সরল গরল-জারদারি পেরেছেন, জিল্লুর রহমান পারবেন না কেন? by মিজানুর রহমান খান


মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে ক্ষমতায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে ক্ষমতার হাতবদল ঘটেছিল। ‘উধারে’ আসিফ আলী জারদারি-ইউসুফ রাজা গিলানি, ‘এধারে’ জিল্লুর রহমান-শেখ হাসিনা। বিজয়ের ৪০ বছর পূর্তিতে আসুন জুলফিকার আলী ভুট্টোর একদা উচ্চারিত ‘উধার-এধারের’ নির্বাচন কমিশনকেন্দ্রিক রাজনীতিটা দেখি। ১৯৫৬ সালের ২৫ জুন অবিভক্ত পাকিস্তানে প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত হয়েছিলেন। পাঁচ বছর মেয়াদে।


তবে তাঁর সর্বোচ্চ বয়সসীমা ছিল ৬৫ বছর। ’৫৮-এর সামরিক শাসনে নির্বাচন কমিশনের অস্তিত্বের বিলুপ্তি ঘটে। ’৬২-তে নতুন সংবিধানের অধীনে তিন বছর মেয়াদে একজন নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জুটেছিল। ওই সময় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে একজন করে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ পেলেন। তাঁরা ছিলেন পদমর্যাদায় হাইকোর্টের কর্মরত বিচারক। ’৬৯-এ ’৬২ সালের সংবিধানের বিলুপ্তি ঘটল। নতুন নির্বাচন কমিশন এল অস্থায়ী সংবিধান আদেশ বা পিসিওর অধীনে। সত্তরের নির্বাচন পরিচালনা করেছিলেন বাঙালি বিচারপতি আবদুস সাত্তার (পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি)। ’৭১-এ অভ্যুদয় ঘটল বাংলাদেশের। ’৭৩-এ কর্মরত বিচারকদের দিয়েই পাকিস্তানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনার নিয়োগের বিধান হলো।
২০১০ সালের জুলাই মাসে পাকিস্তানের সংবিধানের ১৮তম সংশোধনী এল। ১৩ জুন ২০১১ পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশনের ইতিহাসে একটি লাল হরফে লেখা দিন। কারণ, এদিন প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে বিচারপতি (অব.) হামিদ আলী মির্জার নেতৃত্বে চার সদস্যের নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছিল সরকারি ও বিরোধী দলের মতৈক্যের ভিত্তিতে।
এর আগেই বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন সার্চ কমিটি নিয়োগের ফর্মুলা দেয়। কিন্তু ক্ষমতাসীনেরা কানে তুলো গুঁজে, কার্যত তা প্রত্যাখ্যান করেন।
পাকিস্তানে ১৮তম সংশোধনীতে একটি যৌথ সংসদীয় কমিটি সৃষ্টি করা হয়েছে। এর ১৬ জন সদস্য। সিনেট ও জাতীয় পরিষদ থেকে সরকার ও বিরোধীদলীয় সমসংখ্যক সদস্য নিয়ে এই কমিটি স্পিকার দ্বারা গঠিত। এই কমিটির সুপারিশে রাষ্ট্রপতি জারদারি চার সদস্যের কমিশন পুনর্গঠন করেন। সংবিধানে বলা আছে, সিইসি বাছাইয়ে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের নেতার সঙ্গে পরামর্শ করে শুনানির জন্য তিনটি নাম কমিটিতে দেবেন। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতার মধ্যে মতানৈক্য হলে উভয়ে পৃথক তালিকা কমিটিতে পাঠাবেন।
পাকিস্তান শুধু এখানেই থেমে থাকেনি। গত মাসে সংসদে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনারদের চাকরির শর্তাবলি নির্দিষ্ট করতেও একটি বিল এনেছে। তাদের আরও একটি সাফল্য আছে।
আমাদের সাংসদেরা ঋণখেলাপি, টেলিফোনের বিলখেলাপি, নির্বাচনের আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রদানেও তাঁদের গড়িমসির কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। আমরা তাই ধরেই নিয়েছি, নির্বাচনী আয়-ব্যয়ের যে বিবরণ নির্বাচন কমিশন পাবে, সেটা নিয়েই তারা ধন্য হয়ে যাবে। আমাদের ইসি এ বিষয়ে কোনো ধরনের আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ না করতে ধনুকভাঙা পণ করেছেন।
এ রকমের একটি পরিবেশে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন নির্বাচিত সাংসদদের কাছে সম্পদ ও দায়দেনার বিবরণ চাইবে এবং সেটা আদায়ও করে নেবে, সেটা আমরা ভাবতে পারি না। অনেকেই একমত হবেন, বাংলাদেশের নিম্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতি এতটা সমর্থন করে না। তাহলে প্রশ্নটা আরও ধারালো হয়ে ওঠে। পাকিস্তান পারলে আমরা পারব না কেন?
গত জুনে পাকিস্তানের নতুন নির্বাচন কমিশন দায়িত্বভার নিয়েই জাতীয় পরিষদ, সিনেট ও প্রাদেশিক বিধানসভাগুলোর সদস্যদের আলটিমেটাম দেয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রত্যেককে সম্পদ ও দায়দেনার বিবরণী জমা দিতে হবে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনকে সরকারি দলের সাংসদেরাও পাত্তা দিতে চাননি। এরপর আচানক একটা শোরগোল পড়ে যায়, বিনা মেঘে বজ্রপাত ঘটে। নির্বাচন কমিশন এক দিনে এক আদেশে ২২২ জন আইন-প্রণেতার সদস্যপদ স্থগিত ঘোষণা করে। এর মধ্যে জাতীয় পরিষদের ১০৩ জন সদস্য ছিলেন। ছিলেন প্রায় এক ডজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, যাঁদের মধ্যে স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীও ছিলেন।
ওই ঘটনার শিক্ষা এই যে, সাংসদের পদ ইসি স্থগিত করতে পারে। বাংলাদেশেরও এই ওষুধ লাগবে।
বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ নিয়ে রাষ্ট্রপতির সংলাপ ঘিরে একটা উত্তাপ-উত্তেজনা চলছে। তবে মনে হয় না, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান না করার জগদ্দল পাথরটি নড়বে। তারা চাইলে লটারি একটি বিকল্প হতে পারে। একটি উন্মুক্ত সভায় উপযুক্ত সাংবিধানিক পদধারী ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে সরকারি ও বিরোধী দলের তরফে দেওয়া নাম থেকে লটারির মাধ্যমে কমিশনার বাছাই চলতে পারে। তবে কোনোভাবেই কোনো যৌক্তিক মীমাংসায় পৌঁছানোর আগ্রহ না থাকলে, এ ধরনের কোনো উপায় কোনো পক্ষই উদ্ভাবন করবে না এবং মতৈক্যে পৌঁছানোও হবে না।
আমরা লক্ষ্য করব, কোনো পদ্ধতিগত বা নীতিগত অবস্থানে পৌঁছাতে সংলাপের পক্ষ-বিপক্ষ শক্তির কারও কোনো প্রস্তুতি নেই। বাংলাদেশ এ পর্যন্ত ১০ জন সিইসি পেয়েছে। এর মধ্যে বিচারপতি এ কে এম নুরুল ইসলামই শুধু ১৯৭৭-৮৫ সিইসি ছিলেন।
সংবিধান একাধিক্রমে দুই মেয়াদে সিইসি হওয়া বারিত কিংবা উৎসাহিত করেনি। তবে এটা বলেছে, সিইসি হওয়ার পর তিনি প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত হবেন না। সিইসি পদটিও প্রজাতন্ত্রের কর্ম। তাই নির্বাচন কমিশনারদের ক্ষেত্রে স্পষ্ট বলা হয়েছে, সিইসি হওয়া ছাড়া অন্য কোনো প্রজাতন্ত্র-কর্ম তাঁদের জন্য সিদ্ধ নয়। তাই বর্তমান সিইসিকে পুনরায় নিয়োগ দেওয়া হলে এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ হতে পারে। তবে আমার অভিমত হলো, সেই ১৯৭২ থেকে এ পর্যন্ত যাঁরাই প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ পেয়েছেন, তা অন্তত সাংবিধানিকভাবে শুদ্ধ নয়। প্রত্যেকের নিয়োগের মধ্য দিয়ে সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদের অবমাননা ঘটেছে। কারণ, সংবিধান বলে দিয়েছে, আইনের বিধান করে তবেই তাঁদের নিয়োগ দিতে। কিন্তু সেটি কখনো হয়নি। এ বিষয়ে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের প্রশংসনীয় উদ্যোগ ক্ষমতাসীনেরা ভণ্ডুল করেছে। সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে তারা সংলাপ করছে। তবে বিরোধী দল ঠিক এ কারণে কোনো চিৎকার-চেঁচামেচি করেনি কিংবা করবেও না।
বরং কতগুলো চটকদার ও আত্মঘাতী বিতর্কে মজে যাবে। যেমন, এবার তারা রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের ক্ষমতা নিয়ে পড়েছে। সংলাপের সূচনা করতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগকর্তা তিনিই।
সংবিধান অনুযায়ী তিনি কোনো ভুল বলেননি। এ বিষয়ে আমি এখন যে ব্যাখ্যা দেব এটা রাষ্ট্রপতির পক্ষে যাবে। অবশ্য এটা শোনামাত্রই রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টারা ভয়ে আঁৎকে উঠতে পারেন। তাঁরা হয়তো বলবেন, সর্বনাশ আমরা তো এ রকম বোঝাতে চাইনি। সংবিধান থেকে টুকলিফাই করেছিমাত্র। ব্যক্তির তোষামোদিতে আকণ্ঠ নিমগ্ন বিএনপিও তটস্থ হবে। শুনুন তবে।
সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ বলেছে, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত ‘রাষ্ট্রপতি তাহার সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন।’ সাবেক প্রধান বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেনের ব্যাখ্যাটি খুব মনে ধরেছিল। ১৯৯৪-৯৫ সালের দিকে তিনি আমাকে বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতির ‘সকল দায়িত্ব’ কথাটির ইংরেজি করা হয়েছে, ‘ইন দ্য এক্সারসাইজ অব অল হিজ ফাংশনস।’ এখন সংবিধান যেখানে রাষ্ট্রপতিকে কোনো নিয়োগদানের ক্ষমতা নির্দিষ্ট করে দিয়েছে, সেটা তাঁর ফাংশনস নয়। এটা রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার অনুশীলন। সেই হিসেবে বিচারপতি, মহাহিসাব নিরীক্ষক, সরকারি কর্মকমিশনের সদস্য ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ রাষ্ট্রপতির ফাংশন নয়, তাঁর ক্ষমতা।
এ রকমের একটি ব্যাখ্যা রাজনীতিকেরা মেনে নিলে আমরা কতিপয় ক্ষেত্রে দুঃসহ দলীয়করণের জাঁতাকল থেকে হয়তো কিছুটা রেহাই পেতাম। কিন্তু মোসাহেবি সমাজে এ ধরনের ব্যাখ্যা অনেকেই মানবেন না। সে কারণেই বিএনপির মুখপাত্র রাষ্ট্রপতির মুখে নিয়োগকর্তা শুনে হজম করতে পারেননি। রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে গরল উগরে দিয়েছেন।
১৯৯১ সালে সংবিধান সংশোধন করে বলা হয়েছিল, প্রধান বিচারপতি নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর কোনো পরামর্শ রাষ্ট্রপতির লাগবে না। কিন্তু আইনমন্ত্রীদের মুরোদ হয়নি যে তাঁরা এটা অনুসরণ করেন। এক আইনমন্ত্রীকে এ বিষয়ে একদিন প্রশ্ন করেছিলাম, আপনি কোন ক্ষমতাবলে প্রধান বিচারপতি নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে ফাইল পাঠান? তিনি (না জেনে বা না জানার ভান করে) আকাশ থেকে পড়লেন। বললেন, আমার চেয়ারে থাকলে বুঝতেন! আমি খুবই লজ্জিত হলাম।
নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে কোনো নিয়মকানুন সংবিধান বা কোনো আইনে লেখা নেই। একজন রিকশাচালককে সিইসি হিসেবে বসিয়ে দিলে সংবিধানের কোনো লঙ্ঘন ঘটবে না।
১৯৭২ সালের সংবিধানে ১১৮ অনুচ্ছেদের ৫ উপদফায় বলা হয়েছিল, ‘সংসদ কর্তৃক প্রণীত যেকোনো আইনের বিধানাবলীর সাপেক্ষে নির্বাচন কমিশনারদের কর্মের শর্তাবলী রাষ্ট্রপতি আদেশের দ্বারা যেইরূপ নির্ধারণ করিবেন, সেইরূপ হইবে।’ এ রকমের আইন তৈরি করার জন্যই গত নভেম্বরে পাকিস্তান পার্লামেন্টে বিল উঠেছে। কিন্তু বাংলাদেশে উঠবে কি?
১৯৯১ সালে ভারতীয় লোকসভায় এই একই আইন পাস হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা কোনো নির্বাচন কমিশনার ছয় বছর মেয়াদে নিযুক্ত থাকবেন। তবে কারও বয়স ৬৫ হলে তিনি বিদায় নেবেন। এমনকি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় মতৈক্য দেখা দিলে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতেই নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে, সে কথাও লিখে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনারকেন্দ্রিক সংলাপে এসবের কোনো প্রতিফলন নেই। এটা প্রমাণ করে যে, দুই প্রধান রাজনৈতিক দল প্রকৃত অর্থে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এবং তাকে শক্তিশালী করার পথে হাঁটতে এখনো রাজি নয়।
সমাজ সংস্কারক, নাগরিক সমাজ ও চিন্তাশীল মহলের বিবেচনায় নেওয়া উচিত, আওয়ামী লীগের চেয়ে অনেক কম সংখ্যাগরিষ্ঠতায় এবং অনেক বেশি জটিল ও কণ্টকিত পরিবেশে ক্ষমতায় এসেও আসিফ জারদারি ও ইউসুফ রাজা গিলানি যেটুকু করে দেখালেন, সে রকমের কিছু ছিটেফোঁটাও জিল্লুর রহমান ও শেখ হাসিনা যে করতে পারলেন না—সেটা কেন, সেই দায় কার?
প্রধানত ক্ষমতাসীন দলের, কিন্তু বিরোধী দলও তার দায় এড়াতে পারে না।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.