নিত্যজাতম্-রাজনৈতিক দল ও ভূত সমাচার by মহসীন হাবিব

দুই যুগেরও বেশি সময় আগে বাংলাদেশে একটি ছায়াছবি সিনেমা হলগুলোতে প্রদর্শিত হতো। ইবনে মিজান পরিচালিত ছবিটির নাম ছিল 'বাহাদুর'। ছবির একটি বিশেষ দৃশ্যের কথা মনে আছে। দুটি ভূত একটি নির্জন রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঝগড়া করছে।


একটি ভূতের আছে এক জোড়া জুতা, অন্য ভূতের আছে একটি চাদর। জুতা জোড়ার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, সেটি পায়ে দিয়ে ইচ্ছামতো যেখানে খুশি উড়ে যাওয়া যায়। আর চাদরের বৈশিষ্ট্য হলো, সেটি গায়ে চড়ালে অদৃশ্য হওয়া যায়। দুটি ভূতই দাবি করছে নিজেরটা বেশি শক্তিশালী বা কার্যকর। ওরা কেউ কারো কথা মানছে না। যখন কোনোক্রমেই সমঝোতায় পৌঁছানো যাচ্ছে না (তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিতর্কের মতো) তখন দেখা গেল রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছে একজন মানুষ (টেলি সামাদ)। ওরা সিদ্ধান্ত নিল, এই লোকটার কাছে বিচার দেওয়া যাক। এই পথচারী যারটা শক্তিশালী বলবে, তারটাই বেশি শক্তিশালী বলে ধরে নেওয়া হবে। টেলি সামাদ ছিলেন দুশ্চিন্তায়। তার বস নায়ককে রাজপ্রাসাদে আটকে রেখেছে খলনায়ক রাজা। নির্জন রাস্তায় হঠাৎ দুই ভূত লাফ দিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত টেলি সামাদের সামনে এসে দাঁড়াল। তারা জানতে চায় চাদর আর জুতার কোনটা বেশি শক্তিশালী। টেলি সামাদের মাথায় সহজ বুদ্ধি এলো। তিনি বললেন, দেখি তোমাদের চাদর আর জুতা পরীক্ষা করে। ভূত দুটো ওই বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন চাদর আর জুতা তাঁর কাছে দিতেই তিনি চাদরের ক্ষমতায় অদৃশ্য হয়ে এবং জুতার ক্ষমতায় উড়ে চলে গেলেন রাজপ্রাসাদে। রাস্তার ধারে জঙ্গলের পাশে ভূত দুটো বসে রইল। কিন্ত তিনি আর ফিরলেন না।
খুব ছোটবেলায় দেখা এই ছবির ঘটনাটি আজও বারবার আমার কাছে শিক্ষণীয় হয়ে ধরা দেয় বাংলাদেশে, বিশেষ করে দেশের রাজনীতিতে। বড় দুটো রাজনৈতিক দল অভ্যন্তরীণ সব বিষয়কে চাদর আর জুতা বানিয়ে শক্তিশালী দেশগুলোর হাতে তুলে দেওয়ার জন্য যেন মরিয়া হয়ে উঠছে। তারা ধরেই নিয়েছে যে নিজেদের সমস্যা বা প্রয়োজন নিজেদের মেটানোর কোনো সুযোগই নেই; তারা ধরেই নিয়েছে যে দল ও ক্ষমতার ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ জনগণের হাতে নয়, বাইরে। কী রকম দরিদ্র মানসিকতা রাজনৈতিক দলগুলো আমাদের কালচারে ঢুকিয়ে দিচ্ছে, তা চোখ খুলে দেখলে হতাশায় ডুবে যেতে হয়। বিশেষ করে প্রধান রাজনৈতিক দল দুটো ভালো-মন্দ যেকোনো ব্যাপারে বিদেশিদের আগ্রহ না দেখলে যেন মজা পায় না। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান চিৎকার করে প্রতিবাদ জানান, বিচার চান, অশ্রু বর্ষণ করেন। কিন্তু না সরকার গায়ে মাখে, না বিরোধী দল আমলে নেয় বা তাঁকে অনুসরণ করে! একজন সাধারণ কারা কর্মকর্তার নির্দেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানকে কারাগার পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়া হয় না। একজন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর কথারও মূল্য যেন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ে বেশি! অথচ বিশ্বব্যাংকের সাবেক আঞ্চলিক পরিচালক পিটার আইগেনের হাতে প্রতিষ্ঠিত বার্লিনভিত্তিক এনজিও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ শাখা কাশি দিলে আওয়ামী লীগ-বিএনপি পিঠ সোজা করে বসে। 'সবে বলে আমি আমি, আমি কে তা কেউ না জানে'- জানে টিআইবি! দুর্নীতির কারণেই চরিত্র দুর্বল হয়। আর সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই টিআইবি এমনকি সংসদ সদস্যদের প্যান্ট-শার্ট ধরে টানাটানি করছে। বাংলাদেশের খেটে খাওয়া কৃষক, মজুরসহ সাধারণ মানুষ নীরবে তাদের জনপ্রতিনিধিদের অসহায়ত্ব দেখছে।
রামুতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর মধ্যযুগীয় হামলার পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই চাদর-জুতা অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার ভয়াবহ প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই দোষারোপের চিরাচরিত খেলা শুরু হয়েছে। এখনো থেমে নেই। ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে কূটনৈতিকপাড়ায় বাংলাদেশের দুই রাজনৈতিক দল একে অন্যের বিরুদ্ধে আদাজল খেয়ে নালিশ করতে নেমেছে। জনগণের সামনে কথায় কথায়, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে সার্বভৌমত্বের বুলি আউড়ানোর আচরণ কতটা গ্রহণ করার মতো? বিএনপি তো আরো এগিয়ে। রামুর ঘটনায় বিএনপি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে সেটা আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দিয়েছে কূটনৈতিকপাড়ায়!
প্রাসঙ্গিক একটি কথা বলতে হয়। রামুসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় দেখা যায় চরমভাবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ প্রশাসনের ব্যক্তিদের শাস্তি হিসেবে বদলি, প্রত্যাহার বা ক্লোজ করা হয়ে থাকে। জনগণের সঙ্গে প্রতারণার একটি সীমা থাকা উচিত। এই প্রত্যাহার, ক্লোজ ধরনের ব্যবস্থা জনগণের ওপর নির্যাতনের শামিল বলে আমরা মনে করি। পুলিশ সুপার সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর ও ওসি যে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছেন, তার শাস্তি কি শুধু বদলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? বলা হচ্ছে, ওসি নজিবুল ইসলামকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এই প্রত্যাহার কী? শুনলে মনে হয়, কত বড় শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে! বাংলাদেশের সার্ভিস রুল, পিআরবি, কোথাও এই প্রত্যাহার বলতে কোনো নির্দেশনা নেই। এটি হলো শুধু বদলি। মুখে বলা হয় প্রত্যাহার। কয়েকদিন আগে সিলেটের একটি থানার একজন কর্মকর্তাকে বিশেষ অপরাধে জড়িত থাকার কারণে পুলিশ প্রশাসন তাকে 'প্রত্যাহার' করে নিয়ে গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক পদে নিয়োগ দিয়েছে। এটি ঠিক সেই গল্পের পুনরাবৃত্তি। এক বুড়ি নদীর পাড়ে বসে ভাবছে, কী করে ওপার যাবে, ঘাটে কোনো নৌকা নেই। একজন এসে বুড়িকে বলল, এই বুড়ি! তোকে লাত্থি দিয়ে ওপার পাঠিয়ে দেব! বুড়ি তার দিকে ফিরে বলল, আমি তো ওপারই যেতে চাই বাবা! সরকার ও প্রশাসন জনগণকে কী মনে করে! এত বোকা এ দেশের মানুষ! সরকার ও সরকারের অধীন প্রশাসনের আইওয়াশ পদ্ধতিও এত স্থূল যে প্রায়ই হতাশ হতে হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর স্বাধীন শিক্ষা প্রবন্ধে লিখেছিলেন, 'সকল পাঠশালার অধিকাংশ ব্যয় দেশের লোক বহন করে; কেবল তাহার উপর আর সামান্য দু-চার আনার লোভে এই আমাদের নিতান্তই দেশীয় ব্যবস্থা পরের হাতে আপনাকে বিকাইয়াছে।' পদ্মা সেতু নিয়ে দেশকে সরকার যে নাঙা করে ছাড়ল, তা দেখে রবীন্দ্রনাথের এই কথাই বারবার মনে আসা স্বাভাবিক। একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন দুর্নীতি দমন সংস্থার পেটের নাড়িভুড়ি পর্যন্ত বেছে দেখছে বিশ্বব্যাংকের মতো একটি বেনিয়া প্রতিষ্ঠান। সরকারকে রীতিমতো নাকে খত দিতে বাধ্য করেছে। এটি সংবিধানের লঙ্ঘন নয়? জাতি হিসেবে একটি জাতির আত্মসম্মানবোধ থাকতে হয়। সম্ভ্রম থাকতে হয়। জাতির প্রতিনিধিদের মনোবল দৃঢ় থাকলে তাঁরা বলতে পারতেন, প্রয়োজনে কাঠের নৌকায় চড়েই পদ্মা পার হব, তাও এ ধরনের শর্তের কাছে মাথা বিক্রি করব না। জনগণ দেশের প্রশ্নে এত আবেগপ্রবণ যে শত কষ্ট বুকে নিয়েও সরকারের এমন কথায় বুক স্ফীত করে ফেলত। কিন্তু তা বলার উপায় নেই। যে দেশে ১২-১৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে, যে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১২ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে (যদিও তা ধনী দেশগুলোর তুলনায় সামান্যই) তাকে মাত্র ১.২ বিলিয়ন ডলারের জন্য এভাবে মাথা নোয়াতে হয়? হয়। এ দুর্বলতা বাংলাদেশের জনগণের নয়, রাজনীতিবিদদের। দুর্বলতা কোথায় সে সম্পর্কে দেশের আপামর জনতার একটি সাদামাটা ধারণা আছে। প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা কেউ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে, কেউ সম্মেলনে যোগ দিতে, কেউ উৎসব পালনের নামে বিভিন্ন দেশ সফর করছেন। তা করুন। কিন্তু একটি কথা তাঁদের ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে দেশের মানুষ তাঁদের সফরের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল।
দরিদ্র এই দেশের ভাগ্যের উন্নয়নে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন গার্মেন্টের লাখ লাখ মেয়ে; স্ত্রী, মা-বোন ফেলে রেখে বিদেশের মাটিতে হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে টাকা পাঠানো শ্রমিকরা- এ দেশের রাজনীতিবিদরা নন। এই মানুষগুলো কোনো তাঁবেদার রাষ্ট্রে বসবাস করতে চায় না, একটি স্বাধীন, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন দেশের নাগরিক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই সচেতনতা রাজনীতিবিদদের মধ্যে নতুন করে সৃষ্টি হওয়া এখন খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।
লেখক : সাংবাদিক
mohshinhabib@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.