শিক্ষা-গ্রেডিং পদ্ধতির বৈষম্য by মো. লুৎফর রহমান

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের অধীন এমবিএ প্রোগ্রামে ভর্তি সম্পর্কিত একটি বিজ্ঞপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে আলোচ্য বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছি। বিজ্ঞপ্তিতে ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় নূ্যনতম যোগ্যতা


নির্ধারণের ক্ষেত্রে জিপিএ ৪ = ৩, জিপিএ ৩ = ২ এবং জিপিএ ২ = ১ পয়েন্ট মান ধরা হয়েছে। জিপিএ অর্থাৎ গ্রেড পয়েন্ট এভারেজ কিংবা সিজিপিএর মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক কোনো শিক্ষার্থীর মেধার চূড়ান্ত মান প্রকাশ করা হয়। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান/কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রকাশিত মেধার মানই মূলত সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর পরবর্তী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ, নিয়োগ প্রাপ্তি, পদোন্নতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে তার যোগ্যতা/উপযুক্ততা নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা রাখে। যথাযথভাবে মান নির্ণয়ের বিষয়টি একজন ছাত্রের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে গ্রেডিং পদ্ধতির ওপর অতীব গুরুত্ব দিয়ে একজন শিক্ষার্থীর মেধা ও যোগ্যতা বিচার করা হয় সে পদ্ধতিটি কি সমপর্যায়ের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অভিন্নভাবে প্রয়োগ করা হয়; তা বিবেচ্য।
আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অতি সম্প্রতি সনাতন বিভাগ/শ্রেণী পদ্ধতির পরিবর্তে গ্রেডিং (লেটার গ্রেডিং) পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছে। সনাতন পদ্ধতিতে সাধারণত ৩৩%, ৪৫% এবং ৬০% নম্বর পেলে যথাক্রমে তৃতীয়, দ্বিতীয় এবং প্রথম বিভাগ/শ্রেণী ধরা হয়। বর্তমানে প্রচলিত গ্রেডিং পদ্ধতিতে প্রাপ্ত নম্বর লেটার গ্রেডিং যেমন : 'এ', 'বি', 'সি' ইত্যাদি আকারে রূপান্তরপূর্বক শিক্ষার্থীর মেধার মান নির্ধারণ করা হচ্ছে। কিন্তু প্রাপ্ত নম্বরকে লেটার গ্রেডিং আকারে রূপান্তরের ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে একই নিয়ম অনুসরণ করা হচ্ছে না। 'এ+' গ্রেডের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গ্রেড মান ধরা হয় ৪.০০; কিন্তু শিক্ষা বোর্ডগুলোতে ধরা হয় ৫.০০। আরও দেখা যায়, কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ৪০-৪৪% নম্বর প্রাপ্তদের 'ডি' গ্রেড (গ্রেড মান ২.০০ ধরে) প্রদান করে; আবার অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় ৬০-৬৬% প্রাপ্তদেরও 'ডি' গ্রেড প্রদান করে এবং যার গ্রেড মান ধরা হয় ১.০০। অপরদিকে শিক্ষা বোর্ডগুলোতে ৩৩-৩৯% নম্বর প্রাপ্তদের 'ডি' গ্রেড (গ্রেড মান ১.০০ ধরে) প্রদান করা হয়। অথচ উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো এবং বিভিন্ন নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ ওই গ্রেডিংকে একই বা সমমানের বিবেচনা করে থাকে।
বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক অনুসৃত গ্রেডিং পদ্ধতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ৭৫% নম্বর প্রাপ্তদের 'এ' গ্রেড দিচ্ছে; যার গ্রেড পয়েন্ট হচ্ছে ৩.৭৫। অপরদিকে অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ৮২% নম্বর প্রাপ্তদের দিচ্ছে 'বি_'গ্রেড; যার গ্রেড পয়েন্ট হচ্ছে ২.৭০। উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সর্বোচ্চ গ্রেড মান হচ্ছে ৪ (এ+); কিন্তু সাধারণ ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডগুলোতে হচ্ছে ৫ (এ+)। আবার টেকনিক্যাল শিক্ষা বোর্ডে সার্টিফিকেট এবং ডিপ্লোমা কোর্সের জন্য আলাদা আলাদা মানের গ্রেডিং পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। গ্রেডিং পদ্ধতির ওপর তুলনামূলক বিস্তারিত আলোচনা করলে এ ধরনের আরও অনেক অসামঞ্জস্য দেখা যাবে।
দেশের কয়েকটি পরিচিত সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে 'ক', 'খ' এবং 'গ' এই তিনটি গ্রুপে বিভক্ত করে আলোচ্য বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করা যায়। যেমন :'ক' গ্রুপে ৩টি বিশ্ববিদ্যালয় (বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আহছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়); 'খ' গ্রুপে ৩টি বিশ্ববিদ্যালয় (নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি) এবং 'গ' গ্রুপে ৩টি বিশ্ববিদ্যালয় (স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি এবং মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি)। উপরোক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রাতিষ্ঠানিক ও পাঠদান মান এবং কোনো একটি প্রোগ্রামে (উদাহরণস্বরূপ_ বিএসসি ইন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং) ভর্তিকৃত ছাত্রদের মেধার মান বিশ্লেষণ করলে এটা নিদ্বর্িধায় বলা যেতে পারে যে_
১. শিক্ষার পরিবেশ, উপকরণাদি, সুযোগ-সুবিধা, পাঠদান এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি অর্থাৎ সার্বিক ভৌত ও একাডেমিক অবকাঠামোগত বিবেচনায় 'ক' গ্রুপে উলি্লখিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান কোনোক্রমেই 'খ' গ্রুপে উলি্লখিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তুলনায় নিম্নতর হওয়ার কথা নয়; ২. ভর্তিকৃত ছাত্রদের মেধা বিবেচনায় 'ক' এবং 'খ' গ্রুপে বর্ণিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রদের মান মোটামুটি একই রকমের। উপরন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে 'খ' গ্রুপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধিকতর মেধাসম্পন্ন ছাত্ররাও ভর্তি হতে আগ্রহী হয়; ৩. প্রাতিষ্ঠানিক ও ভৌত অবস্থান, শিক্ষার উপকরণাদির প্রাপ্যতা, শিক্ষক ও পাঠদানের সুযোগ-সুবিধা এবং ভর্তিকৃত ছাত্রদের মেধা বিবেচনায় 'খ' গ্রুপে উলি্লখিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান 'গ' গ্রুপের তুলনায় নিম্নতর হওয়ার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই।
এতদসত্ত্বেও পরীক্ষার ফলের তুলনামূলক পর্যালোচনায় দেখা যাবে যে, 'ক' এবং 'গ' গ্রুপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্ররা নূ্যনপক্ষে ৮০% নম্বর পেলেই 'এ+' গ্রেড পাচ্ছে; যার মান হচ্ছে ৪.০০। অপরদিকে একই নম্বর পেয়ে 'খ'গ্রুপে উলি্লখিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোনোটির ছাত্ররা 'বি_' গ্রেড (মান ২.৭০), কোনোটির ছাত্ররা 'বি' গ্রেড (মান ৩.০০), আবার কোনোটির ছাত্ররা 'বি+' গ্রেড (মান ৩.৩০) পাচ্ছে। ফলে কেবল পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশনার পদ্ধতিগত কারণের ভিন্নতার জন্য 'খ' গ্রুপে বর্ণিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্ররা 'ক' এবং 'গ' গ্রুপে বর্ণিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রদের তুলনায় নিম্ন মেধাসম্পন্ন বলে স্বীকৃতি লাভ করে। এটা কোনো যুক্তিতেই কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না। গ্রেডিং পদ্ধতিতে ফল প্রকাশনায় এ বৈষম্যের কারণে ভালোমানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করেও মেধাসম্পন্ন ছাত্ররা বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনসহ অন্যান্য নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গৃহীত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় পিছিয়ে পড়তে, এমনকি অনেক সময় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হতে পারে। তাছাড়া বিদেশি যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা কর্তৃক উচ্চতর শিক্ষা কার্যক্রমে ভর্তি, আর্থিক অনুদান বা বৃত্তি প্রদান ইত্যাদি ক্ষেত্রে গ্রেড মানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়; সেসব ক্ষেত্রেও একই কারণের জন্য অপেক্ষাকৃত নিম্ন গ্রেড মান প্রাপ্ত মেধাসম্পন্ন ছাত্রদের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। এ ধরনের বৈষম্যমূলক গ্রেডিং পদ্ধতির অবসান হওয়া বাঞ্ছনীয়।
শিক্ষার্থীদের সার্বিক কল্যাণের কথা বিবেচনা করে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অভিন্ন গ্রেডিং পদ্ধতি প্রবর্তন করা সমীচীন বলেই প্রতীয়মান হয়। এ বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদনকারী এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের গ্রেডিং পদ্ধতি প্রবর্তনের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন। এ প্রসঙ্গে কেউ কেউ হয়তো বিদেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রচলিত বিভিন্ন পদ্ধতির উল্লেখ করতেও পারেন। তবে সে ক্ষেত্রে বিদেশের অর্থাৎ উন্নত দেশে প্রচলিত বিভিন্ন উপাদান/নিয়ামক সম্পর্কেও আরও অনেক কিছুই বিবেচনা করার প্রয়োজন; যেমন : মূল্যায়ন প্রক্রিয়া ও তার স্বচ্ছতা, শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ, একাগ্রতা-নিষ্ঠা ও কর্ম-দক্ষতার ওপর আরোপিত গুরুত্ব, নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রদান সম্পর্কিত নীতিমালা অনুসরণ ইত্যাদি।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ২০০৬ সালে একটি একক নীতিমালা প্রণয়নপূর্বক বাস্তবায়নের জন্য সব সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেরণ করে। তা সর্বক্ষেত্রে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। তবে সার্বিক বিষয়টিকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দিয়ে গ্রেড পদ্ধতির বর্তমান বৈষম্য দূরীকরণের জন্য সরকারি তরফ থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে তা কার্যকর হবে।

মো. লুৎফর রহমান : বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক কর্মকর্তা
 

No comments

Powered by Blogger.