গণমাধ্যম-মুক্তিযুদ্ধ, বিবিসি ও শহীদ নিজামুদ্দিন by এম এম খালেকুজ্জামান

ঢাকায় এই মুহূর্তে সমবেত আমাদের দুঃখদিনের ভিনদেশি অনেক সুহূদ। তাঁদের সম্মান জানাতে প্রস্তুত বাংলাদেশ। সেই সময়ের অনেক সুহূদই আর এই পৃথিবীতে নেই। তবু এই দেশটির অভ্যুদয়ে তাঁদের অবদানের কথা ভোলেনি বাংলার মানুষ।


কত বন্ধু, সুহূদ, শুভাকাঙ্ক্ষী একাত্তরে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন দৃঢ়তার মনোবল, শক্তি আর সাহস জোগাতে। এগিয়ে এসেছিল মানবতার চেতনাকে আরেকবার মহীয়ান করতে মানব শুধু নয়, অনেক প্রতিষ্ঠানও। তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান তখনকার রুদ্ধশ্বাস দিনগুলোতে বাংলার মানুষের অতি আপন হয়ে ওঠা ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (বিবিসি)। ’৭১-এ পাকিস্তানি সেনাশাসকেরা বিবিসির অনুষ্ঠান শোনা এবং তথ্য সরবরাহ করাকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে এর শাস্তি হিসেবে দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান রেখে এক অদ্ভুত ফরমান জারি করেছিল। তবুও সেই ভয়ংকর রাতগুলোতে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও গোপনে মানুষ বিবিসিকে শুনতে ভোলেনি।
এক জাতি শোনাবে শান্তির বাণী অন্য জাতিকে—এটা ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা বিবিসির মূলমন্ত্র। ১৯২২ সালে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কোম্পানি নামে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ রাজের এক রয়াল চার্টারের মাধ্যমে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন নামে পররাষ্ট্র দপ্তরের অর্থায়নে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এরও পরে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের আওতায় বিভিন্ন ভাষায় সংবাদ সম্প্রচার শুরু হলো। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৪১ সালে বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য বিবিসি বাংলা বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
১৯৭০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সংঘটিত ভয়াবহ সাইক্লোনের খবর পশ্চিম পাকিস্তানি প্রশাসন তথা সরকার চেপে যেতে চেয়েছিল। বিবিসির সংবাদ মারফত বহির্বিশ্বে অবস্থানরত বাংলা ভাষাভাষী ও অন্য আগ্রহীরা জানতে পারেন সাইক্লোনের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের কথা।
একাত্তরে মার্চের শুরু থেকেই অন্যান্য বিদেশি সংবাদমাধ্যমের মতো বিবিসিও পূর্ব পাকিস্তানের অবনতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত রেখেছিল। পয়লা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের খবর এবং পাঁচটি প্রদেশের গভর্নরকে সামরিক প্রশাসক হিসেবে নিয়োগের ফরমান জারির খবর ২ মার্চ গ্রিনিচ মান সময় মধ্যরাত দেড়টা থেকে পৌনে দুইটা এবং পূর্ব পাকিস্তান স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে সাতটা থেকে পৌনে আটটার সংবাদে প্রচারিত হয়।
ওই দিন রাতের অধিবেশনের সংবাদ বুলেটিনের পর ব্রিটেনে প্রকাশিত পত্রিকার চারটি প্রধান প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে মার্ক টালি তৈরি করেন প্রেস রিভিউ। ৭ মার্চ রেসকোর্সের ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পূর্ণ বিবরণ প্রচার করে বিবিসি। বিশ্ব সংবাদে ঐতিহাসিক ভাষণের সংবাদ প্রচারের পাশাপাশি মার্ক টালির তৈরি মন্তব্য প্রতিবেদনও প্রচার করা হয় অধিবেশনে।
১৫ থেকে ২০ মার্চ পর্যন্ত শেখ মুজিব ও ইয়াহিয়া খানের মধ্যকার বৈঠকগুলোর সংবাদ নিয়মিতভাবেই প্রচারিত হচ্ছিল সংবাদ ও অন্যান্য অনুষ্ঠান মারফত। একদিকে আলোচনার টেবিলে পূর্ব পাকিস্তানের নেতাদের মনোযোগ ধরে রাখা আর গোপনে আক্রমণ পরিচালনার জন্য সৈন্য সমাবেশ করাই ছিল পাকিস্তান প্রশাসনের উদ্দেশ্য। যার ফলাফল ২৫ মার্চ মধ্যরাতের নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ ও তুলনারহিত হত্যাকাণ্ড।
যেহেতু পাকিস্তানি শাসকেরা সব বিদেশি সংবাদমাধ্যমের সংবাদকর্মীদের প্রথমে অবরুদ্ধ রাখে, তারপর জোরপূর্বক বহিষ্কার করে। তাই ২৫ মার্চের হত্যালীলার খবর তৎক্ষণাৎ প্রচার করা সম্ভব হয়নি। শুধু সরকারের সরবরাহ করা হ্যান্ডআউট ও মনিটরিং রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে সংবাদ তৈরি করতে হয় বিদেশি সংবাদপত্রের। সাংবাদিকদের নোটবুক কেড়ে নেওয়া হয়। ক্যামেরা থেকে ফিল্ম বের করে নষ্ট করা হয়। বিবিসির ক্যামেরায় ধারণ করা চিত্র রেখে দেওয়া হয়। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে সব বিদেশি সাংবাদিককে জড়ো করে হুঁশিয়ার করা হয়, সেখান থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে গুলি করে হত্যা করা হবে। ২৬ মার্চের সংবাদে ২৫ মার্চ মধ্যরাতের হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞের খবর প্রচার করতে পারেনি বিবিসি কঠোর সেন্সরশিপ ও সাংবাদিকদের অবরুদ্ধ করে রাখার কারণে। তবে শেখ মুজিব যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন তা অন্য একটি বেতারকেন্দ্রের উদ্ধৃতি দিয়ে ২৬ মার্চের বিশ্বসংবাদ বিবিসি প্রচার করে।
আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই ভারতমুখী হয় লাখো শরণার্থী। এপ্রিল-মে মাসজুড়ে সীমান্তবর্তী ভারতের রাজ্যগুলোতে চাপ পড়ে শরণার্থীদের, যা অর্থনৈতিক ও ব্যবস্থাপনাজনিত সমস্যায় ফেলে দেয় ভারত সরকারকে। এসব শরণার্থীর খাদ্যহীনতা ও আশ্রয়হীনতার অবর্ণনীয় দুর্দশার খবর পাওয়া যায় এপ্রিল-মে মাসজুড়ে প্রচারিত সংবাদ ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে। জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব উথান্ট পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্যের আবেদন জানান বিশ্বনেতাদের কাছে, যা প্রচারিত হয় ২০ মে বিশ্বসংবাদে।
শরণার্থীদের খবর ও যুদ্ধাবস্থার আসল চিত্র উপস্থাপনে নিজস্ব সংবাদকর্মীর অনুপস্থিতির কারণে বিবিসিকে সমস্যায় পড়তে হয়। অন্যান্য সূত্রের সরবরাহ করা খবরই ছিল অন্যতম উপায়। জুনের তৃতীয় সপ্তাহে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ বিদেশি সাংবাদিকদের পূর্ব পাকিস্তান সফরের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। বিবিসি কর্তৃপক্ষ প্রথমে স্থির করে তৎকালীন বাংলা বিভাগের উপপ্রধান সিরাজুর রহমান কলকাতায় যাবেন যুদ্ধের খবর সংগ্রহে। কিন্তু প্রাচ্য বিভাগের প্রধান মার্ক ডডের সিদ্ধান্তে মার্ক টালিকে পাঠানো হয়। সীমান্তবর্তী শরণার্থী শিবির ও যুদ্ধরত বিভিন্ন জেলা শহর ঘুরে ঘুরে প্রকৃত দুর্দশা ও যুদ্ধের খবরসংক্রান্ত সব প্রতিবেদন পাঠান মার্ক টালি। তাঁর পাঠানো খবরই মূলত মানুষের বিশ্বাসের অন্যতম অবলম্বন ছিল এবং তাঁর এই যুদ্ধকালীন ভূমিকা বাংলা ভাষাভাষী জনগণের কাছে তুমুল জনপ্রিয়তা এনে দেয়। মার্ক টালি লন্ডন চলে যাওয়ার পর নিজামুদ্দিন আহমদ বাংলার রণাঙ্গনের খবরাখবর সরবরাহ করতেন। নির্ভীক সাংবাদিক স্বনামেই বিভিন্ন প্রতিবেদন সরবরাহ করতেন, যা পাকিস্তানি ও তাদের দোসরদের জন্য ছিল আশঙ্কার। যার পরিণতিতে ১২ ডিসেম্বর মুখোশধারী কিছু লোক বাসা থেকে ধরে নিয়ে হত্যা করে নিজামুদ্দিন আহমদকে। মুক্তিযুদ্ধে তিনিই একমাত্র বিদেশি মাধ্যমের সংবাদকর্মী, যিনি যুদ্ধে শহীদ হন। ওই সময় বাংলা বিভাগে মাত্র তিনজন পূর্ণকালীন সংবাদকর্মী পুরো বাংলা সংবাদ প্রচারের দায়িত্বে ছিলেন। সিরাজুর রহমান, শ্যামল লোধ ও কমল বোস। শ্রোতার সংবাদতৃষ্ণায় সান্ধ্য সংবাদ ১৫ মিনিট থেকে বাড়িয়ে ৩০ মিনিট, পরে কিছু সময়ের জন্য ৪৫ মিনিটব্যাপীও প্রচার করা হয়।
এম এম খালেকুজ্জামান: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
Khaliik@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.