কারও সর্বনাশ মানে কারও পৌষমাস নয় by সুভাষ সাহা

পাকিস্তান মুসলিম লীগের (এফ) প্রধান পীর পাগারা গত ৪ নভেম্বর করাচিতে মুসলিম লীগের অন্যান্য অংশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের সময় ঠাট্টার ছলে বলেছিলেন, নভেম্বর মাস তো আবহাওয়া পরিবর্তনের মাস, এ মাসে সরকারও পরিবর্তন হবে। পীর পাগারার সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাকিস্তানি মাত্রই জানেন। তাই তিনি যখন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রেসিডেন্ট মোশাররফের পাকিস্তান প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় প্রহর গোনেন তখন কেউ তেমন গা


করেন না। কিন্তু তার সরকার পরিবর্তনের ভবিষ্যদ্বাণীতে অনেকেরই চমকে ওঠার কথা। আমাদের এখানেও কর্নেল অলি আহমদের চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই সরকার পরিবর্তন হবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী এবং পরে সাল-তারিখ সংশোধন করে নতুন বছরের বাজেটের আগেই সরকারের বিদায় ঘণ্টা বাজার আগাম ঘোষণায় অনেকেই হতচকিত হয়েছিলেন। অতীতে সামরিক বাহিনীর এসব পয়েন্টসম্যানের এ ধরনের ভবিষ্যদ্বাণী ফলে গিয়েছিল কি-না! পাকিস্তানে পীর পাগারার বক্তব্য কিন্তু হালে পানি পেতে শুরু করেছে। বিশেষত মেমোগেট কেলেঙ্কারিতে নির্বাচিত জারদারি-গিলানি সরকার এবং সামরিক বাহিনী-গোয়েন্দা সংস্থা (আইএসআই) প্রকাশ্যে পরস্পর মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসার পর পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ হয়তো ভাবতে শুরু করেছে, দেশে আবার একটা কিছু ঘটতে চলেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র চায় না বলে পাকিস্তানে মেমোগেটকে কেন্দ্র করে সামরিক ক্যু ঘটিয়ে সরকারের বদল ঘটানো দুঃসাহস সম্ভবত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হবে না। সেনাবাহিনী চাইবে বৈধভাবে রাজনৈতিক সমর্থন ও জনসমর্থনের ভিত্তিতে জারদারি-গিলানি সরকারকে অপসারণ করতে। কারণ, তারা ক্ষমতায় বসার সময় থেকে শুরু করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সামরিক বাহিনীর অবস্থানকে দুর্বল করতে চেয়েছেন। এজন্য পাকিস্তানের প্রধান দুই দল নওয়াজের নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগ ও জারদারির নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান পিপলস পার্টি এক ছাতায় নিচে চলে আসে। গণতন্ত্রকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার জন্য তারা একটি চার্টারেও সই করে। কিন্তু সেই হ্যাপি ম্যারেজ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সম্ভবত নওয়াজের ভাই পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে ধর্মীয় মৌলবাদী ও জঙ্গি সংগঠনগুলোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং জারদারির কিছু ভ্রান্ত পদক্ষেপ এই ঐক্যে ফাটল ধরাতে সাহায্য করে। এদিকে জারদারি সরকারের অব্যাহত সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ এবং সেনাবাহিনী ও আইএসআইর সরকারের ওপর খবরদারি করার প্রচেষ্টাকে অব্যাহতভাবে খাটো করার চেষ্টাটা সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের বিরাগের কারণ হয়। ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ে জঙ্গি হামলার ঘটনায় পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংযোগ থাকার অভিযোগ আসার পর পাকিস্তান সরকার আইএসআই প্রধান জেনারেল সুজা পাশাকে ভারতে পাঠানোর ঘোষণা দেন। এ ব্যাপারে মার্কিন সমর্থন থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সুজা পাশা ভারত সফর করেননি তখন। সেনা চাপে সরকারকেই সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহার করতে হয়েছিল। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কয়েকটি নীতিনির্ধারণী বৈঠকেও পাকিস্তানের সেনা কর্তাদের প্রতিনিধিত্ব করতে দেখা গেছে। এমনকি ভারতকে বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের বৈঠকেও সেনা ও আইএসআইর শীর্ষ কর্তাদের রাখতে হয়েছে। যদিও এটি নিতান্তই অর্থনৈতিক বিষয়। এভাবে জারদারি-গিলানির বেসামরিক সরকার ক্রমাগতভাবেই সামরিক বাহিনীর ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। কেন তাদের এ হাল হলো? সুশাসন প্রদানে ব্যর্থতা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অহরহ বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং সন্ত্রাসী ঘটনার রাশ টেনে ধরার ক্ষেত্রে ব্যর্থতাজনিত কারণে সরকারের জনসমর্থন হ্রাস পেয়েছে। ফলে সরকার ক্রমান্বয়ে স্বাধীন পদক্ষেপ নেওয়ার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে। আর এরই সুযোগ গ্রহণ করে সামরিক বাহিনী। এখন মেমোগেট দিয়ে সরকারকে ঘায়েল করার চেষ্টা করছে। এর সঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট যুক্ত হয়েছে। নওয়াজরাও বসে নেই। অর্থাৎ সরকারকে দেশের নিরাপত্তাবিরোধী প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে। এভাবেই জারদারি সরকারের পতন ঘটানোর তালে আছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। সরকারও বসে নেই। ইতিমধ্যে গিলানি সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তারা সরকারের ভেতর সরকার বরদাশত করবেন না। অর্থাৎ তারা স্বাধীন অবস্থান নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভবিষ্যতে সেনা প্রভাবমুক্ত শক্তিশালী সরকার তারা উপহার দিতে পারবেন_ এই প্রত্যয় প্রকাশ করছে। এভাবে আসলে জারদারি-গিলানি এবং কিয়ানি-সুজা পাশা পরস্পরের মাথায় বন্দুক তাক করেছে। বিরূপ অবস্থার আশঙ্কা এখন উভয় পক্ষকেই পরস্পরের দিক থেকে বন্দুক নামিয়ে নিতে বাধ্য করতে পারে। নচেৎ যে কোনো একপক্ষ ক্ষমতার মঞ্চ থেকে বিদায় নিতে হতে পারে। তবে সে অবস্থায় পাকিস্তানের মুরবি্ব যুক্তরাষ্ট্র জারদারি-গিলানির চেয়েও শক্তিশালী বেসামরিক সরকার চাইবে, কোনো অবস্থাতেই সামরিক সরকার তারা চাইবে না। এটা পশ্চিমাদের পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রে পরিবর্তিত নীতিও। সবসময়ের বন্ধু চীনও একই মত পোষণ করতে পারে। কাজেই কারও সর্বনাশ হলে কারও পৌষমাস হবে_ এমনটা ভাবা পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বোকামি হবে।

সুভাষ সাহা :সাংবাদিক

No comments

Powered by Blogger.