ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিন-অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম

গত বুধবার ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন আইন, ২০০১ সংশোধন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানে করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা সেখানকার পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন কিংবা ওই চুক্তির আলোকে ভূমিবিরোধ সমস্যার সমাধান হবে কি না, তার ওপরই নির্ভর করছে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ।


সেখানে সংঘাত-সংঘর্ষের মূলেও ভূমির মালিকানা বিরোধ। আলোচনা সভায় সাংসদ রাশেদ খান মেনন যথার্থই বলেছেন, ‘সরকার এক পা এগোলে আরেক পা পিছিয়ে যায়। যার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি নিয়ে এক গোলকধাঁধার সৃষ্টি হয়েছে।’ এই গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে বের করতে হবে।
সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক আন্তমন্ত্রণালয় কমিটির বৈঠকেও পার্বত্য চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক অঘটনের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় দলগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দল সংঘাত-সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে নিশ্চয়ই। কিন্তু সরকারকে এও মনে রাখতে হবে, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাটি নিছক আইনশৃঙ্খলাজনিত নয়।
১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি সই হওয়ার পর ১৩ বছর পার হয়েছে। এই সময়ে পার্বত্য চুক্তির বেশ কিছু ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে। তার সুফলও পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ ভোগ করছে। এখন আর সেখানে ‘যুদ্ধাবস্থা’ নেই। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়েও পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তির ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি না হওয়া দুর্ভাগ্যজনক। ভূমি কমিশন পুনর্গঠিত হলেও কাজ এগোয়নি ব্যক্তিবিশেষের জেদাজেদির কারণে। বিরোধ নিষ্পত্তির আগেই কমিশন চেয়ারম্যান ভূমিজরিপের উদ্যোগ নিলে নানা মহল থেকে জোরালো প্রতিবাদ আসে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ২০০১ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন আইন সংশোধনেরও দাবি জানিয়ে আসছে, যার প্রতিধ্বিনি উচ্চারিত হয়েছে বুধবারের আলোচনা সভায়ও। ভূমির মালিকানা নিষ্পত্তির আগে জরিপ করা যাবে না। অনেক আদিবাসীর জমিজমা ইতিমধ্যে বাঙালিরা দখল করে নিয়েছে বলেও অভিযোগ আছে। এই অবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি যেকোনো সময় উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধান করতে হলে অবিলম্বে ভূমিবিরোধের নিষ্পত্তি জরুরি। স্থানীয় বাসিন্দা তথা আদিবাসীদের বঞ্চিত করে পাহাড়ে শান্তি আনা যাবে না। বিষয়টি পার্বত্য চট্টগ্রামসংক্রান্ত বিশেষ কমিটি গুরুত্বের সঙ্গে নেবে আশা করি। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে যত বিলম্ব হবে, ততই সেখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে সন্দেহ-অবিশ্বাস দানা বাঁধবে। চারদলীয় জোট সরকারের পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে অনীহার কারণ ছিল। তারা একসময় এই চুক্তির বিরোধিতাও করেছিল। কিন্তু পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরদানকারীরা কেন এর বাস্তবায়নে গড়িমসি করবে? পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই সরকারের উচিত ভূমিবিরোধ সমস্যার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। মনে রাখতে হবে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সব অশান্তি ও সংঘাতের মূলে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া।

No comments

Powered by Blogger.