জনগণের স্বপ্ন by এমাজউদ্দীন আহমদ

সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার মহান মন্ত্রের উচ্চারণে যেমন ফ্রান্সের রাজনৈতিক আকাশে সূচনা হয়েছিল প্রলয়ংকরী ঝড়ের; সাম্য, স্বাধীনতা ও স্বাচ্ছন্দ্যের অন্বেষণের স্বতঃস্ফূর্ত দাবি যেমন আমেরিকার ১৩টি কলোনিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল স্বাধীনতাসংগ্রামে; তেমনি সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়পরায়ণতার নিশ্চয়তা বিধানের দাবি বাংলাদেশের


জনগণকে উদ্দীপ্ত করেছিল বাংলাদেশকে স্বাধীন-সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্ররূপে প্রতিষ্ঠার জীবন-মরণ সংগ্রামে আত্মনিবেদনে। আমাদের স্বাধীনতার মাস মার্চ, বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। মুক্তিযোদ্ধা তথা সমগ্র জনগোষ্ঠীর সার্থকতা ও আত্মত্যাগ এবং গৌরবের মাস দুটি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অর্জন এই জাতির শ্রেষ্ঠতম অর্জন। লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ় সংকল্প ছিলেন সবাই, কিছুসংখ্যক বিপথগামী বাদে। অতি অল্প সময়ের মধ্যে আত্মত্যাগ আর সীমাহীন যন্ত্রণা, অত্যাচার, নির্যাতন ভোগ করেও আমাদের এই অর্জন ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।
বাঙালির এই অর্জনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা যায়নি, তা দুঃখজনক হলেও সত্য। স্বাধীনতার লক্ষ্য ও স্বপ্ন ছিল অনেক বড়; কিন্তু একটি বিজয়ী জাতিকে, জাতীয় ঐক্যকে খণ্ডবিখণ্ড করা হলো। এ কথা সত্য, বাঙালির রক্ত আর প্রাণ বিসর্জন বৃথা যায়নি। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম তা সার্থক করে তুলেছিল। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এ দেশের মানুষ যা চেয়েছিল তা কি তাদের হাতের নাগালে এসেছে? স্বাধীনতার চার দশক পর আজ হিসাব-নিকাশ মিলছে কি? এসব প্রশ্ন উপেক্ষার নয়। ইতিহাস সচেতনতা আমাদের তেমন প্রখর নয়। স্মৃতির ধারণক্ষমতাও তেমন সুদৃঢ় নয়। এসব কারণে মাঝেমধ্যে ভীতসন্ত্রস্ত্র হই। সিরাজদ্দৌলা বিদেশি বেনিয়াদের যতটুকু ঘৃণা করতেন, মীর কাসিমের ঘৃণাও ছিল তেমনি। কিন্তু ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ১৭৬৪ সালে বঙ্ারের যুদ্ধে জয়লাভ যে সম্ভব নয়, তা অনুধাবনে উভয়ের মধ্যে পার্থক্য ছিল আকাশ-পাতাল। এ জন্য দুজনকেই পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে নিঃশেষ হতে হয়েছে। কেউ পাননি বিজয়ের স্বাদ। কিন্তু আমরা বিজয়ের স্বাদ ধরে রাখতে চাই। আমরা আমাদের বিজয়ের সড়ক ধরেই এগিয়ে যেতে চাই।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ যার সূচনা হয়েছিল, ১৬ ডিসেম্বর তারই পরিপূর্ণতা লাভ ঘটে। দুটিই কিন্তু রক্তাক্ত দিন। রক্তসিক্ত ২৬ মার্চ সবাইকে ডাক দিয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে। নিজেদের যুদ্ধ নিজেরা করে শক্ত হাতে বিজয় ছিনিয়ে আনার দৃঢ় সংকল্পসহ। এ জন্য ২৬ মার্চকে বলা যেতে পারে রক্তদানের আকুতির প্রতীক। আত্মশক্তি উদ্বোধনের নিশানা। আর ১৬ ডিসেম্বর হলো এক জীবন-মরণ সংগ্রামের শেষ অধ্যায়। গৌরবদীপ্ত বিজয়ের স্পর্শধন্য এক রেড লেটার দিবস। আমাদের জাতীয় ইতিহাসে দুটিই উজ্জ্বলতম দিন। স্বপ্নের বাংলাদেশকে জনগণের স্বপ্নরাজ্যে পরিণত করতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সব বাংলাদেশিকে উন্নত জীবনবোধে উদ্দীপ্ত করা। এ লক্ষ্যে প্রয়োজন সুশিক্ষা এবং সুশিক্ষার মাধ্যমে শুধু সবাইকে মেধাবী ও চৌকস নাগরিকে পরিণত করাই নয়, সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে উত্তম ব্যক্তিরূপে রূপান্তরিত করা। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এই ভূখণ্ডে এসব স্বপ্নের বাস্তবায়নই ছিল মূল লক্ষ্য। মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার ছিল বৈষম্যহীন ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, গণতন্ত্রের পথে হাঁটা। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গণতন্ত্র। কিন্তু স্বাধীনতা লাভের চার দশক পরও আমাদের লক্ষ্য অর্জন হয়নি, জনগণের স্বপ্ন পূরণ হয়নি।
বাংলাদেশের জনগণের স্বপ্ন কিন্তু সার্থক গণতন্ত্র। শুধু কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নয়, স্থানীয় পর্যায়েও নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হোক- তাও প্রত্যাশিত। সমাজব্যাপী আইনের প্রাধান্য সুপ্রতিষ্ঠিত করা, বাকস্বাধীনতা, সমাবেশ করার অধিকার- সবই জনগণের স্বপ্ন। কিন্তু এসব নানা ক্ষেত্রে আজ বাধা। নিকট অতীতে বিরোধী জোটের সভা-সমাবেশে শুধু বাধা নয়, জনগণের অংশগ্রহণের পথে যেসব প্রাচীর দাঁড় করানো হচ্ছিল, তা বিস্ময়কর। জনগণের স্বপ্নের পথে কাঁটা। জনগণের স্বপ্ন কি স্বপ্নই থেকে যাবে? কখন তাদের এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে- এটি জরুরি প্রশ্ন। জনকল্যাণমুখী রাজনীতির জন্যই গণতন্ত্র। দেশের জনগণ গণতন্ত্রের স্বপ্নে বিভোর, তবে তা আরোপিত গণতন্ত্র নয়। শাসক মহল নিজেদের মতো করে গণতন্ত্র কিংবা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রচলন ঘটাতে চাইলে তা জনগণের স্বপ্নের মাঝখানে অগ্রগতির ক্ষেত্রে তা বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়াবে এবং আমরা লক্ষও করছি কিন্তু তা-ই। মতানৈক্য থাকবেই। ভিন্নমত পোষণ করার ক্ষেত্রে যে সমাজ ও রাষ্ট্রে বাধা সৃষ্টি করা হয়, সে সমাজ কিংবা রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হতে পারে না। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের ক্ষেত্রেও এসব কর্মকাণ্ড বড় ধরনের অন্তরায় সৃষ্টি করে। ভিন্নমত ও ভিন্নপথ আছে বলেই তো সমাজজীবনে গতি আছে। সৃষ্টি হয়েছে গতিশীলতা। ভিন্নমত, ভিন্নপথ আছে বলেই তো রাজনীতির জন্ম হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে রাজনীতির ছোট দূরত্বকে বিশালাকার করে তোলার ক্ষেত্রে পারঙ্গম। এর অবসান হওয়া জরুরি।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সৌন্দর্য হলো আইনের শাসন। কিন্তু আইনের শাসন কতটা কার্যকর আছে, সে প্রশ্ন বর্তমানের প্রেক্ষাপটে অবশ্যই বড় হয়ে উঠেছে। দলীয় শাসনের নিয়ন্ত্রণ একবার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে পড়ে এ কারণে যে এরপর শাসন অন্য দলের হাতে এলে তারাও একই নীতি অনুসরণ করবে। দলীয় চিন্তাভাবনার সবচেয়ে বড় ক্ষত হলো, সমাজের বিভিন্ন স্তরে তা পরিব্যাপ্ত হয়ে পড়ে। এমনকি নিম্নস্তরের দায়িত্ব পালনকারীরাও দলীয় আনুগত্যের কবলে পড়েন। এমনটিও লক্ষ করা যাচ্ছে খুব উদ্বেগের সঙ্গে। এ সবই জনগণের স্বপ্নের বিপরীত। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বই পারে জাতিকে বিভক্তির কবল থেকে মুক্ত করতে। জাতীয় পর্যায়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে জনগণের স্বপ্নের বাস্তবায়ন করতে হবে। এই জনপদকে সব সংকীর্ণতা, বিচ্যুতি, হীনমন্যতা, অসাম্য, পক্ষপাতিত্ব, দুর্নীতি থেকে মুক্ত করতে দৃঢ় অঙ্গীকার ও এর বাস্তবায়ন দরকার। মনে রাখা দরকার, আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশে কিন্তু এসবের স্থান নেই। একই সঙ্গে এও বলা দরকার, জনগণকেও রাজনৈতিকভাবে সচেতন হতে হবে। ১৯৭১ সালের অগি্নকুণ্ড থেকে স্বাধীন দেশের পতাকা ছিনিয়ে নেওয়ার আগ পর্যন্ত আমাদের কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল না। হাজারো ধারার রক্ত ঝরিয়ে, এক সাগর রক্ত ডিঙিয়ে, আমরা তা অর্জন করেছি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। জনগণ সেদিন যে স্বপ্ন দেখেছিল, সে স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে বাংলাদেশে এবং এর মধ্য দিয়েই স্বাধীনতা ও জনগণের স্বপ্ন সার্থক করে তুলতে হবে।
লেখক : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

No comments

Powered by Blogger.