আজ সেই অম্ল আবুল হোসেন এত মধুর হয়ে গেলেন কিভাবে যে খোদ বিশ্বব্যাংকই তাঁর প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আরেকটি বড় কাজের সুপারিশ করছে! আমাদের কাছে সব কিছুই একটি ধাঁধার মতো মনে হচ্ছে। ৩০ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা আর কোনো বিদেশি শক্তির দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতে চাই না। কেউ দুর্নীতির আশ্রয় নিলে আমরা তার বিচার দাবি করি। কিন্তু একবার দুর্নীতির অভিযোগে ব্যক্ত নয়, দেশের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, আরেকবার সেই দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিকে পুরস্কৃত করা_আমরা বিশ্বব্যাংকের এই দ্বৈতনীতির অবসান চাই।

No comments

Powered by Blogger.