দিল্লির চিঠি-ভগত সিং ও পাকিস্তান by কুলদীপ নায়ার

লাহোরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল বিস্ময়। আমাদের প্রীতিসফর করাচি, হায়দরাবাদ ও ইসলামাবাদ হয়ে লাহোরে পৌঁছাল। ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী ভগত সিংয়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সেখানকার শাদমান চকে ৩০০ লোকের একটা জমায়েত অপেক্ষা করছিল। এটা সেই জায়গা, যেখানে ৮০ বছর আগে,


১৯৩১ সালে ভগত সিং আর তাঁর দুই বন্ধু—সুখদেব ও রাজগুরুকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। পাকিস্তানের একটি ইংরেজি দৈনিকে এ বিষয়ে লিখেছে: ‘সন্ধ্যা যখন মিলিয়ে যাচ্ছিল রাতের দিকে, ঘন ধূসর আকাশের বিপরীতে জ্বলছে কোমল মৃদু মোমবাতি। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ভগত সিংয়ের স্মরণে সেখানে সমবেত হওয়া সবার ওপর সেই আলো পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে।’
বছর পাঁচেক আগে কয়েকজন অধিকারকর্মীর সঙ্গে আমি লাহোরে গিয়েছিলাম, যেখানটায় ভগত সিং এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের ফাঁসিকাষ্ঠ স্থাপন করা হয়েছিল, সেই জায়গাটা খুঁজে বের করতে। সে সময় আমরা ২৩ মার্চ তারিখটা স্মরণের জন্য এড়িয়ে গিয়েছিলাম, দিনটি ছিল পাকিস্তানের জাতীয় দিবস। ওই কমরেডদের অভিবাদন, যাঁরা ইতিহাসের সেই হারানো সুতাকে আবার হাতে তুলে নিয়েছিলেন। পাকিস্তানের জাতীয় দিবস হওয়া সত্ত্বেও কিছু পাকিস্তানি ভগত সিংদের শহীদ হওয়ার স্মরণ করেছিল।
চক এলাকাজুড়ে সার সার মোমবাতি জ্বালানো। শোভা পাচ্ছিল ভগত সিংয়ের বিরাট অজস্র প্রতিকৃতি। জমায়েতের সবাই সারিবদ্ধভাবে একে একে তাঁর ছবির সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানাচ্ছিল। যদিও ভারতীয় প্রতিনিধিদলের আসতে পাঁচ ঘণ্টা দেরি হচ্ছিল, তার পরও মানুষ তাদের অভ্যর্থনার জন্য অপেক্ষা করেছে। আমাদের দেখামাত্রই তারা স্লোগান তোলে: ভগত সিং জিন্দাবাদ, বিপ্লব জিন্দাবাদ।
পাকিস্তান সরকার এখনো শাদমান চকের নাম ভগত সিং চক করার দাবি মেনে নেয়নি। যখনই কেউ এর নাম ভগত সিং চক লেখে, তখনই সরকার তা মুছে ফেলে। কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। সেখানকার মানুষেরা এখন এলাকাটির নাম ভগত সিং চক রাখার দাবি নিয়ে হাইকোর্টে পিটিশন জমা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে।
এবারে আমি হতবাক হয়ে দেখলাম, গত কয়েক বছরে সমুদ্রসমান পরিবর্তন ঘটে গেছে। কয়েক বছর আগে যখন শাদমান চকে গিয়েছিলাম, তখন সেখানে কোনো খিলান ছিল না, স্মারক ছিল না। এমনকি তাঁদের ফাঁসির স্মরণে একটা প্রস্তরলিপি পর্যন্ত বসানো ছিল না। যে লাহোর সেন্ট্রাল জেলে তিন বিপ্লবীর ফাঁসি হয়েছিল, সেই জায়গাটি পরে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। তাঁদের কারাকক্ষের চিহ্ন পর্যন্ত মুছে দেওয়া হয়, যাতে তাঁদের ফাঁসির কোনো আলামতই না থাকে।
কিন্তু পরিহাস হচ্ছে, কর্তৃপক্ষ সেখানে একটি কলোনি গড়ে উঠতে দেয়, ভগত সিংদের কারাকক্ষের জায়গাটির ঠিক বিপরীতে একটি রাজকীয় মসজিদ তৈরি হয়। আমার মনে আছে, আমি শাদমান বসতির লোকজনকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তারা জানে কি না, ভগত সিং কে? অনেকেই তাঁর নাম শুনেছে আবার অনেকেই এখানে তাঁর বন্দী থাকা ও ফাঁসি নিয়ে ঝাপসা কথাবার্তা জানে। ‘আমরা আসার পর এখানে কেবল একটি পুলিশ কোয়ার্টার ছিল। পরে কলোনি বড় হতে থাকলে সেটি ভেঙে ফেলা হয়।’ ৫০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি আমাকে বলেন, যে কাঠামোটিতে ভগত সিংদের ঝোলানো হয়েছিল, তাকে এখন বানানো হয়েছে সড়কদ্বীপ। জায়গাটায় যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকে, যেমনটা থাকে পুরো লাহোরেই। হট্টগোল, ধোঁয়া আর ধুলায় ঢেকে আছে জায়গাটা।
কিন্তু এবারে ওই জায়গাটায় আমাদের আসার আগে সেখানে ভগত সিংয়ের ওপর একটি নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল। অনেক সামাজিক কর্মী, ছাত্রছাত্রী ও বিভিন্ন পেশার অনেকেই তাতে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা বলেন, ভগত সিং যেহেতু উপমহাদেশেরই মানুষ এবং লাহোরে যেহেতু তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল, তাই এখানে তাঁর স্মরণ হতে হবে।
‘কখনো ভোলা যাবে না যে তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।’ বললেন এক কর্মী। কিন্তু আজ অনেকেই জানে না যে কেন তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল, এমনকি তিনি কে ছিলেন, তা-ও জানে না তারা। জেলা কাছারির পেছনে তালাবদ্ধ করে রাখা ব্র্যাডলি হলকে খুলে দিয়ে সেটাকে ভগত সিংয়ের নামে একটা স্কুল অথবা তাঁর স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে জাদুঘর বানানো হোক। কেন এটা বন্ধ থাকবে?
আরেকজন কর্মী জানালেন, ‘স্থানীয় অনেক শহীদের নামই ভুলে যাওয়া হচ্ছে। অথচ ব্রিটিশ ভাইসরয়ের নামে রাস্তা আছে, মসজিদ আছে সৌদি বাদশাহ ফয়সলের নামে, এমনকি গাদ্দাফির নামেও একটা স্টেডিয়াম আছে। অথচ আমরা আমাদেরই এলাকার একজনের নামে একটি রাস্তার নামকরণ করতে রাজি নই। তিনি তো ধর্মীয় সীমানা ছাপিয়ে উঠে গিয়েছিলেন এবং দেশবাসীর সবার অধিকারের পক্ষে লড়াই করেছিলেন।’
তারা এই প্রশ্নও তোলে যে, কেন ব্রিটিশরা ভগত সিং এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের সন্ত্রাসবাদী হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তাঁরা বিপ্লবী, ভারতবর্ষকে ব্রিটেনের কবল থেকে মুক্ত করার জন্য তাঁরা তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। বিপ্লবীদের কাছে হত্যার কী মানে, তা ভগত সিং নিজেই ব্যাখ্যা করেছিলেন: ‘মানুষের জীবন আমাদের কাছে অতি সম্মানিত, আমরা মনে করি মানুষের জীবন পবিত্র...কাউকে আহত করার বদলে আমরা মানবতার সেবায় শিগগিরই আমাদের জীবন নিবেদন করব।’
এখানে কোনো প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধের কথা নেই। তিনি বলেছেন, ‘এইসব কার্যকলাপ (হত্যাকাণ্ড) এতই রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ যে, এসবের ফলে এমন এক পরিমণ্ডল ও মানসিকতা গড়ে উঠবে, আমাদের চূড়ান্ত সংগ্রামের জন্য যা গুরুত্বপূর্ণ।’ আমরা, উভয় সীমান্ত পারের কর্মীরা ভগত সিং স্মৃতিরক্ষা কমিটি গঠন করেছি মূলত দুটি উদ্দেশ্যে: এক. শাদমান চক ও কলোনির নাম ভগত সিংয়ের নামে রাখা এবং দুই. স্বাধীনতা সংগ্রামের অনেক আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল ব্র্যাডলি হলের অধিকার অর্জন করা।
এক কর্মীর প্রশ্ন, মহাত্মা গান্ধী ও ভগত সিংয়ের মধ্যে বিবাদ ছিল কি না। আমি তাদের বললাম, মহাত্মা তাঁদের সাহসিকতার ভক্ত ছিলেন কিন্তু বোমা বা বন্দুক ব্যবহার তিনি পছন্দ করতেন না। ভগত সিংদের নিষ্ঠার বিষয়ে তাঁর কোনো সন্দেহ ছিল না, কিন্তু গান্ধী সুনিশ্চিত ছিলেন যে অস্ত্রের পথে ভারতবর্ষ ব্রিটিশ শক্তির থাবা আলগা করতে পারবে না। আমি তাকে বলি, গান্ধী ও ভগত সিং ছিলেন পরস্পরের সম্পূর্ণ বিপরীত। ভগত সিং সন্ত্রাসবাদী পথে বিশ্বাস করতেন এবং স্বাধীনতা অর্জনের কৌশল হিসেবে তা ব্যবহার করেছিলেন। অন্যদিকে গান্ধী তাঁর সমগ্র জীবনে অহিংসায় বিশ্বাস করতেন এবং অন্য কোনো পন্থা আর অবলম্বন করেননি। তাঁরা দুজন ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের দুই ভিন্ন দুটি ধারা।
পাকিস্তানের এই কর্মীদের সংখ্যা হয়তো কম এবং উপমহাদেশের সব শহীদের ধারণ করায় তাঁদের সদিচ্ছাও হয়তো সীমিত। কিন্তু পাকিস্তানে নতুন এক প্রবণতা যে দানা বাঁধছে, এরা তারই ইঙ্গিত বহন করছে। একদিন এরাই হয়তো সরকারকে ইতিহাস বিকৃতি বন্ধে বাধ্য করবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।

No comments

Powered by Blogger.