ধর্ম বলতে মানুষ বুঝবে মানুষ শুধু by প্রভাষ আমিন

রামুতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর হামলার পর থেকে এক ধরনের মানসিক বৈকল্যে ভুগছি। অবিশ্বাসে আমার অনুভূতি ভোঁতা হয়ে গিয়েছিল। চারপাশে সব কিছু অচেনা মনে হচ্ছিল। এই কী আমাদের বাংলাদেশ! অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ভিত্তি করে যে দেশ স্বাধীন হয়েছে, সেই দেশে এমন সাম্প্রদায়িক হামলা কিভাবে হতে পারে,


সেটা আমার বিশ্বাসই হতে চায় না। লজ্জিত, ব্যথিত, অপমানিত, দুঃখিত, ক্ষুব্ধ, আতঙ্কিত- কোনো শব্দেই পুরো উপলব্ধিটা ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। একজন মানুষ হিসেবে আমার অবস্থানটাই নড়বড়ে করে দিয়েছে রামু এবং পরে উখিয়া ও পটিয়ায় হামলার ঘটনা। ধর্ম মানুষকে আরো মানবিক করে, কিন্তু ধর্মের নামেই এমন নৃশংসতা কিভাবে সম্ভব? আমার ধারণা, ধর্মের নামে এমন অধর্ম দেখলে ধর্মের প্রচারকরাও লজ্জা পেতেন। ইসলাম শব্দের অর্থই শান্তি। ইসলাম বলে শান্তির কথা, সাম্যের কথা। সেই শান্তি, সাম্য শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, জগতের সব মানুষের জন্য। হিন্দুদের দেবী দুর্গা মর্ত্যে আসেন দুর্গতি নাশ করতে, অসুর বধ করতে- সব মানুষের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে। অহিংসাই বৌদ্ধ ধর্মের মূলমন্ত্র। জগতের সব প্রাণী সুখী হোক- এই হলো বৌদ্ধদের স্লোগান। যিশুখ্রিস্ট ক্রুশবিদ্ধ হয়েছেন মানুষের জন্য। সব ধর্মেই ধর্মকে নয়, মানুষকেই সবার ওপরে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে। বাউল বলেন, আর সুফী বলেন, যুগে যুগে সবাই মানব জনমকেই সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছেন। সেই ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার নামে, ধর্মকেই তো অপবিত্র করছি আমরা প্রতিদিন।
রামুর ঘটনার পর লজ্জা, অপমান, ব্যথা, ক্ষোভ, দুঃখ ছাপিয়ে আতঙ্কটাই আমাকে বেশি গ্রাস করেছে। আতঙ্কের কারণ, কক্সবাজারে এমন কয়েক হাজার দানব আছে, যারা ধর্মের নামে নিরীহ বৌদ্ধদের ওপর হামলা চালাতে পারে। আতঙ্ক আরো বেড়েছে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়ায়। কোনো রকম তদন্ত ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে আওয়ামী লীগ নেতারা বলে দিলেন, এ ঘটনার জন্য বিএনপি-জামায়াত দায়ী। আবার বিএনপিও বলে দিল, এ ঘটনা আওয়ামী লীগ ঘটিয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর আর প্রাথমিক তদন্তে এটা প্রমাণিত হয়েছে, এ ঘটনার সঙ্গে বিএনপি-জামায়াত যেমন জড়িত, তেমনি প্রাথমিক পর্যায়ে উত্তেজনা ছড়িয়েছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারাও। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আশ্রয়ে থাকলেও আসলে এরা আওয়ামী লীগ নয়, বিএনপি নয়, জামায়াত নয়। এরা মানবতার শত্রু, রাজনীতির শত্রু, ধর্মের শত্রু। আমার আতঙ্ক রাজনীতিবিদদের পাল্টাপাল্টি দোষারোপের পুরনো খেলায় এই দানবদের কেউ পার পেয়ে যাবে না তো! যদি এরা পার পেয়ে যায়, তবে তো তারা পরের বার দ্বিগুণ উৎসাহে হামলা চালাতে পারে। এমন দানবদের মুক্ত রেখে তো কোনো সভ্যতা এগোতে পারে না। আতঙ্ক আরো বেড়েছে, কারণ হামলার ধরন দেখে মনে হয়েছে এটা তাৎক্ষণিক উত্তেজনার ফসল নয়। কোনো একটি মহল আড়ালে কলকাঠি নেড়েছে। ভয়ঙ্কর সেই মাস্টারমাইন্ড পেট্রল জোগাড় করেছে, গানপাউডার জোগাড় করেছে, ককটেল বানিয়ে রেখেছে, সিমেন্টের ব্লক বানিয়েছে, বাস-ট্রাক ভাড়া করেছে। তারপর উত্তম বড়ুয়া নামের একজন নিরীহ বৌদ্ধের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি ছবি ট্যাগ করে দিয়ে মানুষকে উত্তেজিত করেছে। আমার আতঙ্ক চরম রূপ পায়, যখন দেখি প্রশাসনের রহস্যজনক নির্লিপ্ততায় রাতভর তাণ্ডব চালানো যায়। একই ধরনের ঘটনা ঘটে পর দিনই। তাহলে আমরা কোথায় যাব?
কেউ কেউ এ ঘটনাকে বৌদ্ধদের ওপর মুসলমানদের হামলা হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইছেন। প্লিজ কেউ এ হামলাকে ধর্মীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ করবেন না। এটা মানবের ওপর দানবের হামলা। এর সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। যারা হামলা চালিয়েছে, অবশ্যই তারা মুসলমান নয়, তারা স্রেফ হামলাকারী অমানুষ। ইসলাম ধর্ম এত ঠুনকো নয় যে ফেসবুকে ট্যাগ করা একটি ছবিতে তা অপবিত্র হয়ে যাবে। এ হামলার পর বৌদ্ধদের বিভিন্ন সংগঠন হামলার বিচার দাবিতে নানা কর্মসূচি পালন করছে। এটা দেখে আমার লজ্জা আরো বেড়েছে। তারা কেন বিচার চাইবে, তারা কেন কাঁদবে, তারা কেন মন খারাপ করে গৌতম বুদ্ধের মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে? লজ্জা তো তাদের নয়, লজ্জা হওয়া উচিত হামলাকারীদের। যেহেতু ইসলামের নামে হামলা হয়েছে, মুসলমান বাবার সন্তান হিসেবে এ লজ্জা আমার। যেহেতু বাংলাদেশের মানুষ হামলা করেছে, এ দায় আমাদের সবার, গোটা বাংলাদেশের। ধ্বংস হয়ে যাওয়া বুদ্ধের মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে একজন বৌদ্ধভিক্ষুর যতটা কষ্ট, আমার কষ্ট তার চেয়ে অনেক বেশি। তার তো শুধু আক্রান্ত হওয়ার কষ্ট। আমার কষ্ট চোখের সামনে সভ্যতা ধ্বংস হতে দেখার কষ্ট; আমার লজ্জা, আমিও আক্রমণকারীদের গোত্রের একজন। আমি হাত জোড় করে ক্ষমা চাইছি, আমাদের বৌদ্ধ ভাইদের প্রতি, প্লিজ আপনারা আমাদের ক্ষমা করে দিন, নইলে এ গ্লানি কিছুতেই ঘুচবে না, মানুষ হিসেবে আমরা নত মাথা কোনো দিন তুলে দাঁড়াতে পারব না। আমি জানি, ক্ষমা করা অত সহজ নয়। একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদাররা বৌদ্ধদের ওপর আক্রমণ করেনি। একাত্তরে মুসলমানরা আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য বৌদ্ধদের ঘরে আশ্রয় নিয়েছে। আমরা কেমন বোকা, কেমন অকৃতজ্ঞ যে নিজেদের আশ্রয়স্থলে হামলা চালিয়েছি!
হামলার পর প্রধানমন্ত্রী রামুতে গিয়ে আশ্বাস দিয়েছেন যা ধ্বংস করা হয়েছে, তা পুনর্নির্মাণ করে দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। ভবন হয়তো নির্মাণ করে দেওয়া যাবে, হয়তো আরো সুন্দর করেই করা যাবে। কিন্তু হাজার বছরের যে সভ্যতা আমরা ধ্বংস করেছি, অমূল্য সব পুঁথি পুড়িয়ে দিয়েছি, তা কোত্থেকে ফিরে পাব? তার চেয়েও বড় ক্ষতি হয়েছে বৌদ্ধদের হৃদয়ে। তাদের মধ্যে যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, তা কিভাবে পূরণ করা সম্ভব? আমার বৌদ্ধ ভাই যদি সেদিন থেকে বাংলাদেশকে তাঁর দেশ মনে না করেন, তিনি যদি আমাকে আর তাঁর ভাই মনে না করেন, আমি কী তাঁকে দোষ দিতে পারব? কিন্তু আমি আবারও আমার অন্তর থেকে ক্ষমা চেয়ে বলছি, সেদিন রামুতে যা ঘটেছে, তা বাংলাদেশ নয়, সেটা ইসলাম নয়, সেটা আমি নই। এই দেশ আমার-আপনার সবার। এই বাংলাদেশে মুসলমানের অধিকার যতটুকু, ঠিক ততটুকুই হিন্দুর, ততটুকুই বৌদ্ধের, ততটুকুই খ্রিস্টানের, আদিবাসীদের অধিকারও একচুল কম নয়।
মানুষ হিসেবে এ অপরাধবোধ থেকে, লজ্জা থেকে, গ্লানি থেকে মুক্তির চমৎকার একটি সুযোগ এসেছে আমাদের সামনে। দুর্গতি নাশ করতে মর্ত্যে এসেছেন দেবী দুর্গা। সারা দেশ মেতেছে দুর্গোৎসবে। মণ্ডপে মণ্ডপে উৎসবের আমেজ। আবার মোড়ে মোড়ে গরু-ছাগলের হাট জানান দিচ্ছে আসছে মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা। বিসর্জনের এক দিন পরের এই ঈদ আমাদের ত্যাগের শিক্ষা দেয়। ঈদুল আজহার দুদিন পর বৌদ্ধদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা। ধর্ম যার যার, উৎসব সবার- এই হলো আমাদের চেতনা, জাতি হিসেবে আমাদের শক্তি। আমরা মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে ঘুরে হিন্দু ভাইদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঢোলের তালে নাচতে চাই। ঈদের নামাজ শেষে বৌদ্ধ ভাইয়ের সঙ্গে বুক মেলাতে চাই। প্রবারণা পূর্ণিমায় হিন্দু ভাই আর বৌদ্ধ বন্ধুর সঙ্গে মিলে ফানুস ওড়াতে চাই। অল্প কয়েকজন দানবের জন্য আমাদের হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধ্বংস হতে পারে না। রামুর ঘটনার প্রতিবাদে বৌদ্ধ সম্প্রদায় এবার প্রবারণা পূর্ণিমায় ফানুস ওড়াবে না, উৎসব করবে না, কালো ব্যাজ ধারণ করবে। প্লিজ এমনটি করবেন না। আপনারা অভিমান করলে আমরা কষ্ট পাব, সুখী হব না। আপনারা তো চান জগতের সব প্রাণী সুখী হোক। প্লিজ আমাদের প্রায়শ্চিত্তের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করবেন না। আমার বিশ্বাস, এই তিন উৎসবকে ঘিরে ঘুরে দাঁড়াবেই বাংলাদেশ। চমৎকার এই সুযোগ যেন আমরা হেলায় না হারাই।
লেখাটি শেষ করতে চাই আমার একটি প্রিয় গানের কলি দিয়ে, সুমন চট্টোপাধ্যায়ের গান। 'আমি চাই বিজেপি নেতার সালমা খাতুন পুত্রবধূ; আমি চাই ধর্ম বলতে মানুষ বুঝবে মানুষ শুধু।'
লেখক : সাংবাদিক

No comments

Powered by Blogger.