আসল কথা নগর সরকার-ডিসিসি বিভক্তি by এমএ করীম

বিভক্তির পক্ষে আর বিপক্ষে যারা কথা বলছেন, কেউ আসল কাজে হাত দিতে চান না। মৌলিক প্রশ্নের সমাধানে এগিয়ে আসছেন না। সরকারি চিন্তাভাবনার পরিবর্তনের কোনো প্রস্তাবনা তুলে ধরলে কাজের কাজ হতো। বরং দেখা যাচ্ছে ঐতিহ্যের নাম করে রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি, ঘুণে ধরা অচল ডিসিসির কাঠামোকে টিকিয়ে রাখার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন 'ঢাকা' ভাগ হলো! কোন ঢাকা? শায়েস্তা খানের ঢাকা? ব্রিটিশের ঢাকা? পাকিস্তানের ঢাকা? বাংলাদেশের


ঢাকা? ঢাকা শহরের বয়স মাত্র ৪০০ বছর পূর্ণ হয়েছে। ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে সুবেদার ইসলাম খাঁর হাত ধরে বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তরের সময় থেকে এর বয়স ধরা হয়ে থাকে। ১৮৬৪ সালে ঢাকা পৌরসভা নামে পরিচিত। সে সময়ে এর আয়তন ছিল ২০ দশমিক ৭২ বর্গকিলোমিটার আর জনবসতি ছিল প্রায় ৫২ হাজার। ১৯৪৭ সালে ঢাকা প্রাদেশিক রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে। এর আয়তন বেড়ে ৩১ দশমিক ৮ বর্গকিলোমিটার হয়। লোকসংখ্যা ছিল প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ঢাকার গুরুত্ব বেড়ে যায়। ১৯৮৩ সালে সরকার ঢাকা পৌরসভাকে মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনে রূপান্তরিত করে। সে সময় এর আয়তন ছিল ৪০০ বর্গকিলোমিটার। ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের কিছুদিন আগে হঠাৎ করে বিভাগীয় কমিশনারকে পদাধিকারবলে ঢাকার মেয়রের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে অবশ্য সরকারি কর্মকর্তা নয়, এমন ব্যক্তিকে মেয়র পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৯১ সালে ঢাকা নগর কর্তৃপক্ষের কাঠামোর পুনর্বিন্যাস ও স্বায়ত্তশাসনের দাবি জোরালো হয়ে উঠলে ১৯৯৩ সালে জাতীয় সংসদে নতুন আইন পাস করে ঢাকাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হয়। ১৯৯৪ সালে এর প্রথম নির্বাচনে প্রথম নির্বাচিত মেয়র হন আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ হানিফ।
বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশনের জনসংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখ। আয়তন ৫৫০ বর্গকিলোমিটার। ডিসিসি যেসব সেবাদান করে তা হচ্ছে প্রধানত ও মূলত_ ১. পৌর কর আদায় ২. রাস্তার বাতি জ্বালানোর ব্যবস্থা করা ৩. নগরীর বর্জ্য অপসারণের ব্যবস্থা করা ৪. নগরবাসীর স্বাস্থ্য রক্ষায় মশক নিধন ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করা ৫. নগরীর রাস্তাঘাটের দেখভাল করা এবং নগর সংশ্লিষ্ট আনুষ্ঠানিকতা পালন করা।
এখন ডিসিসি ভাগ করলে একজন সাধারণ নাগরিকের কী অসুবিধা হবে তা বোধগম্য নয়। আমরা সবাই জানি, ডিসিসির ক্ষমতা কতটুকু।
বিভক্তির পক্ষে আর বিপক্ষে যারা কথা বলছেন, কেউ আসল কাজে হাত দিতে চান না। মৌলিক প্রশ্নের সমাধানে এগিয়ে আসছেন না। সরকারি চিন্তাভাবনার পরিবর্তনের কোনো প্রস্তাবনা তুলে ধরলে কাজের কাজ হতো। বরং দেখা যাচ্ছে ঐতিহ্যের নাম করে রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি, ঘুণে ধরা অচল ডিসিসির কাঠামোকে টিকিয়ে রাখার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। আমাদের দেশের বাস্তবতায় স্থানীয় সরকার প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার দায়িত্ব নিতে পৃথিবীর সব বড় শহরেই পরিকল্পিত উন্নয়ন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবহন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি নাগরিক সেবামূলক কাজ করে থাকে নগর কর্তৃপক্ষ।
ঢাকা শহরের ক্ষেত্রে ও স্বাভাবিকভাবে নগর কর্তৃপক্ষ বলতে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে ধরা হয়। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা নয়। এখানে রাজধানীর উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, ভবন ও ইমারতের নকশা অনুমোদন, নতুন প্রকল্পের আওতায় শহর সম্প্রসারণ ইত্যাদি কাজের দায়িত্বে থাকে রাজউক। এই সংস্থার প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে নগরীর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ভার ডিএমপির ওপর, যাদের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থাপনা, যানবাহনের নিবন্ধন ও চালকের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষমতা যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন দুটি সংস্থা বিআরটিসি ও ডিটিসিবির হাতে। অন্যদিকে পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশনের মতো স্পর্শকাতর নাগরিক সেবা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন 'ঢাকা ওয়াসা' নামের একটি সংস্থা।
সিটি করপোরেশনের বহু ক্ষমতা (কর্তৃপক্ষীয় ক্ষমতা) ও এখতিয়ার নেই। আইন-শৃঙ্খলা, পরিবহন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন এবং পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবার কাজগুলো ডিসিসির হাতে নেই। সে কারণে রাজধানীবাসীর (ঢাকাবাসী) সামগ্রিক সেবা কার্যক্রমে কোনো সমন্বয় নেই। এমন সমন্বয়হীনতা পৃথিবীর কোনো শহরেই দেখা যায় না। বিভক্তি বা এক_ সেদিকে নজর না দিয়ে সত্যিকারের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করা এখন জরুরি। যে দাবি (১৯৯৪ সাল থেকে) তোলা হয়েছে_ সেই 'নগর সরকার' বাস্তবায়ন করে নাগরিক সমাজের সেবা নিশ্চিত করলেই তা সার্থক হবে।

অধ্যাপক ডা. এমএ করীম : বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান

No comments

Powered by Blogger.