বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনপ্রতিক্রিয়া-উপাচার্যের দম্ভ বনাম সাংবাদিকের দায়

আমরা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিক। পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে আমরা জেনেছি, সাংবাদিকতার মানেই হলো সমাজে কোনো না কানো কায়েমি স্বার্থের বিরুদ্ধে সক্রিয়তা। ঘটনার প্রতি নির্মোহ থেকে আমরা চেষ্টা করি বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা চর্চার।


অন্যদিকে এই বস্তুনিষ্ঠতার সঙ্গে বিরোধ নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো অন্যায্য কার্যক্রম চালাতে থাকে। আপসহীন সাংবাদিকতার সঙ্গে এখানেই বিশ্ববিদ্যালয় নামক প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতাসীনদের দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বে অনেক সাংবাদিক নিগৃহীত হন, শারীরিক ও মানসিক আক্রমণের শিকার হন, মামলার ঝামেলায় পড়েন।
এ রকম ঘটনার সর্বশেষ নজির হলো, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে একদল নবিশ সাংবাদিকের প্রতি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ উদ্দিনের দম্ভোক্তি। তিনি বললেন, ‘সাংবাদিক বলতে কিছু নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকের কোনো প্রয়োজন নেই। আমাদের সংবাদ পাঠানো লাগবে না।্র বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেসক্লাবের কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।’ বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিকেরা উপাচার্যের কাছে একজন সতীর্থ সাংবাদিকের বহিষ্কারের ব্যাপারে কথা বলতে গেলে তিনি এসব মন্তব্য করেন। ছাত্র উপদেশ ও নির্দেশনা পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস এ সময় বলেন, ‘শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিলেট প্রেসক্লাব মাত্র দুই কিলোমিটারের পথ। তিন কিলোমিটার গেলে সব স্থানীয় দৈনিক পত্রিকার অফিস পাওয়া যায়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো সাংবাদিকের প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। শহরের সাংবাদিকেরাই এখান থেকে নিয়মিত নিউজ করতে পারবে। এখানে অধ্যয়নরতদের শিক্ষানবিশ ও পার্টটাইমের কোনো সুযোগ নেই। বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্টে ছাত্রদের সাংবাদিক বলে আলাদা পরিচয় বহন করার মতো অধিকার কাউকে দেওয়া হয়নি। যে সাংবাদিককে বহিষ্কার করা হয়েছে, তাকে সাংবাদিক হিসেবে নয় বরং ছাত্র হিসেবে বহিষ্কার করা হয়েছে।’ সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে ছাত্র উপদেশ ও নির্দেশনা পরিচালক বলেন, ‘সাংবাদিকদের শাস্তি দেওয়ার বিধান যদি দেশের আইনেও না থাকে, তাহলেও আমরা দেব’ (বার্তা টোয়েন্টিফোর ডট নেট http://barta24.net/news/7256—সাংবাদিক বলতে কিছু নেই: শাবি উপাচার্য)। এই সংবাদ দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে।
উপাচার্য ও তাঁর সহকর্মীর রাগান্বিত বক্তব্য একেবারেই যুক্তিহীন। খবর প্রকাশের দায়ে তিনি একটি দৈনিক পত্রিকাকে সমালোচনা করতে পারেন। মিথ্যা তথ্য প্রকাশের কারণে তিনি পারেন প্রতিবাদ বা বিবৃতি ছাপাতে। পারেন সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ ঠুকে দিতে। কিন্তু উপাচার্য সে পাথে না গিয়ে তিনি যে ক্ষমতাবান আর ছাত্র নির্দেশক যে তাঁর চেয়ে আরও বেশি ক্ষমতাবান, তা প্রমাণ করে ছাড়লেন।
উপস্থিত সাংবাদিকেরা উপাচার্যের কাছে জানতে চান, স্থানীয় একটি দৈনিকের সাংবাদিককে কীভাবে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট ছাড়াই বহিষ্কার করা হলো? জবাবে উপাচার্য বলেন, ‘যে পত্রিকায় খবর ছাপাবে, সেই সংবাদ যদি আমাদের কারোর জন্য মানহানি কিংবা কুরুচিসম্পন্ন হয়, তখন সেই পত্রিকার সংবাদদাতাকে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী শাস্তি দেব।’ না মাননীয় উপাচার্য, আমরা আপনার সঙ্গে একমত হতে পারলাম না। সাংবাদিককে কেন সংবাদের তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া হলো না; শাহ পরাণ হলের ওই সাংবাদিকের কক্ষে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় ছাত্রলীগের কর্মীদের বহিষ্কার করা হলো না কেন—এসব প্রশ্নের কোনো সদুত্তর মেলেনি।
এই পরিস্থিতি কি শুধু শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে? বিনীত উত্তর—না! এ অবস্থা রাজশাহী, ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে সরকার-সমর্থিত ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগকে একাধিকবার সতর্ক করা হলেও ছাত্রলীগ তাদের অপকর্মের ধারা অব্যাহত রেখেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আওয়ামী লীগ সরকারের ২৬ মাসে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্বের মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত ছাত্রলীগের কর্মীরা সম্প্রতি সাংবাদিকদের ওপর আগ্রসী হয়ে উঠেছেন। ঢাকাসহ সব বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকেরা একাধিকবার ছাত্রলীগের কর্মীদের হাতে প্রহূত ও লাঞ্ছিত হলেও কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকেদের নিরাপত্তার জন্য দৃষ্টান্তমূলক কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বর্ধিত বেতন ও ফি-বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্ধিত বেতন-ফির সিন্ডিকেট সিদ্ধান্তের কপিটি কোথাও পাওয়া যাচ্ছিল না। সিন্ডিকেট সভার ১৬ দিন পর সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে তা আমাদের হাতে এল। আমরা তা পত্রিকায় প্রকাশ করেছিলাম। ফল হিসেবে পেলাম তিন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক দ্রব্য বহন ও ভাঙচুর আইনে মামলা, পুলিশের লাটিপেটা! চবির্র সিন্ডিকেট সভার একটি বৈধ কপি সরবারাহে প্রশাসনের মাত্রাতিরিক্ত লুকোচুরিই আমাদের আরও অনুসন্ধানী করে তুলেছিল।্রশুধু চবি নয়, আমরা সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকেরা তথ্য প্রকাশের জন্য হুমকি, প্রলোভন, পরীক্ষার ফল বিপর্যয় এমনকি হামলা-মামলারও শিকার হচ্ছি।
আমাদের নিজেদের সমালোচনাও করা উচিত। সাংবাদিকতার নামে প্রশাসনের প্রেসরিলিজের মুখাপেক্ষী হওয়া বা নিষ্ক্রিয় সাংবাদিকতার মাধ্যমেও আমাদের বেশ কিছু বন্ধু অপার সুখে দিনাতিপাত করেন। দখলদার রাজনৈতিক শক্তির প্রতিনিধি হয়েও কেউ কেউ সাংবাদিকতা পেশায় ভিড়ছেন। তাঁদের ব্যাপারে আমাদের পরামর্শ হলো, সাংবাদিকতার মান-মর্যাদা নিয়ে দাঁড়াতে না পারলে সাংবাদিকতা করার কোনো অধিকারই আপনার থাকে না।
বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিকতা প্রসঙ্গে আমাদের সোজা কথা হলো এই, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সার্বজনীন স্বার্থবিরোধী গোপন ফাইল, সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের দলিল, দ্বিপক্ষীয় চুক্তিনামা ইত্যাদি উপাচার্যের দপ্তর থেকে প্রকাশ করা কোন মতে আইনবিরুদ্ধ কাজ? এসব দলিলের অনুলিপি সাংবাদিকদের হাতে পৌঁছে যাওয়ার অর্থ হলো, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সাংবাদিকেরা তথ্য অনুসন্ধানে দক্ষ হয়ে উঠছেন! এর জন্য যেকোনো গণতান্ত্রিক উপাচার্যের উচিত সংবাদপত্রকে প্রশংসা করা, সাংবাদিককে ডেকে ভর্ৎসনা বা তিরস্কার করা নয়।

লেখকবৃন্দ: নূরে আলম, আহমেদ জায়িফ, মাসুম বিল্লাহ, মেহেরুল হাসান, শেখ আল এহসান, এ এম জাহিদ, লাকমিনা জেসমিন, গোলাম মুজতবা, শামসুজ্জামান শামস, আশিক হোসেন, সানাউল্লাহ সাকিব, ওয়ালিউল্লাহ, আবদুল্লাহ আল মামুন, ইফতেখার ফয়সাল, মাসউদুল আলম, নির্ঝর মজুমদার, সুজন ঘোষ,্র এমদাদুল হক ও রাজীব নন্দী।
লেখকেরা ঢাকা, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিক।

No comments

Powered by Blogger.