তৃতীয় ধারা ও বাস্তবতা by তারেক শামসুর রেহমান

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন দুটি জোটের বাইরে তৃতীয় একটি জোট গঠনের কথা ইদানীং শোনা যাচ্ছে। গত ১৭ অক্টোবর একটি জাতীয় দৈনিকের খবর ছিল এটি। ওই খবরে বলা হয়েছে, চারটি দল


শিগগিরই একটি জোট গঠন করতে যাচ্ছে। এই চারটি দল হচ্ছে- অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্প ধারা, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম, কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ এবং আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডি। খবরটি শীর্ষ সংবাদ হিসেবে ছাপা হলেও বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা। এই চারটি দলই ব্যক্তিসর্বস্ব। অধ্যাপক চৌধুরী সৎ ও গুণী ব্যক্তি তাতে সন্দেহ নেই। ১৮ দলীয় জোটে যোগ না দিলেও যুগপৎ আন্দোলনে তাদের সঙ্গে আছেন। ব্যক্তি বদরুদ্দোজা চৌধুরী ছাড়া বিকল্প ধারার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো বড় জোট ছাড়া তিনি নিজে কিংবা তাঁর ছেলে মাহি চৌধুরী আদৌ বিজয়ী হতে পারবেন কি না সন্দেহ। যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর এখন রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়া উচিত। তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তাঁর তো আর কিছু পাওয়ার নেই। তিনি নিশ্চয়ই 'মোহম্মদউল্লাহ' স্টাইলে আবার ভবিষ্যতে কোনো মন্ত্রী হবেন না। তিনি জাতির অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেই ভালো করবেন। ড. কামাল হোসেন নিঃসন্দেহে ভালো লোক, সৎ এবং আন্তর্জাতিক সম্মান তাঁর রয়েছে। তাঁর নিজের সংসদীয় কোনো আসন নেই। একবারই ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর ছেড়ে দেওয়া আসনে তিনি বিজয়ী হয়েছিলেন। তারপর আর তাঁকে সংসদে দেখা যায়নি। তাঁর দল ছোট, তাও ভেঙে গেছে। এই দল নিয়ে কারো সঙ্গে যাওয়া কি না যাওয়া, তাতে কিছু যায়-আসে না। ব্যক্তি কামাল হোসেন তৃতীয় ধারার প্রবক্তা। কিন্তু দুঃখ এটাই, তাতে জনগণের তেমন সাড়া নেই। তাঁর মতো একজন গুণী লোক কেন একটি 'গণজোয়ার' সৃষ্টি করতে পারলেন না- এটা আমি ভেবে পাই না। তাঁর যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু সেই সম্ভাবনা তিনি নিজেই নষ্ট করেছেন। ঢাকার বাইরে জেলা শহরগুলোতে তিনি কখনো গেছেন- এটা কেউ বলতে পারবে না। এমনকি এই খোদ ঢাকা শহরে তিনি কখনো গণসংযোগে বেরিয়েছেন, তাও কেউ বলতে পারবে না। তবে হ্যাঁ, ইস্যুভিত্তিক তিনি সোচ্চার হন। বলেন। তাঁর কর্মকাণ্ড অনেকটা সেমিনার অর্থাৎ প্রেসক্লাব-ভিত্তিক। 'বেইলী রোড' থেকে তিনি গণফোরামকে জনগণের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারেননি।
একসময়ের তুখোড় বক্তা ও জাসদ নেতা আ স ম আবদুর রব এখন ক্ষুদ্র জেএসডি নিয়ে আছেন। মূলধারা চলে গেছে ইনুর হাতে। জাসদ নিয়ে তাঁর মধ্যে বিভ্রান্তি আছে। একবার বলেন, জাসদকেন্দ্রিক রাজনীতি তিনি করেন না, কিন্তু সেই জাসদকে (জেএসডি) তিনি ছাড়তেও পারলেন না। তাঁরও একটা সম্ভাবনা ছিল। সেই সম্ভাবনাও তিনি কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছেন। ব্যক্তি হিসেবে মানুষ তাঁকে চেনে। কিন্তু দলকে কেউ চেনে না। সংসদীয় আসনে তাঁর একটা 'অবস্থান' আছে। কিন্তু প্রেক্ষাপট বদলে যাচ্ছে। কোনো বড় দলের সমর্থন না পেলে তাঁর পক্ষে সংসদে ফিরে আসা কষ্টকর। পারবেন না। আওয়ামী লীগ-বিরোধী ভূমিকার কারণে তিনি সুপরিচিত। নির্বাচনে জিততে হলে তাঁকে তাকাতে হবে বিএনপির দিকে। 'তৃতীয় ধারা' তাঁর বিজয়কে নিশ্চিত করবে না। কাদের সিদ্দিকীও ব্যক্তিনির্ভর দলের প্রধান। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের নাম মানুষ যতটুকু না জানে, তার চেয়েও বেশি জানে ও চেনে কাদের সিদ্দিকীকে। দলেও তিনি পরিবারতন্ত্র কায়েম করেছেন, যদিও তিনি রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের বিরোধিতা করেন। তাঁদের এই চারজনের সমন্বয়ে কী হবে? সংসদীয় রাজনীতিতে এসব দলের আদৌ কি কোনো ভূমিকা আছে। সংসদীয় আসনে জিততে হলে তাঁদের হয় আওয়ামী লীগ নতুবা বিএনপির ওপর নির্ভর করতে হবে। কাদের সিদ্দিকী সংসদে গিয়েছিলেন বটে, কিন্তু তা সম্ভব হয়েছিল বিএনপির সমর্থন তথা আসন ছেড়ে দেওয়ার কারণে। এককভাবে তিনি কি জিততে পারবেন? মনে হয় না। এ ক্ষেত্রে তাঁকে আবারও বিএনপির সমর্থন নিতে হবে। তৃতীয় ধারার কথা বলে তিনি এই সমর্থন নিশ্চিত করতে পারবেন না। এখানে জাতীয় পার্টির একটি ভূমিকা লক্ষ করার বিষয়। উত্তরবঙ্গ-নির্ভর এই দলটির এলাকাভিত্তিক সমর্থন রয়েছে। এরশাদ নয়াদিল্লি ঘুরে এসে বলেছেন, তিনি এককভাবে নির্বাচন করবেন। তিনি যদি আলাদা একটি জোট গঠন করার চেষ্টা করেন (যা তিনি করেছিলেন পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে), তাতে কিছু লোককে তিনি টানতে পারবেন। অতীতে একাধিকবার বিকল্প ধারা, গণফোরাম, জেএসডি ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগকে নিয়ে এরশাদের একটি জোট গঠনের কথা বলা হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে প্রচুর। নেতৃত্ব একটা বড় প্রশ্ন। কে জোটের নেতৃত্ব দেবেন? এরশাদ, না বি চৌধুরী, না কামাল হোসেন? এখানে রাজনীতি যতটা না সুস্থ, তার চেয়েও মুখ্য ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব। এই সম্ভাবনাও এখন ক্ষীণ। ঘুরেফিরে তাই দুই জোটের প্রশ্নই এসে যায়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট কিংবা বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অবিসংবাদিত 'সত্য'। এই 'সত্য'কে অস্বীকার করা যাবে না। মহাজোট সরকার গত প্রায় চার বছরের কর্মকাণ্ডে সফল, তা কোনোমতেই বলা যাবে না। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের ভোগান্তি যত না বেড়েছে, তার চেয়েও মহাজোটের বেশি ক্ষতি করেছে হলমার্ক কেলেঙ্কারি ও শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির ঘটনা। এর পেছনের মানুষগুলোকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগে আমাদের মান-সম্মান ও সরকারের গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে পশ্চিমা বিশ্বে। সেই সঙ্গে গুম, হত্যা, কেলেঙ্কারির ঘটনা এখন সরকারের 'গলার কাঁটা'। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন এনেও সাধারণ মানুষের আস্থা নিশ্চিত করা যায়নি। ভারতের প্রতি অতিমাত্রায় নির্ভরতা ও অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা দেওয়া পররাষ্ট্রনীতিতে একটি 'বড় ব্যর্থতা' হিসেবেই চিহ্নিত হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নামসর্বস্ব দলের অন্তর্ভুক্তি থাকলেও ব্যক্তি বেগম জিয়ার গ্রহণযোগ্যতা বিশ্বে বেড়েছে। অতিসম্প্রতি চীনের উপরাষ্ট্রপতি জি জিংপিনের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ এবং ২৮ অক্টোবর তাঁর ভারত সফরের মধ্য দিয়ে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে বেগম জিয়াই হচ্ছেন বাংলাদেশের 'বিকল্প নেতা'। জি জিংপিনের মতো সিনিয়র নেতা (যিনি চীনের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন) যখন খালেদা জিয়াকে সাক্ষাতের সময় দেন, তখন এতে একটি স্পষ্ট 'সিগন্যাল' থাকে। ভারতও তার সেই পুরনো পিণ্ড (আওয়ামী লীগকে সমর্থন) থেকে বেরিয়ে আসছে। খালেদা জিয়াকে নয়াদিল্লিতে আমন্ত্রণ এ কথাই প্রমাণ করে যে ভারত তার জাতীয় স্বার্থকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। বাংলাদেশে তার স্বার্থ যাতে অক্ষুণ্ন থাকে, ভারত এটাই চাইবে। খালেদা জিয়াকে আমন্ত্রণ জানিয়ে তারা সেটাই নিশ্চিত হতে চাইছে। আমরা সেই পুরনো বলয় থেকে বেরোতে পারছি না- আওয়ামী লীগের 'বিকল্প' তৃতীয় ধারা নয়, বরং আওয়ামী লীগের বিকল্প বিএনপিই। সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসও তা-ই বলে। দীর্ঘদিন ধরেই 'তৃতীয় ধারা'র কথা বলা হলেও নূ্যনতম কোনো কর্মসূচি তাঁরা উপস্থাপন করতে পারেননি। তাঁরা নিজেদের আওয়ামী লীগ বা বিএনপির বিকল্প হিসেবেও উপস্থাপন করতে পারেননি। তাঁদের কর্মকাণ্ড শুধু ঢাকা শহরেই সীমাবদ্ধ, ঢাকার বাইরে যে বিশাল বাংলাদেশ, সেখানে তাঁদের পদচারণ নেই। তাঁরা এটা বোঝেন বলেও মনে হয় না। তাই যে চারটি দলের কথা বলা হয়েছে, তাঁরা শুধু আলোচনাতেই থাকবেন। কিন্তু কোনো 'আবেদন' সৃষ্টি করতে পারবেন না। কাগজে শীর্ষ সংবাদ হয়ে কারো কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায় বটে, কিন্তু তা সাধারণ জনগণের মধ্যে কোনো আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে না। তৃতীয় ধারার উদ্যোক্তারা যদি বিষয়টি নিয়ে ভাবেন, তাহলে তাঁরা এর জবাবও খুঁজে পাবেন।

লেখক : অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
tsrahmanbd@yahoo.com
www.tsrahmanbd.blogspot.com

No comments

Powered by Blogger.