ভিন্নমত-তবু ক্ষমতাটা বাংলাদেশ ব্যাংককে দিন by আবু আহমেদ

আজকাল অর্থ মন্ত্রণালয় এবং দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে যেন একটা বিরোধ চলছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বশাসন ও স্বাধীনতার পক্ষে অর্থনীতিবিদরাসহ সিভিল সমাজের সবাই সোচ্চার ছিল এবং এখনো আছে।


কিন্তু সেই স্বশাসন ও স্বাধীনতাটা তো দিতে হবে আইন দ্বারা সংজ্ঞায়িত এবং পরিধি নির্ধারিত আইন দ্বারা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক প্রচলিত অর্থের কোনো ব্যাংক নেই। বস্তুত এর সৃষ্টিই হয়েছে তিনটি উল্লেখযোগ্য কাজকে সামনে রেখে। এই তিনটি কাজ হলো-
এক. নোট ইস্যু করা।
দুই. ম্যাক্রো স্থিতিশীলতা তথা মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
তিন. বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে রেগুলেট করা। আর এ লক্ষ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংক অধ্যাদেশে-১৯৭২ এবং ব্যাংকিং কম্পানি অ্যাক্ট-১৯৯১ জারি এবং প্রণয়ন করা হয়েছে।
সময়ে সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক অধ্যাদেশ এবং ব্যাংকিং কম্পানি অ্যাক্টে পরিবর্তন আনা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক যাতে নিজে আরো বেশি স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আরো ভালোভাবে রেগুলেট তথা তদারকির মধ্যে রাখতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিরোধটা সবার চোখে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের বিশাল ঋণ বা অর্থ লোপাটের কেলেঙ্কারির ঘটনার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তনসহ ওই কেলেঙ্কারির ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়েরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কেলেঙ্কারি ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও ওই একই গ্রাহককে ঋণ দেওয়া অব্যাহত ছিল এবং একটা পর্যায়ে বিষয়টাকে স্রেফ ব্যাংক-গ্রাহকের সম্পর্কের আঙ্গিকে দেখার চেষ্টা করা হলো। অন্য কথায় কেলেঙ্কারিকে অস্বীকার বা লুকানোর চেষ্টা করা হলো। শেষ পর্যন্ত সেটা করা সম্ভব হয়নি। দেরিতে হলেও দুর্নীতি দমন কমিশন এ ক্ষেত্রে একটা ভূমিকা পালন করছে। তবে জনগণ এই কেলেঙ্কারির একটি ইতি দেখতে চায়, যেটা তাদের পক্ষে যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংক অন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে প্রায় ইচ্ছামতো রেগুলেট করতে পারলেও সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এই রেগুলেটরের ক্ষমতা অতি সীমিত। যেখানে বোর্ড গঠন করার ক্ষমতা এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর নিয়োগের ক্ষমতা অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথা সরকারের, সেখানে এসব ব্যাংক রেগুলেট করার ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের কতটুকু? শুধু কি অডিট করে রিপোর্ট দেওয়া? আর সেই রিপোর্ট তো বাংলাদেশ ব্যাংক দিয়েছেই। সতর্ক তো করেছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ শুনবে কেন? তারা ভালো করে জানে, তাদের চাকরি, প্রমোশন এবং কিভাবে ব্যাংক চলবে- তা সবই অর্থ মন্ত্রণালয় দেখে। তাহলে কোন রেগুলেটর বড়? অবশ্যই সোনালী, জনতা, অগ্রণী আর রূপালী ব্যাংকের ক্ষেত্রে রেগুলেটর হিসেবে অর্থ মন্ত্রণালয়ই এ সব ব্যাংকের প্রশাসকদের কাছে মুখ্য। বাংলাদেশ ব্যাংক কেবল সতর্ক এবং অনুরোধ করতে পারে। সেটাই সত্য। অথচ মোট ব্যাংকিং বাজারের এখনো ২৫ শতাংশ এই চারটি ব্যাংকের অধীন। তাহলে কেলেঙ্কারির দায় কার? প্রশ্নটার উত্তর নিজে দিলাম না। শুধু একটি কথাই বলব, কোনো দেশেই দ্বৈত রেগুলেশন ভালো ফল দেয়নি। সরকার জনগণের করের টাকা নিয়ে এসব ব্যাংকের ইক্যুইটি বা পুঁজির জোগান দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, এই পুঁজির বদলে সরকার কি পরিমাণ মুনাফা পাচ্ছে? বাসেল-২ অনুযায়ী ইক্যুইটি জোগান দিতে হলে এই চারটি ব্যাংককে আরো হাজার হাজার কোটি টাকা পুঁজি হিসেবে দিতে হবে। যেখানে এসব ব্যাংক থেকে সরকারের আয় প্রায় শূন্য, সেখানে এই অর্থ সরকার দেবে কেন? ভালো হতো শেয়ারবাজারের মাধ্যমে এসব ব্যাংকের মেজরিটি শেয়ার অফলোড করে দেওয়া। সে কাজটি করার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোনো আগ্রহ নেই। তাহলে এমডি আর পরিচালনা পর্ষদ নিয়োগ দিতে ক্ষমতাগুলো কেন আজও মন্ত্রণালয়ে রাখার জন্য এত আগ্রহ? আর সে জন্যই কেলেঙ্কারির ক্ষেত্রে দায়টা বাংলাদেশ ব্যাংকের আগেই সরকারকে নিতে হবে। আজকে যদি কোনো প্রাইভেট বাণিজ্যিক ব্যাংকে লোপাটের এত বড় ঘটনা ঘটত, তাহলে অবস্থাটা কি দাঁড়াত? এত দিনে সেই ব্যাংক বন্ধ হয়ে যেত। পরিচালকরা সবাই জেলে যেত এবং জনগণ বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যর্থতার জন্য রাস্তায় নেমে আসত। অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের কথা অনুযায়ী সোনালী ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক অপরিপক্বতার পরিচয় দিলে সেই অপরিপক্বতার জন্য তো সরকারও দায়ী। তবে ক্ষমতাটা পূর্ণাঙ্গ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে দায়ী করার পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা করলে আমরা খুশি হতাম। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাজ নয় ব্যাংক চালানো। এ ক্ষেত্রে দ্বৈত রেগুলেশনের যত তাড়াতাড়ি অবসান হয়, তত তাড়াতাড়িই আমাদের অর্থনীতি উপকৃত হবে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

No comments

Powered by Blogger.