বছরের শেষ ব্যাংকার্স বৈঠক-তারল্য ও মূলধন সংরক্ষণ ব্যাংকের প্রধান দুই হুমকি

০১২ সালকে দেশের ব্যাংক খাতের জন্য সংস্কারের বছর ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।  কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য এখনো অনেক পথ বাকি। এক বছর ধরে এই স্থিতিশীলতার জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। বিশ্বমন্দা পরিস্থিতিতে এখন নতুনভাবে স্থিতিশীলতার দিকে নজর দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিদায়ী ডেপুটি গভর্নর নজরুল হুদা ব্যাংকার্স বৈঠকে ব্যাংক খাতের জন্য দুটি হুমকির বিষয় তুলে ধরেন।


তিনি বলেন, যথাযথ তারল্য ব্যবস্থাপনা হচ্ছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে মূলধন বৃদ্ধি। প্রথম আলোকে নজরুল হুদা বলেন, ‘অসচ্ছল ব্যাংক টিকতে পারে, কিন্তু তারল্য না থাকলে ব্যাংক আর চলতে পারে না। সে কারণে আমি মনে করি, ২০১২ সালে ব্যাংক খাতের প্রধান মনোযোগ হতে হবে তারল্য ব্যবস্থাপনার দিকে।’ তিনি আরও বলেন, ২০১২ সালের মধ্যে চেষ্টা থাকা উচিত ব্যাংকগুলোর ঋণ ও আমানতের অনুপাত বর্তমান ৮৫ থেকে নামিয়ে ৮২ শতাংশে নিয়ে আসা।
বছর শেষে তফসিলি ব্যাংকগুলোকে নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকার্স সভায় গতকাল সোমবার এসব আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান এতে সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকে গভর্নর প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন-২০১০’ উন্মুক্ত করেন। বৈঠকে বিদায়ী তিন ডেপুটি গভর্নর নজরুল হুদা, জিয়াউল হাসান সিদ্দিকী ও মুরশিদ কুলী খান এবং অপর ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম, নির্বাহী পরিচালক আবু হেনা মোহাম্মদ রাজি হাসান, এস কে সুর চৌধুরী, তফসিলি ব্যাংকগুলোর শীর্ষস্থানীয় নির্বাহীরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে লিখিত বক্তব্যে গভর্নর বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা অর্জনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। কাজেই ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং আর্থিক ব্যবস্থায় ঝুঁকি ও দুর্বলতাসংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব মূল্যায়ন সর্বসাধারণের কাছে তুলে ধরার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘আর্থিক ব্যবস্থায় অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে, এ রকম হুমকি মোকাবিলায় ব্যাংকগুলোর আকস্মিক ঘটনা মোকাবিলার পরিকল্পনা থাকতে হবে। ব্যাংকিং খাতে অনৈতিক প্রতিযোগিতা ও বিশৃঙ্খল আচরণও পরিহার করতে হবে। কেননা, তা আর্থিক ব্যবস্থায় অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে।’
সূত্র জানায়, বৈঠকে নজরুল হুদা বলেন, দেশের ব্যাংক খাত ব্যাসেল-২-এর (ব্যাংকিংয়ে আন্তর্জাতিক মানসংক্রান্ত ব্যাসেল কমিটির সুপারিশ) মধ্যে আছে। এ ধাপে মূলধন সংরক্ষণের হার হচ্ছে ১০ শতাংশ। কিন্তু এখন থেকে মূলধন সংরক্ষণের হার ১২-১৪ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। তাতে ব্যাসেল-৩-এর দিকে ব্যাংক খাত দ্রুত অগ্রসর হতে পারবে। তিনি বলেন, ‘উন্নত দেশগুলোর সামর্থ্য আছে। তারা আর্থিক খাতের প্রায় দেউলিয়া অবস্থাকে যেমনভাবে সামাল দিতে চেষ্টা করছে, আমরা তা পারব না। ফলে আমাদের ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচির মধ্যে যেতে হবে। ২০১২ সালকে তাই আমাদের সংস্কারের বছর হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।’
তিন ডেপুটি গভর্নর—নজরুল হুদা, জিয়াউল হাসান সিদ্দিকী ও মুরশিদ কুলী খান—২৯ ডিসেম্বর তাঁদের মেয়াদ পূর্তি করবেন। বৈঠকে গভর্নর উল্লেখ করেন, এই তিন ডেপুটি গভর্নরের এটা শেষ ব্যাংকার্স সভা।
বৈঠক শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক এস কে সুর চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। এখন থেকে প্রতিবছর এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। উন্নত অনেক দেশ এ ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনের মূল উদ্দেশ্য দেশের অর্থনীতিতে কী অবস্থা বিরাজ করছে তা জনগণের সামনে তুলে ধরা। প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক নীতি অনুসরণ করে ব্যাসেল-২ বাস্তবায়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, তারল্য ব্যবস্থাপনা, ইসলামি ব্যাংকিংয়ের কার্যক্রম, খেলাপি ঋণের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া কিছু বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সুর চৌধুরী বলেন, পাশের দেশ ভারত ১৪ শতাংশ মূলধন রাখতে সক্ষম হয়েছে, বাংলাদেশে যা ১০ শতাংশ। তারল্যসংকট যেকোনো সময় দেখা দিতে পারে, সে জন্য তা মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবে মূলধন সংরক্ষণ বাড়ানো দরকার। এ ছাড়া ১০১৪ সাল থেকে ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়ন শুরু হবে বলে তিনি জানান।

No comments

Powered by Blogger.