সরল গরল-সংবিধানের আলোচনায় ‘ভ্রান্তিবিলাস’ by মিজানুর রহমান খান

৩০ মার্চ সকালে ড. আকবর আলি খান ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের আলোচনা দেখি আরটিভিতে। ড. খান বলছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সংবিধান রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির হয় না। কিন্তু আমরা জানি, সংবিধানে রাষ্ট্রপতি না সংসদীয়, তা সাধারণত লেখা থাকে না। ড. খান উপদেষ্টা থাকাকালে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সঙ্গে তর্ক করেছিলেন।


কারণ, ইয়াজউদ্দিন বলেছিলেন, তাঁর সরকার রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির। ড. খান বলেন, এ কথার কোনো আইনগত, সাংবিধানিক ও নৈতিক ভিত্তি নেই। তিনি যখন এ কথা বলছিলেন, তখন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত মাথা ঝাঁকিয়ে তাতে সম্মতি দেন। তাঁরা উভয়ে প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ। তাঁরা যখন কোনো মত দেবেন, তখন তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়াটাই স্বাভাবিক। সংবিধান ও সরকারব্যবস্থা এমনিতেই জটিল। তখন সাধারণ মানুষ আমাদের মতো ‘হরিদাস পালের’ চেয়ে তাঁদের কথাই প্রধানত বিশ্বাস করে। তাই তাঁরা যখন ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ ভুল করেছিলেন বলেই কথা শেষ করেন, তখন মানুষের মনে তাঁদের কথায় ভুল ধারণা জন্মাতে পারে।
বহুবার লিখেছি, বাংলাদেশে সাধারণভাবে কার্যত রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার চলছে এবং সেটাও নিকৃষ্ট। একে সংসদীয় খোলসে চালানো হচ্ছে। এটা একটা শাসকমার্গীয় বিলাসিতা। দুনিয়ার অন্য কোনো লিখিত সংবিধানের সঙ্গে বাংলাদেশি মডেলের আজতক মিল পাইনি। এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর জামা গায়ে সেই রাষ্ট্রপতি দেশ চালাচ্ছেন, যাকে আমরা চতুর্থ ও পঞ্চম থেকে দ্বাদশ সংশোধনী পর্যন্ত দেখেছি। বাহাত্তরে দেখিইনি বলতে পারব না। এই খোলসটা তথাকথিত নির্দলীয় সরকারের সময় আরও কুৎসিত হয়ে ওঠে। সেই কুৎসিত রূপটা ইয়াজউদ্দিন দেখিয়েছিলেন। আমরা তা দেখে আঁতকে উঠেছিলাম। এর দুটো দিক ছিল। ইয়াজউদ্দিন যে প্রক্রিয়ায় প্রধান উপদেষ্টা হয়েছিলেন, সেটা সংবিধানের সঙ্গে একটা প্রতারণা ছিল। বিচারপতি কে এম হাসান অসহায়ভরে না বলেছিলেন। এরপর আরও তিন-চারজন প্রধান উপদেষ্টা পদের দাবিদার ছিলেন। তিনি তাঁদের বঞ্চিত করেন। এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ হলে প্রধান বিচারপতি আরেকটি কেলেঙ্কারি করে বসেন। কিন্তু এর আরেকটি সাংবিধানিক দিক আছে। এবং সেটা ইয়াজউদ্দিন সৃষ্টি করেননি। তিনি যখন ক্ষমতা ছিনতাই করে প্রধান উপদেষ্টা হয়ে গেলেন, তখন কিন্তু দেশে আরও সর্বশক্তিমান এক রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি চালু হলো। এটা আরও বিকৃত। তবে অনেকে অনেক সময় যে অর্থে ‘রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি’র মুন্ডুপাত করেন, তা হাস্যকর। কারণ তাতে যথেষ্ট গণতান্ত্রিক বলে প্রশংসিত রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে অপমান করা হয়। ত্রয়োদশ সংশোধনীর রাষ্ট্রপতি কাম প্রধান উপদেষ্টার নামকরণ মধ্যযুগীয় দর্পিত বাদশাহি বললে সত্যের কাছাকাছি যাওয়া হবে। বর্তমানের প্রধানমন্ত্রিত্বেও সেই বাদশাহি বলবৎ আছে। কেয়ারটেকার আমলে তা আরও আক্ষরিক, আরও বিকৃত হয়ে ওঠে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা খর্ব করার কথা ভাবা হচ্ছে। সেটার চেতনা সমর্থনযোগ্য। কিন্তু যেটা কারও নজরে আসছে না, সেটা হলো, ছয়টি বিকল্প অবিকল টিকিয়ে রেখে, বিশেষ করে রাষ্ট্রপতিকে প্রধান উপদেষ্টা বানানোর বিকল্প বজায় রেখে তাঁর ক্ষমতা খর্ব করার কসরত স্ববিরোধী ও হাস্যকর বটে। তাই ওই দুই আলোচক যখন ইয়াজউদ্দিনের শাপান্ত করছিলেন, তখন তাঁরা যদি পদ্ধতির কথাও বলতেন, তাহলে একটা স্বস্তি পেতাম।
রাজনীতিতে দুইয়ে দুইয়ে শূন্য হতে পারে। কিন্তু কোনো জাতি তার সংবিধানে এমন ভ্রষ্টাচার করে, তা সত্যি অভাবনীয়। কবর জিয়ারতের রাষ্ট্রপতির কাছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বা উপদেষ্টাদের যৌথভাবে ‘দায়ী’ থাকার অদ্ভুত ব্যবস্থা সে রকম আরেকটি অনাচার। লক্ষ করলাম, এই তথাকথিত জবাবদিহির অসারতা মি. সেনগুপ্ত ঠিকই চিহ্নিত করলেন। কিন্তু এর প্রতিকার বললেন না। এটা বিলোপ করার কথা বললেন না।
ড. আকবর আলি খান যথার্থ বলেন যে বর্তমানে যেভাবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রী দেখেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তেমনটাই থাকা উচিত। এর মানে, তখন প্রধান উপদেষ্টা দেখবেন। এর চেতনা আমরা সমর্থন করি। কিন্তু এখনই বা শুধু প্রধানমন্ত্রী কেন। মতিয়া চৌধুরী শুধুই কৃষি বুঝবেন, দীপু মনি শুধু পররাষ্ট্র বুঝবেন, প্রতিরক্ষা বুঝবেন না?
তবে এখানে একটা কথা বলে রাখি, আমাদের চোখ ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে পিছলায়। সমষ্টিতে আমাদের সন্তুষ্টি নেই। তা-ই যদি না হতো, তাহলে ওঁদের নজরে পড়ত যে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা যেভাবে কেবিনেটের কাছে থাকা সংসদীয় গণতন্ত্রে বাঞ্ছনীয়, সেটা কিন্তু তত্ত্বাবধায়কের মেয়াদে আমাদের সামনে দেখা দিচ্ছে। বুঝে বা না বুঝে ঠিকই বিধান রাখা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরামর্শে প্রযুক্ত’ হবে। হতে পারে এটা ‘মিডনাইট সিনড্রোম’। কিন্তু গণতান্ত্রিক ও আদর্শস্থানীয়। এই উপদেষ্টামণ্ডলীর পরামর্শেই রাষ্ট্রপতি প্রতিরক্ষা ব্যতিরেকে অন্য সব ক্ষেত্রের কর্তব্য পালন করেন। অথচ কী পরিহাস ও প্রহসন যে আমরা এখন সংসদীয় গণতন্ত্রের দোহাই দিচ্ছি! আর বেচারা রাষ্ট্রপতির ‘হালুয়া টাইট’ করার কথাই ভাবছি। তাঁর দোষ বলতে এটুকুই যে তিনি ৩০০ আসনের কোনো একটি আসন থেকে জিতে আসেননি। প্রধানমন্ত্রী একটি আসনেই জয়ী হন। এর বেশি নয়। দুজনই সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে নির্বাচিত হন। একজন শুধু একটি আসনে জেতার জোরে ধরাকে সরা জ্ঞান করতে পারেন এবং সেটা আমরা সংবিধানেও লিখে রাখছি। প্রধানমন্ত্রী বলেই তিনি পাঁচ বছর মেয়াদে প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সংস্থাপনমন্ত্রী, বিদ্যুৎমন্ত্রী—সবটাই ভারি চমৎকার! এ নিয়ে আমাদের গণতন্ত্রী ও চিন্তাশীলেরা টুঁ শব্দটি করেন না। এখন যেই সংবিধান সংশোধনের সুযোগ এসেছে, তখন তাঁরা আবার লাশের পুনঃপুন ময়নাতদন্তে আদাজল খেয়ে নেমেছেন। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা খর্ব করার মধ্য দিয়েই তাঁরা গণতন্ত্র পোক্ত করার অলীক ধারণা দিচ্ছেন। তাঁদের চোখে ছানি না পড়লে তাঁরা ফরাসি সংবিধানের পাতা ওল্টাতেন।
কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন হতে পারে। মা-বাবা আহ্লাদ করে আন্ধা ছেলের নাম পদ্মলোচন রাখলে কার কী। তেমনই আমাদের রাজনীতিকদের একটা শখ হয়েছিল। ১৯৯১ সালে তাঁরা সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন করলেন। প্রকৃতপক্ষে করলেন কি, রাষ্ট্রপতি শব্দটি ঘষে-মুছে প্রধানমন্ত্রী বসালেন। আমরা স্বাধীনতার পরে পূর্ব পাকিস্তান ঘষে-মুছে বাংলাদেশ লিখেছি। শাসনে গুণগত পরিবর্তন হয়নি। একই কারণে ‘সংসদীয় গণতন্ত্র’ আসার পরও সেনাশাসন দুষ্ট শাসন-ব্যাধি দূর হয়নি। যখন ৯০ কার্যদিবস বাদ যাচ্ছে, তখন সংসদকে কোরাম ব্যামোতে ধরেছে। এটা ধানের আগামরা রোগের মতো। তাই সংসদে আইন নয়, আইনের চিটা উৎপন্ন হচ্ছে।
জরুরি অবস্থা ঘোষণায় শুধু ব্যক্তি রাষ্ট্রপতিকেই অবিশ্বাস। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভাকে অবিশ্বাস। সে কারণে দ্বাদশ সংশোধনীতে লেখা হলো, প্রধানমন্ত্রীর প্রতি-স্বাক্ষর লাগবে। এখন শুনি, জরুরি অবস্থা দিতে হলে মৃত সংসদ জ্যান্ত করা যাবে। বর্তমানে সংসদের দাম নেই। মন্ত্রিসভার দাম নেই। এখন যদি সংসদ মেয়াদ শেষে একটু জাতে ওঠে, তাহলে ক্ষতি কী। তবে লোক না হাসিয়ে কিংবা মানুষকে আরও আহাম্মক না ভেবে বলে দিলেই হয়, তখন শুধু বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী জ্যান্ত হবেন। তাঁর টিপসই নিলেই চলবে।
আমার প্রস্তাব, প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা ভারতের মতো সর্বাবস্থায় রাষ্ট্রপতির কাছে থাকবে। এটা শুনে মাথার চান্দি গরম করার দরকার নেই। পণ্ডিত নেহরুর ভাষ্যমতো, তবু এই রাষ্ট্রপতির তাতে প্রকৃত ক্ষমতা বাড়বে না। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা কিংবা প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বাধীন উপদেষ্টামণ্ডলী তাঁর মৃত্যু পরোয়ানায় সই দিতে বললে তিনি তা দিতে বাধ্য থাকবেন। না দিলেও সেটা কার্যকর হবে। এটাই সংসদীয় গণতন্ত্র। সাংবিধানিক শুদ্ধতার জন্য এর চেয়ে উত্তম বিকল্প আমরা পাইনি। রাষ্ট্রপতিকে নিঃস্ব রেখে তাঁর কাছে উপদেষ্টামণ্ডলীয় জবাবদিহি করার ভড়ংটুকু বাদ দিতে হবে। ওটাও সংসদের কাছে রাখা চলে। কেউ কি আছেন, একটা দেশের নাম করুন, যারা সংসদীয় গণতন্ত্র করে অথচ রাষ্ট্রপতির কাছে নির্বাহী ক্ষমতা রাখে না? এটা তাই কারও সাধ-আহ্লাদের বিষয় নয়। প্রধানমন্ত্রীসহ সবাইকে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতি এতই অস্পৃশ্য হলে এটাও হরণ করা হোক। সেটা পারবেন না। তাই তাঁর কাছে নির্বাহী ক্ষমতা রাখা সাংবিধানিক জুরিসপ্রুডেন্সের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দুই নেত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে বিজ্ঞ রাজনীতিকেরা রা করেন না। এটা আমরা বুঝি। কিন্তু আমাদের বুদ্ধিজীবীদের কী হয়েছে?
ড. আকবর আলি খান ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আরও একটি বিষয়ে একমত হন। দৈনন্দিন কার্যাবলিটা একটু টাইট দেবেন। এখানে স্ক্রুটা ঢিলা আছে। এটা আরেকটি অকার্যকর ও ভঙ্গুর দৃষ্টিভঙ্গি।
১৯৭৯ সাল। মোরারজি দেশাই ও জগজীবন রাম প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পরপর ইস্তফা দেন। রাষ্ট্রপতি সঞ্জীব রেড্ডি প্রধানমন্ত্রী করেন চৌধুরী চরণ সিংকে। আস্থা ভোটে তাঁর জেতার সম্ভাবনা ছিল না। চরণ সিং তাই সংসদ ভেঙে নির্বাচন দেওয়ার পরামর্শ দেন। কার্যত ভারতে তখন একটি নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। যদিও ভারতীয় সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বলে কিছু নেই। ওই প্রধানমন্ত্রীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ হলো। রিটের ছড়াছড়ি। আমি এ-সংক্রান্ত তিনটি (কলকাতা, মাদ্রাজ ও দিল্লি হাইকোর্টের) রায় পর্যালোচনা করেছি।
কলকাতা হাইকোর্ট বললেন, চরণ সিংয়ের তত্ত্বাবধায়ক মন্ত্রিসভা শুধু দৈনন্দিন কার্যাবলি পরিচালনা করবে। এমন কোনো সিদ্ধান্ত বা নীতিনির্ধারণী বিষয়ে তারা সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে অবশ্যই বিরত থাকবে, যাতে লোকসভার কাছে জবাবদিহিকারী নিয়মিত মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। তবে তাঁরা এও বললেন, ‘রাষ্ট্রপতি দরকারে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে স্বাধীন থাকবেন। যদিও রাষ্ট্রপতির এই ক্ষমতা সংবিধানে নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা নেই।’
আমরা মনে রাখব, কাউকে না পাওয়া গেলে রাষ্ট্রপতির প্রধান উপদেষ্টা হওয়া ছেলের জন্য কনে দেখতে গিয়ে বাবার বিয়ের মতো একটা বিষয়। এটা কোনো রীতিনীতিতে পড়ে না। ব্রিটেনে এটা প্রতিষ্ঠিত যে যখন কোনো দলই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখাতে ব্যর্থ হয়, তখন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগে রানির নিজস্ব বিচার-বিবেচনাই চূড়ান্ত হয়ে দাঁড়ায়। নিজেই নিজেকে গদিনশিন করার সুযোগ নেই।
জগৎবরেণ্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হেরল্ড জে লাস্কি ও স্যার আইভর জেনিংস তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো সংজ্ঞা দেননি। দৈনন্দিন কার্যাবলি ও নীতিনির্ধারণীর মধ্যে তাঁরা পার্থক্য সৃষ্টি করেননি। অ্যামিকাস কিউরি ও বিশেষ কমিটির আইনজীবী সদস্যদের কাছে দুর্গাদাস বসু নিশ্চয় পরিচিত নাম। সংবিধান বিশারদ বসু কিন্তু ‘দৈনন্দিন কার্যাবলি’তে নিয়ন্ত্রণ আরোপে কলকাতা হাইকোর্টের ওই প্রয়াসের যথার্থ সমালোচনা করেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি রেড্ডির সঙ্গে চরণ সিং বিরোধে জড়িয়েছিলেন। সঞ্জীব রেড্ডি একটি বিদেশি বাণিজ্য গ্রুপের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি একটি চুক্তি সম্পাদন এবং বিচার বিভাগীয় নতুন নিয়োগে ভেটো দিয়েছিলেন; যদিও রাষ্ট্রপতির ওই ক্ষমতা ভারতীয় সংবিধান আক্ষরিক অর্থে সমর্থন করে না।
নির্বাচিত নতুন সরকার আসা পর্যন্ত নীতিনির্ধারণী বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে কি হবে না, তা নিয়ে ব্রিটেনেও তর্ক আছে। তবে এটাই জোরালো যে নতুন সরকারের জন্যই অপেক্ষা করতে হবে। আমাদের সংবিধানের ৫৬(৪) অনুচ্ছেদে বাহাত্তর থেকেই একটি ছায়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল ও আছে। তারও ঐতিহ্যমণ্ডিত মূলমন্ত্র, নির্বাচনকালে বিদায়ী মন্ত্রিসভা নীতিনির্ধারণ করবে না। তাই বিচারপতি বসুর প্রশ্নের উত্তর আমাদের বিশেষ কমিটিকেও খুঁজতে হবে। বসু প্রশ্ন রাখেন, আগ্রাসন, সশস্ত্র বিদ্রোহ ইত্যাদির মতো ক্ষেত্রে কি তারা হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবে? এ ধরনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার কি রাষ্ট্রের অনায়ককালে (ইন্টারেগনাম) যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, কিংবা মহামারি মোকাবিলায় অসমর্থ থাকবে? হালসবারি থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেছেন, না, বসে থাকবে না। জাতির মর্যাদার সঙ্গে খাপ খাইয়ে তারা কাজ চালাবে। ১৯৭৯ সালের ২৩ আগস্ট দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় রাষ্ট্রপতি রেড্ডির একটি মন্তব্য ছাপা হয়। এতে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী চরণ সিং সরকার নতুন কোনো নীতি নেবে না। শুধু জাতীয় স্বার্থে জরুরি কাজ চালাবে। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ৩১ মার্চ ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘একটা জরুরি দরজা খোলা থাকবে।’ কিন্তু সেটা কীভাবে? সেই দরজা পেছনে নয়, সামনে রাখতে হবে। পাটকাঠির নয়, মেহগনি কাঠ দিয়ে দরজা বানাতে হবে। সংসদীয় পদ্ধতি চাইলে রাষ্ট্রপতিকে অবশ্যই নির্বাহী ক্ষমতা দিতে হবে। দিতে অক্ষম থাকলে সংবিধান অব্যাহতভাবে বিকলাঙ্গ থাকবে। কিন্তু রাজরোষের ভয়ে তা আলোচনাই করা যাবে না? এটা আদালতে চ্যালেঞ্জযোগ্য। কারণ নির্বাহী ক্ষমতাহীন রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেন। এটা না বৈধ, না শুদ্ধ।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত দুঃখজনকভাবে প্রধান বিচারপতিদের প্রধান উপদেষ্টা রাখতেও এখন একাত্ম। তাঁর এই দৃশ্যমান ভ্রান্তি সবচেয়ে ভয়ংকর। এ নিয়ে আলোচনা অন্য দিন। প্রধানমন্ত্রীর হাতে এককভাবে নির্বাহী ক্ষমতার অপকারিতা নিশ্চয় ওই দুই বিজ্ঞ আলোচকের অজানা নয়। বিষয়টি তাঁদের আলোচনায় এড়িয়ে যাওয়াকে কী বলা যায়। শেকসপিয়ারের হাস্যরসোদ্দীপক নাটিকা দ্য কমেডি অব এররস অবলম্বনে বলতে পারি, এটা হয়তো তাঁদের ‘ভ্রান্তিবিলাস’।
আপিল বিভাগের শুনানিতে অবশ্য একটা সুবাতাস বইছে। বিচারকদের উচ্চ রাজনৈতিক পদ গ্রহণের বিধানটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ধ্বংস করে দিয়েছে। আর এখন মৌলিক কাঠামো পুনরুদ্ধারের সময়।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.