দূরদেশ-গাদ্দাফির পতন, না দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ? by আলী রীয়াজ

লিবিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি যে ক্রমশ কেবল জটিল হয়ে পড়ছে, তা-ই নয়; অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, পরিস্থিতির ওপর সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষেরই এখন আর নিয়ন্ত্রণ নেই। কোনো যুদ্ধই একেবারে পরিকল্পিতভাবে অগ্রসর হয় না। এ ক্ষেত্রে অপূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা এবং শেষ লক্ষ্য নিয়ে সুস্পষ্ট ধারণা না থাকায় লিবিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও বেশি জটিল রূপ নিয়েছে।


জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে ১৯ মার্চ ফরাসি ও মার্কিন বিমান হামলার যখন সূচনা হয়, তখনো রাজনৈতিক ও সামরিক কোনো বিবেচনায়ই পশ্চিমা দেশগুলো কোনো রকম ঐকমত্যে পৌঁছায়নি। বেনগাজিকে অগ্রসরমাণ গাদ্দাফি বাহিনীর আক্রমণ থেকে রক্ষা করা এবং বিদ্রোহীদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য ফ্রান্সসহ অন্যান্য দেশ যখন সামরিক অভিযান শুরু করে, তখনো তাদের ধারণা ছিল না, মুয়াম্মার গাদ্দাফির প্রতিরোধ কতটা শক্তিশালী হবে। শুধু তা-ই নয়, যে বিদ্রোহীদের সমর্থনে পশ্চিমারা জোট বেঁধে লিবিয়ায় আক্রমণ চালিয়েছে, তাদের সম্পর্কেও কোনো রকম ধারণা তাদের ছিল না। এই অভিযান, প্রাথমিক হামলা ও অত্যাসন্ন লক্ষ্য অর্জন করার পর কার নেতৃত্বে কীভাবে পরিচালনা করা হবে, তা নিয়ে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করে এবং অভিযানের নেতৃত্ব ন্যাটোর হাতে হস্তান্তর নিয়ে সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়। তদুপরি আরব লিগ ‘নো ফ্লাই জোন’ প্রতিষ্ঠার অনুরোধ করার পর যুদ্ধের সূচনা দোদুল্যমান হয়ে পড়ে। রাশিয়ার তীব্র সমালোচনা অপ্রত্যাশিত না হলেও তার ভাষা ও সময় কোনোটিই যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের অনুকূলে যায়নি। প্রথম দুই সপ্তাহ এসব সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব হলেও যুদ্ধক্ষেত্রে পরিস্থিতির এমন কোনো নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেনি, যা থেকে কোনো পক্ষই আশাবাদী হতে পারে।
বিদ্রোহীদের অস্তিত্ব রক্ষা হয়েছে; তবে সেটা যে বড়জোর সাময়িক, তা বোঝা যায়, যখন তারা বারবার গাদ্দাফি বাহিনীর হামলায় পিছিয়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছে। দীর্ঘ মেয়াদে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো অস্ত্রশস্ত্র, নেতৃত্ব ও সংগঠন কোনোটিই বিদ্রোহীদের নেই। তারা বড়জোর তাদের আন্তরিকতা ও লক্ষ্য অর্জনের জন্য যেকোনো ত্যাগে প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করতে পারে। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই তাদের ত্রিপোলিতে নিয়ে যাবে না। কেননা, মুয়াম্মার গাদ্দাফির আচরণে স্পষ্ট, তিনি সহজে ক্ষমতা ত্যাগের লোক নন।
অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলো এই যুদ্ধে দীর্ঘ মেয়াদে জড়িত থাকতে উৎসাহী বা সক্ষম বলে মনে করার কারণ নেই। পরিস্থিতির চাপে দ্রুততার সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া দেশগুলোর অন্যতম হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক দুই বিবেচনায়ই ওবামা প্রশাসন এই যুদ্ধের সঙ্গে যতটা সম্ভব কম সংশ্লিষ্ট থাকতে চাইছে। মুয়াম্মার গাদ্দাফির সরকার এখন পর্যন্ত বড় ধরনের পরাজয়ের মুখোমুখি হয়নি। উপরন্তু, তারা বিদ্রোহীদের সম্মুখযাত্রাকে আটকে দিয়েছে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শহর পুনর্দখল করেছে। কিন্তু সরকার এটাও জানে যে, এই অবস্থা খুব বেশি সময় বহাল না-ও থাকতে পারে। তার সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি পদত্যাগ করেছেন এবং চাপ যতই বাড়বে তত বেশি লোকের পদত্যাগের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিভিন্ন পক্ষের এসব বিবেচনার পাশাপাশি মানবিক ক্ষয়ক্ষতির বিবেচনায়ও বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত রাখা কতটা সম্ভব, সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। বিদ্রোহী ও গাদ্দাফি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে বেসামরিক ব্যক্তিরা নিহত হচ্ছে কি না, সে খবর পাওয়া না গেলেও বিদেশি বিমান হামলায় বেসামরিক ব্যক্তিদের প্রাণনাশের খবর পাওয়া গেছে। যেসব শহরে যুদ্ধ চলছে, সেগুলো কার্যত জনশূন্য হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়ের দিক হচ্ছে শরণার্থী সমস্যা। লিবিয়া থেকে হাজার হাজার বিদেশি সীমান্ত অতিক্রম করে প্রতিবেশী তিউনিসিয়া ও মিসরে আশ্রয় নিয়েছেন। এই শরণার্থীদের সঙ্গে গত সপ্তাহে লিবিয়ার নাগরিকেরাও যোগ দিতে শুরু করেছে। মিসর ও তিউনিসিয়া উভয়ই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবিলা করছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এই সংখ্যা বাড়বে। আন্তর্জাতিক উদ্যোগ এই অবস্থা কতটা কার্যকরভাবে সামাল দিতে পারবে, তা বলা মুশকিল। যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি, সম্ভাব্য বড় আকারের মানবিক বিপর্যয় এবং ফলাফলের ব্যাপারে সংশয়ের কারণে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই মনে হচ্ছে যুদ্ধের নিষ্পত্তি করতে বিভিন্ন পথ খুঁজছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যুদ্ধের অবসান ও লিবিয়ার রাজনৈতিক সংকট সমাধানে সম্ভাব্য বিকল্পগুলো কী?
বিরাজমান পরিস্থিতিতে চারটি বিকল্প সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সামনে উপস্থিত হয়েছে। প্রথম বিকল্প হচ্ছে, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংকট থেকে উত্তরণ, যদিও গাদ্দাফি সরকার, পশ্চিমা দেশগুলো এবং বিদ্রোহীরা নিজ নিজ অবস্থানে কঠোরভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তথাপি এই বিকল্পটি একেবারে অসম্ভব কিছু নয়। বিদ্রোহী ও পশ্চিমা দেশগুলো চায়, গাদ্দাফি ক্ষমতা থেকে সরে যান। গাদ্দাফি ক্ষমতা থেকে সরবেন না বললেও যুদ্ধে পরাজয়ের চেয়ে তাঁর ঘনিষ্ঠজনের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে সম্ভাব্য বিচার এড়াতে পারলে সে পথ তিনি নেবেন না—এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। বিদ্রোহীরা ইতিমধ্যে জাতিসংঘের দূত আবদেল্লাহ আল খতিবের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যপক্ষে গাদ্দাফির উত্তরসূরি বলে বিবেচিত তাঁর ছেলে সাইফ আল ইসলামের দূত ব্রিটেনে সফর করে একটা গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ খুঁজতে আলোচনা করেছেন বলে গার্ডিয়ান ও অন্যান্য সূত্রে খবর বেরিয়েছে। এর আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে গাদ্দাফির ঘনিষ্ঠজনের কেউ কেউ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমাধানের জন্য চেষ্টা করছেন।
দ্বিতীয় বিকল্প হচ্ছে, অব্যাহত অচলাবস্থা। নো ফ্লাই জোন নিশ্চিত করতে বিমান হামলার সূচনার পর বিদ্রোহীরা যৎকিঞ্চিৎ সফল হলেও এখন পর্যন্ত তারা খুব বড় রকমের অগ্রগতি অর্জন করেনি। জাতিসংঘের যে প্রস্তাবের আওতায় বিমান অভিযান চালানো হয়েছে, তাতে বিদ্রোহী বাহিনীর সমর্থনে অব্যাহত বিমান হামলা চালানো সম্ভব হবে না। অন্যদিকে কেবল বিমান হামলা চালিয়ে যেকোনো সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায় না, তা কসোভোর বিমান হামলার অভিজ্ঞতারই সাক্ষ্য। একটানা ৭৮ দিনের বিমান হামলা মিলোসেভিচকে দুর্বল করলেও তা যথেষ্ট ছিল না। শেষাবধি যুদ্ধক্ষেত্রেই তার ফলাফল নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু লিবিয়ায় এত দীর্ঘ মেয়াদে বিমান হামলা চালানো অসম্ভব বলে মনে হয়। কেননা, এতে এই অভিযানের বিরুদ্ধে বিশ্বজনমত গড়ে উঠবে এবং তার পরিণতি ভালো হবে না। অচলাবস্থা কার্যত গাদ্দাফি সরকারের জন্য বিজয় বলেও বর্ণনা করা যায়। অচলাবস্থার সুযোগে বিদ্রোহীরা নিজেদের সংগঠিত করতে সক্ষম হলেও তাদের পক্ষে এই পরিস্থিতি অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে না, কেননা তার জন্য দরকার হবে অস্ত্রশস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও সংগঠন।
তৃতীয় বিকল্প হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ। এ ক্ষেত্রে যুদ্ধ মানে হচ্ছে, বিদ্রোহীদের পাশাপাশি বিদেশি সেনা মোতায়েন করা এবং তাদের নেতৃত্বে যুদ্ধ পরিচালনা করা। অনেকেরই স্মরণে থাকবে, ২০০১ সালে আফগানিস্তানে আহমেদ শাহ মাসুদের অনুসারী বাহিনীর সঙ্গে মার্কিনরা যুক্ত হয়ে তালেবান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। কিন্তু এ-ও ভুলে যাওয়ার অবকাশ নেই, সেই যুদ্ধের শেষ এখনো হয়নি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার ১১ বছর পর সেখানে প্রায় দেড় লাখ বিদেশি সেনা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা স্পষ্ট করেই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র লিবিয়ায় সেনা পাঠাবে না। তা ছাড়া জাতিসংঘের প্রস্তাব ১৯৭৩-এ বিদেশি সেনা কর্তৃক লিবিয়া দখলের বিরুদ্ধে সুস্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিকল্পের জন্য দরকার হচ্ছে, হয় বিদ্রোহীদের অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ অথবা বিদেশি সেনা পাঠিয়ে দেশের একাংশ দখল করা। উভয় ক্ষেত্রেই লিবিয়া কার্যত দুটি দেশে বিভক্ত হবে এবং অন্তহীন সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে। লিবিয়ার বিদ্রোহীদের অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে আরও কিছু বাধা রয়েছে। এর অন্যতম হলো, এর জন্য দরকার হবে প্রতিবেশী কোনো দেশকে স্টেজিং গ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করা। আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে একাধিকবার পাকিস্তান সেভাবে ব্যবহূত হয়েছে। লিবিয়ার কোনো প্রতিবেশী দেশ তাতে রাজি হবে, এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট গেটস কংগ্রেসে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বিদ্রোহীদের অস্ত্র সরবরাহের দায়িত্ব নেবে না; অন্য কোনো দেশ চাইলে তারা করতে পারে। ইতিমধ্যে লিবিয়ায় সিআইএর গোয়েন্দারা উপস্থিত হয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। অনুমান করা যায়, তাঁরা বিদ্রোহীদের পরিচয়, তাদের লক্ষ্য এবং নেতৃত্বের বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পেতে চাইছেন। তাদের সাংগঠনিক পরামর্শ দেওয়ার কাজেও সম্ভবত এই গোয়েন্দারা যুক্ত আছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এই বিদ্রোহীদের ব্যাপারে সংশয়মুক্ত এবং দীর্ঘ মেয়াদে এর পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত না হলে কোনো রকম আশু পদক্ষেপ নেবে না বলে ধারণা করা যেতে পারে। লিবিয়া বিষয়ে লন্ডন সম্মেলনে অন্যদের বক্তব্য থেকেও মনে হয়, তারাও একই রকম দ্বিধান্বিত।
চতুর্থ বিকল্প হচ্ছে, গাদ্দাফি সরকারের পতন। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনসহ অন্যান্য দেশ স্পষ্ট করেই বলেছে, তারা চায় গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত হোক। কিন্তু তা যুদ্ধের মধ্য দিয়েই অর্জন করতে হবে বা করা যাবে বলে তারা নিশ্চিত নয়। এমতাবস্থায় তাদের সবচেয়ে বিকল্প পথ হচ্ছে, যদি গাদ্দাফির ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচরেরা তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুসা কুসার পক্ষ ত্যাগ এবং অন্য কয়েকজনের সে ধরনের সম্ভাবনার খবর থেকে অনেকে আশাবাদী যে এই বিকল্পটির সম্ভাবনা একেবারে বাতিল করা যায় না। কিন্তু এ বিকল্প ধীরে ধীরে ঘটবে, তা নয়। এই সম্ভাবনা যদি শিগগিরই বাস্তবায়িত না হয়, তবে বুঝতে হবে, এটি প্রত্যাশা না করাই ভালো।
এই চারটি বিকল্পের কোনটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবের মুখ দেখবে, তা বলা কঠিন। অন্যদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে নাটকীয় কোনো পরিবর্তন, যেমন বিদ্রোহী বা গাদ্দাফি বাহিনীর অপ্রত্যাশিত সাফল্য ঘটলে এর কোনোটিই হয়তো বিবেচিত হবে না।
তেমনটি না ঘটা পর্যন্ত কূটনৈতিক ও সামরিক উদ্যোগ আবর্তিত হবে এই চারটি বিকল্পকে কেন্দ্র করে।
ইলিনয়, ১ এপ্রিল ২০১১
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

No comments

Powered by Blogger.