মন্ত্রণালয় ও শাহজালাল বিমানবন্দরের তথ্য-৩ বছরে ৮ হাজার প্রবাসীর লাশ by শরিফুল হাসান

বিদেশে গিয়ে ভাগ্য ফেরাবেন— এমন আশায় সৌদি আরবে গিয়েছিলেন গাজীপুরের কালিয়াকৈরের আবদুস সাত্তার। তবে পরিবারের ভাগ্য বদলানোর আগেই হূদেরাগে আক্রান্ত হওয়ার পর লাশ হয়ে দেশে ফেরেন তিনি। ১৩ মে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাশ গ্রহণের সময় দুই ছেলেকে নিয়ে চিৎকার করে কাঁদছিলেন সাত্তারের স্ত্রী আয়েশা।


একই দিন সৌদি আরব থেকে লাশ হয়ে ফেরা কুমিল্লার তাজুল ইসলাম আর ওমানে নিহত আবদুল খালেকের মৃত্যুর কারণও বলা হচ্ছে হূদেরাগ। গত সোয়া তিন বছরে তাজুল, খালেক আর সাত্তারের মতো আট হাজারের বেশি প্রবাসীর লাশ এসেছে। তাঁদের বেশির ভাগের মৃত্যুর কারণ বলা হয়েছে হূদেরাগ। কোনো ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশগুলো দাফন করা হয়।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়; জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, ২০০৩ থেকে ২০১২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত নয় বছরে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে ১৫ হাজার ৭৫২ জন প্রবাসীর লাশ এসেছে। গত তিন বছরে এই সংখ্যা আট হাজার ১৩২। এই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে সাত থেকে আটজনের লাশ এসেছে।
বিএমইটির পরিচালক (কল্যাণ) মোহসিন চৌধুরী বলেন, ‘একজন মানুষ জমিজমা বিক্রি করে সর্বস্ব খুইয়ে বিদেশে যান। এরপর ওই মানুষ লাশ হয়ে ফিরে এলে পরিবারটি চরম দুরবস্থায় পড়ে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এমন কোনো দিন নেই, যেদিন বিমানবন্দরে আট থেকে ১০টি লাশ না আসে। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের অধিকাংশের বয়স ২৫ থেকে ৪০। এমন সম্ভাবনাময় মানুষগুলোর মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’
আবার বিদেশে মারা যাওয়া অনেক প্রবাসীর লাশ দেশে আসছে না। স্থানীয়ভাবেই সেগুলোর দাফন সম্পন্ন হচ্ছে। সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের ওয়েবসাইটে এ ব্যাপারে ২০০৮ ও ২০০৯ সালের তথ্য দেওয়া আছে। তাতে প্রতি মাসে গড়ে ৫০-৬০ জনের দাফনের কথা উল্লেখ রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বারবারই বলা হয়, বিদেশে বাংলাদেশের ৭০ থেকে ৭৫ লাখ শ্রমিক আছেন। কাজেই বছরে দুই থেকে আড়াই হাজার শ্রমিক মারা যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করছে, এমন সংগঠনগুলো মৃত্যুর এই হার নিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে, ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশগুলো দাফন করায় মৃত্যুর মূল কারণ অজানাই থেকে যাচ্ছে।
অভিবাসনবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) সমন্বয়ক অধ্যাপক সি আর আবরার প্রথম আলোকে বলেন, এত প্রবাসীর মৃত্যুকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখা উচিত হবে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মৃত্যুর কারণ বলা হয় হূদেরাগ। কিন্তু যথাযথ তদন্ত ছাড়া কেবল ধারণা করে হূদেরাগ বলে দেওয়া যৌক্তিক হতে পারে না। তিনি বিষয়টি তদন্ত করার দাবি জানান।
তবে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানসচিব জাফর আহমেদ খান বলেন, ‘বিদেশে আমাদের এক কোটির বেশি লোক থাকেন। কাজেই যে হারে লাশ আসছে, সেটিকে আমরা অস্বাভাবিক মনে করছি না। আর যে দেশে তাঁরা মারা যান, সেই দেশে প্রাথমিক তদন্ত হয়। তবে পরিবারের লোকজন অভিযোগ করলে আমরা ময়নাতদন্ত করে দেখতে পারি।’
লাশের সংখ্যা বাড়ছেই: সরকারের কাছে থাকা হিসাব অনুযায়ী, ২০০২ সাল পর্যন্ত লাশ এসেছে তিন হাজার ৬১৩ জনের। ২০০৩ সাল থেকে প্রতিবছরই এর সংখ্যা বাড়ছে। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালে ৯০৬, ২০০৪ সালে ৭৮৮, ২০০৫ সালে এক হাজার ২৪৮, ২০০৬ সালে এক হাজার ৪০২, ২০০৭ সালে এক হাজার ৬৭৩, ২০০৮ সালে দুই হাজার ৯৮, ২০০৯ সালে দুই হাজার ৩১৫, ২০১০ সালে দুই হাজার ৩০০ ও ২০১১ সালে ঢাকায় দুই হাজার ২৩৫ জন প্রবাসীর লাশ এসেছে। তা ছাড়া এ বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে আরও ৭৮৭ জনের লাশ এসেছে। গত বছর চট্টগ্রামে ৩০৫ জন ও সিলেটে ৭৮ জন প্রবাসীর লাশ এসেছে।
বেসরকারি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মাইগ্র্যান্টস (ইমা) রিসার্চ ফাউন্ডেশনের জাতীয় সমন্বয়ক আনিসুর রহমান খান বলেন, অধিকাংশ পরিবারই স্বজনদের এভাবে মৃত্যুকে স্বাভাবিক বা অসুস্থতাজনিত মৃত্যু বলে মানতে পারছে না। তাঁর মতে, ফিলিপাইনের মতো বাংলাদেশেও এসব লাশের পুনরায় ময়নাতদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
সৌদি আরব থেকে আসছে সবচেয়ে বেশি: ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বিদেশ থেকে ঢাকায় আসা সাত হাজার ৬৩৭টি লাশের মধ্যে দুই হাজার ৩৯৩টি এসেছে সৌদি আরব থেকে। এর মধ্যে ২০০৯ সালে সৌদি আরব থেকে ৭২৬, ২০১০ সালে ৭৩২ ও ২০১১ সালে ৬৮১টি লাশ এসেছে। আর চলতি বছরের চার মাসে সৌদি আরব থেকে এসেছে ২৫৪টি লাশ।
সৌদি আরব ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সোয়া তিন বছরে ৮৩৮ জনের, কুয়েত থেকে ৫০৬, ওমান থেকে ২৯৬, বাহরাইন থেকে ১৭৫ ও কাতার থেকে ১৬৫ জনের লাশ এসেছে।
সৌদি আরবের পর বাংলাদেশি শ্রমিকেরা সবচেয়ে বেশি মারা যাচ্ছেন মালয়েশিয়ায়। গত তিন বছরে দেশটিতে মারা গেছেন এক হাজার ২৯৮ জন বাংলাদেশি। এ ছাড়া সোয়া তিন বছরে ভারত থেকে ১৭৯ জন, পাকিস্তান থেকে ৫৪, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৮০, যুক্তরাজ্য থেকে ২১০, ইতালি থেকে ১৫৭, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ১৭৮, সিঙ্গাপুর থেকে ১৬৪ ও লেবানন থেকে ৭৪ জন প্রবাসী শ্রমিকের লাশ এসেছে।
মৃত্যুর কারণ হূদেরাগ!: প্রবাসীদের মৃত্যুর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কারণ বলা হয় হূদেরাগ। তবে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় কিংবা সরকারের কোনো দপ্তর ব্যাপারটি কখনো খতিয়ে দেখেনি।
ফরিদপুরের রেজাউল ইসলাম মারা গেছেন দুবাইয়ে। তাঁর স্ত্রী নাজমা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর স্বামীর বয়স ছিল ৩৪। তিনি বিশ্বাস করেন না যে তাঁর স্বামী হূদেরাগে মারা গেছেন।
৪০ বছরের মোহাম্মদ আলী হূদেরাগে মারা গেছেন সৌদি আরবে। তাঁর বাড়ি মেহেরপুরের গাংনী। তাঁর একমাত্র ছেলে ফারুক আলী উচ্চমাধ্যমিকে পড়ে। ফারুক বলে, ‘শুনেছি, বাবা নাকি ফজরের নামাজের পর স্ট্রোক করে মারা গেছেন। কিন্তু বাবার কোনো অসুখ ছিল না।’
মেহেরপুরের নজরুল ইসলাম, টাঙ্গাইলের হীরা আলী, কেরানীগঞ্জের আমির হোসেনসহ আরও অনেকেরই মৃত্যুর কারণ বলা হয় হূদেরাগ। কিন্তু তাঁদের স্বজনেরা তা মানতে চান না।
জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মিশনপ্রধান শরৎ দাস গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আমাদের অনুরোধ, যে দেশে বাংলাদেশের কর্মীরা কাজের খোঁজে যান, সেসব দেশের সঙ্গে যেন শ্রমিকস্বার্থ রক্ষার বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই করা হয়। এসব স্মারকে কর্মপরিবেশের উন্নতি ও পেশাগত প্রাণহানি রোধ নিশ্চিত করার ধারা যুক্ত থাকতে হবে।’
মৃত্যুর কারণ তদন্তের বিষয়টি সরকার কখনো ভেবেছে কি না, জানতে চাইলে বিএমইটির পরিচালক মোহসিন চৌধুরী সরাসরি এর জবাব না দিয়ে বলেন, অধিকাংশ সময়েই মৃত্যুর কারণ বলা হয় হূদেরাগ। আর অস্বাভাবিক কোনো মৃত্যু হলে ওই দেশ থেকে ময়নাতদন্ত করে পাঠানো হয়।
কেন এত মানুষ হূদেরাগে মারা যাচ্ছেন—জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকেরা যে পরিবেশে কাজ করেন এবং যে পরিবেশে থাকেন, তা মোটেও মানবিক নয়। শারীরিক চাপের সঙ্গে প্রবাসীদের কাছে বাড়তি চাপ—খরচের টাকা তোলা কিংবা দেশে টাকা পাঠানো। এসব চাপের মুখে অসুস্থ হয়ে পড়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে এমন মৃত্যু দুঃখজনক।

No comments

Powered by Blogger.