তত্ত্বাবধায়ক সরকার-বল এখন রাজনীতিবিদদেরই কোর্টে by বদিউল আলম মজুমদার

নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি অবৈধ ঘোষণা করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ১০ মে দেওয়া রায় অনেক বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ইতিমধ্যে রায় প্রত্যাখ্যান করেছে। অনেকে এটিকে স্ববিরোধী বলেও আখ্যায়িত করেছেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজে রায়টিকে স্বাগত জানাই,


যদিও তা আমাদের রাজনীতিবিদদের দায়িত্বশীল আচরণের অভাবে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
আদালত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতিকে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রের স্বার্থ ও জনকল্যাণের বিবেচনায় এটিকে আরও দুই টার্মের জন্য রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। একই সঙ্গে সুপারিশ করেছেন বিচারপতিদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি থেকে দূরে রাখতে। আদালতের সুপারিশ করা এ দুটি বিষয়ে সংসদকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাই বল এখন রাজনীতিবিদদেরই কোর্টে।
আমরা বহুদিন থেকেই বলে আসছি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি অগণতান্ত্রিক পদ্ধতি। গণতন্ত্র আমাদের সংবিধানের মূলনীতির অংশ। এটি আমাদের সংবিধানের মৌলিক কাঠামো হিসেবে স্বীকৃত। তাই আদালত এটিকে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করাই স্বাভাবিক। বস্তুত, আমি মনে করি, আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে আদালত সঠিক রায়ই দিয়েছেন। আর সর্বোচ্চ আদালতের রায় অবশ্যই পালনীয়।
মনে রাখা প্রয়োজন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতির অনেকগুলো অন্তর্নিহিত ও গুরুতর দুর্বলতা রয়েছে। এটি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে, বিশেষত ক্ষমতাসীন দলকে দায়িত্বহীন আচরণ করতে উৎসাহিত করে। কারণ, এ ব্যবস্থায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সহায়তায় নির্বাচন কমিশনের এবং প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের দায় তাদের, বিদায়ী সরকারের নয়। তাই ক্ষমতাসীনেরা মনের আনন্দে সর্বস্তরে বিশেষত প্রশাসনে দলীয়করণ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে ফায়দাতন্ত্রের লাগামহীন বিস্তার ঘটায়, যদিও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথে এসব অপকর্ম পর্বতপ্রমাণ বাধা। প্রসঙ্গত, গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় অনুগত কয়েকজনকে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ, চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বিচারপতিদের অবসরগ্রহণের বয়সসীমা বৃদ্ধি, বিচারপতি আজিজের নেতৃত্বে গঠিত পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন কমিশন, তাঁবেদার রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ, প্রশাসনে অব্যাহত সীমাহীন দলীয়করণ ইত্যাদি পরবর্তী নির্বাচনকে প্রভাবিত করার লক্ষ্যে রাজনীতিবিদদের দায়িত্বহীন আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ। আর এসব কারসাজির ফলে ২০০৬ সালে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই পুরোপুরি ভেঙে পড়ে এবং ২০০৭-০৮ সালের সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সুনামি ছিল এমন কারসাজিরই অবশ্যম্ভাবী পরিণতি।
এ ছাড়া নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাজনীতিবিদদের জন্য একটি অমর্যাদাকর ও স্ববিরোধী পদ্ধতি। এর মাধ্যমে ধরে নেওয়া হয়, রাজনীতিবিদদের সততা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বিশ্বাস করা যায় না, কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সব নাগরিকের জানমাল ও স্বার্থ সংরক্ষণের দায়িত্ব আমানত হিসেবে তাঁদের ওপর অর্পণ করা যায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি নিয়ে অতীতের বাড়াবাড়িও নির্বাচন-পরবর্তী অপশাসন থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে নিবদ্ধ করেছে। এ সুযোগে সুশাসনবিবর্জিত একধরনের নির্বাচনসর্বস্ব—মূলত সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক তথাকথিত ‘আংশিক’ গণতান্ত্রিক শাসন আমাদের ওপর চেপে বসেছে। এ ছাড়া শুধু সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রতি অতিগুরুত্ব দেওয়ার কারণে নির্বাচিত সরকার যদি দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন ও অপশাসন করে পার পেয়ে যায়, তাহলে তাদের ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকার জন্য বদ্ধপরিকর হওয়াই স্বাভাবিক। আর এ ধরনের মানসিকতাই নির্বাচনকে প্রভাবিত করার লক্ষ্যে সব কারসাজির জন্ম দেয়।
উপরন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতির সৃষ্টিই হয়েছে সমস্যা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য। স্মরণ করা যেতে পারে, ১৯৯৪ সালে মাগুরার উপনির্বাচনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের কারচুপি এবং নির্বাচন কমিশনের তা রোধে ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে প্রথমবারের মতো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতির দাবি ওঠে। নিঃসন্দেহে তখন সমস্যা ছিল ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের অসদাচরণ এবং নির্বাচন কমিশনের তা রোধে অপারগতা। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও তার মিত্র দলগুলোর তীব্র আন্দোলনের মুখে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি একটি একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, এর ফলে রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান দুর্বৃত্তায়ন ও অসদাচরণের সমস্যাগুলো পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া হয়।
তবে ভুললে চলবে না, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনেক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্জনও রয়েছে। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে একটি ছবিযুক্ত নির্ভরযোগ্য ভোটার তালিকা তৈরি হয়েছে, যা ভোটার তালিকা নিয়ে অনেক বিতর্কের অবসান ঘটিয়েছে। একই আমলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি প্রগতিশীল আইনও প্রণীত হয়েছে, যার অনেকগুলো অবশ্য নবম জাতীয় সংসদ অনুমোদন করেনি। একই সময়ে বিচার বিভাগের পৃথক্করণ, নির্বাচন কমিশনের সচিবালয়কে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের নিয়ন্ত্রণমুক্ত এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে সক্রিয় করা হয়েছে। সর্বোপরি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো সব নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকের মতে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে। তবু এটা মানতেই হবে, এই অগণতান্ত্রিক, অস্থিতিশীল এবং সমস্যা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য উদ্ভাবিত ব্যবস্থা আমাদের বিরাজমান অপরাজনীতি ও অপশাসনের সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। কারণ, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেওয়া সংস্কারগুলো অনেক ক্ষেত্রেই স্থায়িত্ব অর্জন করে না। তাই সত্যিকারের সমাধান হবে রাজনৈতিক দলের সংস্কার ও রাজনীতিবিদদের মানসিকতার পরিবর্তন তথা একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যাতে রাজনীতিবিদেরাই স্বেচ্ছায় নির্বাচনপ্রক্রিয়া কলুষমুক্ত এবং নির্বাচন-পরবর্তীকালে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে এগিয়ে আসেন।
তবে এই মুহূর্তে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি বিলুপ্ত করারও উপায় নেই। কারণ, তা করলে দেশ ভয়াবহ সংকটের দিকে ধাবিত হতে পারে। বস্তুত, এখন এটি বাতিল করা হবে আমাদের প্রধান দুটি দলকে জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে ‘রাশান রুলেট’ খেলার, যে খেলায় জীবন-মরণের সম্ভাবনা জড়িত—সুযোগ করে দেওয়ার মতো। কারণ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে অদ্যাবধি তারা কোনোরূপ সদিচ্ছা প্রদর্শন করতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রায় শূন্যের কোঠায়। তাই আদালত বিজ্ঞচিতভাবেই বিচার বিভাগকে দূরে রেখে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও জনস্বার্থে এটিকে আরও দুই টার্মের জন্য রাখার সুপারিশ করেছেন, যদিও অনেকে আমাদের রাজনীতিবিদদের মানসিকতা তথা রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত এটি অব্যাহত রাখার পক্ষে। বস্তুত, আদালত কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য আমাদের রাজনীতিবিদদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। এ জন্য দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আলোকে আমাদের রাজনীতিবিদদের এখন মোটা দাগে দুটি বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। তাঁদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আগামী দুই টার্মের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন সম্পর্কে। বিচার বিভাগের ওপর বিরূপ প্রভাব যাতে না পড়ে, সেদিকে নজর রেখে কাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা যায় সে সম্পর্কে একটি ফর্মুলা তাঁদের উদ্ভাবন করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনীতিবিদদের একটি পথরেখা তৈরি করতে হবে, যা অনুসরণ করে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে করা সম্ভবপর হবে। এ লক্ষ্যে অপরাজনীতিতে লিপ্ত হওয়া ও নির্বাচনে কারসাজি করা থেকে বিরত থাকার এবং গণতান্ত্রিক রীতিনীতি চর্চা ও নির্বাচন-পরবর্তীকালে সুশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারও তাঁদের করতে হবে।
প্রসঙ্গত, আমি নিজেও গত ৩ মে, আদালতের রায় ঘোষণার আগে, সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির সামনে আগামী দুই টার্মের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি বাতিলের সুপারিশ লিখিতভাবে উত্থাপন করেছি। পরবর্তী দুই টার্মের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের একটি রূপরেখাও আমি প্রস্তাব করেছি। আমি কমিটির সামনে আমাদের সব সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়ে একটি প্যানেল গঠনের প্রস্তাব করেছি। আমি আরও প্রস্তাব করেছি যে, এই প্যানেলভুক্ত সাবেক বিচারপতিরা সর্বসম্মত বা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য নির্ধারিত করবেন। সবার আগে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি বয়োজ্যেষ্ঠদের এ প্যানেলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যেন নির্বাচনপ্রক্রিয়া, নির্বাচন কমিশন, সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপ্রক্রিয়া, রাজনৈতিক দল, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের সঠিক তথ্য প্রদানের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি ও প্রশাসনে দলীয়করণের অবসানসহ অনেকগুলো ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়, সে সুপারিশও আমি কমিটির সামনে করেছি। সমঝোতার ভিত্তিতে গৃহীত এসব সংস্কারের উদ্দেশ্য হবে দেশে পারস্পরিক সহিষ্ণুতা ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা। আর এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি ছাড়াই ভবিষ্যতে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভবপর হবে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।

No comments

Powered by Blogger.