ভিন্নমত-দরদি ডাক্তারের খোঁজে by আবু আহমেদ

আমাদের এক সিনিয়র অধ্যাপক, যাঁকে খান সাহেব ডাকি; তিনি কোনো এক বিখ্যাত হাসপাতালে বিকেলে রোগী হয়ে এক সিনিয়র হৃদরোগ বিশেষজ্ঞকে দেখাতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতার কথা বললেন, তাতে আমি শুধু দুঃখিতই হইনি, রীতিমতো হতবাকও হয়েছি। পরে আমাকে অন্য আরেক রোগী বললেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগীদের একই অবস্থা।


রোগী ডাক্তারের চিকিৎসা পেয়ে সন্তুষ্ট আছেন_এমন সংখ্যা খুবই কম। তিনি এও বললেন, কয়জন রোগী পুনরায় একই ডাক্তারকে দেখাতে যান, এটা পরীক্ষা করলেই বোঝা যাবে ডাক্তারের ওপর রোগী কতটা খুশি। অধ্যাপক খান নামাজ পড়ার পর হাঁটতে হাঁটতে বললেন, সেই সিনিয়র কার্ডিওলজিস্ট তাঁর দেহের ল্যাব টেস্টগুলো একটুও দেখতে চাইলেন না। অনেক অনুরোধের পর একনজর যা-ও দেখলেন, কিন্তু তার আগেই তিনি ওষুধ লিখে ফেললেন। এই অধ্যাপক খান আগ থেকেই দেহের বিরূপ চর্বি কমাতে এবং উচ্চ রক্তচাপের জন্য ওষুধ খাচ্ছিলেন। তিনি নাম শুনে যে সিনিয়র কার্ডিওলজিস্টের কাছে গেলেন, তিনি রিপোর্ট না দেখেই কোলেস্টেরলের ওষুধটা বদল করে অন্য ওষুধ খেতে দিলেন এবং খান সাহেবকে একটু বুঝিয়েও বললেন না, কেন ওষুধ বদল করা হলো এবং কেন নতুন ওষুধটা দেওয়া হলো। সর্বমোট পাঁচ মিনিটে রোগী দেখা শেষ এবং তিনি অতি মনঃক্ষুণ্ন হয়ে ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হয়ে এলেন। বের হয়ে তিনি ভাবলেন, এই ডাক্তারের বদলানো ওষুধটা খাবেন না। পরে তিনি অন্য ডাক্তারের সঙ্গে কনসাল্ট করে কোনটি খাবেন সিদ্ধান্ত নেবেন। বোঝা গেল, ডাক্তারের ওষুধে খান সাহেবের আস্থার অভাব প্রকটভাবে দেখা দিয়েছে।
আমাকে অন্য রোগী বললেন, এ অবস্থা সর্বত্র। অধ্যাপক খান মোটামুটি সুস্থ মানুষ। নিজের শারীরিক পরীক্ষা করাতে ব্যাংককে তিনি কিছুদিন আগে মেডিক্যাল ট্যুরে গিয়েছিলেন। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই ব্যাংককের একটি বিখ্যাত হাসপাতাল থেকে 'ঊীবপঁঃরাব পযববশ ঁঢ়' নামের প্যাকেজের অধীনে শরীরের অত্যাবশ্যকীয় ডাক্তারি পরীক্ষাগুলো করিয়ে এসেছিলেন।
ওইখানের ডাক্তার সাহেব তাঁকে কোনো ওষুধ দেননি। শুধু বলেছেন, যেমনি বলছি তেমনি চলুন। মনে হলে আপনাদের দেশে গিয়ে কোনো মেডিসিন বা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞকে দেখান। সে উপদেশমতোই খান সাহেব এক বিকেলে গিয়েছিলেন সেই বিখ্যাত হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞকে দেখাতে। কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা অতি তিক্ত। তিনি রুমে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার জানতে চাইলেন, কী অসুবিধা বলুন। আর খান সাহেব ব্যাগ থেকে ব্যাংককে করানো মেডিক্যাল রিপোর্টগুলো ডাক্তার সাহেবকে দেখাতে প্রস্তুত হওয়া মাত্র ডাক্তার সাহেব যেন কেমন বিরক্ত প্রকাশ করা শুরু করলেন। একনজর দেখলেন বটে, তবে ওষুধটা মুখের কথা শুনেই লেখা হয়ে গেছে।
এ তো গেল অধ্যাপক খানের কথা। ইসলাম সাহেব ডাক্তারের ওপর ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে এখন মধ্যম শ্রেণীর একজন দরদি ডাক্তার খুঁজছেন। ইসলাম সাহেব সরকারের একজন বড় কর্মকর্তা ছিলেন। সদ্য অবসরে গেছেন। তিনি যে কথা বললেন, তার সারমর্ম হলো এই, ডাক্তার অনেক আছেন, তবে সময় নিয়ে রোগী দেখার সময় তাঁদের নেই। তাঁরা ঘণ্টায় বা এক সন্ধ্যায় কত বেশি রোগী দেখতে পারেন_তা নিয়েই ব্যস্ত। তাঁর অন্য অভিযোগ হলো, ওষুধ খেয়ে রোগী কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত হলে ডাক্তারের সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করার উপায় নেই। একমাত্র উপায় হলো সেই কোনো এক হাসপাতালে, যেখানে ডাক্তার সাহেব সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিন বসবেন। এর মধ্যে রোগীর আরো ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, ওই ওষুধটা সেবন করার কারণে রোগীর ক্ষতি হয়েছে, সে কথাটাও ডাক্তার সাহেব রোগীকে বলবেন না। আমিনুল ইসলামের কথা শুনে আমিও একমত। কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আমরাও কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে। ইসলাম সাহেবের অন্য অভিযোগ হলো, অনেক ডাক্তার বেশি ওষুধ লেখেন। এর কারণ অনুসন্ধান করে তিনি জানলেন, বিভিন্ন কম্পানির মেডিক্যাল প্রতিনিধিরা সারাক্ষণ ডাক্তারদের পেছনে ঘুরঘুর করছেন। তাই অনেক ডাক্তার রোগীর সম্পর্কে ঠিকমতো না জেনে ওষুধ কম্পানির সম্পর্কেই বড় করে দেখেন। তবে এ অভিযোগ ঢালাও নয়। ব্যতিক্রম আছেন, তবে সে সংখ্যা কত_এ প্রশ্নও আছে। আমি ইসলাম সাহেবকে বললাম, সব সময় এটাও ঠিক নয়। অনেক ডাক্তার বেশি ওষুধ লেখেন তাঁর নিজস্ব বিদ্যা-বুদ্ধি থেকে। আমি এও বললাম, ডাক্তারদের মধ্যে আপনি প্রফেসর নূরুল ইসলামের মতো ডাক্তার, বিশেষজ্ঞ জন আছেন, যিনি একটি রোগের জন্য একটি ওষুধ দেন? আমাদের দেশে হাতে গোনা কয়েকজন ডাক্তার আছেন মাত্র, যাঁরা কম ওষুধ দিয়ে রোগীর চিকিৎসা করেন। ইসলাম সাহেব এখন পারতে সব ডাক্তারের কাছে যান না।
পরিবারের অন্য লোকদেরও সেই উপদেশ দেন। তাঁর কথা হলো, ডাক্তারের ফি আরো বেশি দিতে রাজি আছেন; তবে ডাক্তারকে রোগীর কথা অবশ্যই মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। যে ডাক্তারের কাছে শুধু আসা আর যাওয়া করতে হয় সে ডাক্তার যত উঁচু পদেরই হোন কেন তাঁর কাছে রোগী হিসেবে যেতে নারাজ। ইসলাম সাহেবের আরো কথা হলো, ডাক্তারের কথা শুনে রোগীকে অর্ধেক ভালো হয়ে যেতে হবে। যে ডাক্তার ভীতি ছড়ান সে ডাক্তারে কাছে রোগীর যাওয়া উচিত নয়। ইসলাম সাহেব একজন দরদি ডাক্তারের সন্ধানে আছেন। আমি শুধু বললাম, দরদি ডাক্তার পেলে আমাকেও যেন জানান। কারণ কম কথা শোনেন, বেশি ওষুধ দেন_এমন ডাক্তার আমারও অপছন্দ। অনেকেই হয়তো আমাদের সঙ্গে একমত পোষণ করবেন।
লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অর্থনীতিবিদ

No comments

Powered by Blogger.