বাজেটে তথ্যপ্রযুক্তি-শুধু 'কথায় তো চিড়ে ভেজে না'

অনেকেই মনে করেন আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' গঠনের প্রস্তাব তরুণ প্রজন্মকে বিপুলভাবে আকৃষ্ট করেছিল। গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের প্রাক্কালে মানুষ আশা করেছিল দেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটি শুধু গণতন্ত্রকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে না, উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে নতুন ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে যাবে।


'ডিজিটাল বাংলাদেশ' স্লোগানের মধ্যে মানুষ সে আশাবাদ প্রতিফলিত হতে দেখেছিল। পরবর্তীকালে 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' গঠনের প্রত্যয় প্রত্যাশিত মাত্রায় বাস্তবায়িত হতে না দেখে অনেকেই হতাশ হয়েছেন। অতীতের সরকারগুলোর পশ্চাৎপদ মানসিকতার কারণে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা দূরের কথা, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশের অবস্থান সবার পেছনে। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও কম্পিউটার ব্যবহারে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম ও ষষ্ঠ। দেশে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান বা ইনস্টিটিউটের অভাব প্রকট। নতুন প্রজন্মের কাছে সহজ ও সুলভ কম্পিউটার ও ইন্টারনেট পেঁৗছানোর উদ্যোগও অপ্রতুল। আছে ইন্টারনেটের স্লথগতি, দুর্মূল্য। ইন্টারনেটের মাধ্যমে লেনদেনের ক্ষেত্রে নানা বাধাও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে উন্নয়নের ধারাকে ব্যাহত করছে পদে পদে। কল সেন্টারের জন্য পার্ক গঠনের প্রস্তাব, সফটওয়্যার বা আইটি পার্ক নির্মাণের দাবিও ছিল। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি নিয়ে জনমনে যথেষ্ট সংশয় আছে। পিছিয়ে থাকা পরিস্থিতি থেকে এগিয়ে যেতে যেখানে দরকার ছিল খুব দ্রুততম সময়ে বড় উদ্যোগ, সেখানে আগের মতোই স্লথগতির দেখাই মিলছে পদে পদে। সরকার মেয়াদের অর্ধেক পূর্ণ করলেও এ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তনের আলামত দেখা যাচ্ছে না। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে এ খাতের বরাদ্দ ও ব্যয় পরিকল্পনা দেখে তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট মানুষেরা হতাশা ব্যক্ত করেছেন। কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য উদ্যোগ এসেছে। ভূমি সংক্রান্ত তথ্য ডিজিটালাইজ করা, ইউনিয়নভিত্তিক তথ্যকেন্দ্র, কৃষিতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার নিয়ে কিছু উদ্যোগ এসেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কোন খাতে কত বরাদ্দ তা স্পষ্ট হয়নি। ইতিমধ্যে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার ওয়েবসাইটগুলোর উন্নয়ন করা হয়েছে। অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বেশকিছু সাইট এখনও উন্নত হয়নি। এর ফলে তথ্য পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নাগরিকরা। কাগজে-কলমে তথ্য থাকার কথা আছে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য মিলছে না বলেও অভিযোগ আসছে। মন্ত্রণালয়, অধিদফতর, সরকারি বিভিন্ন সংস্থার ওয়েবসাইট উন্নয়ন ও এতে প্রয়োজনীয় তথ্য সনি্নবেশ করা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। নাগরিকরা এগুলো থেকে সুফল পেতে পারে। এ কাজগুলোর অধিকাংশই উপরিতলের। অর্থবহ 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' গড়তে হলে এসব কাজের পাশাপাশি বুনিয়াদি কিছু উদ্যোগ আসা দরকার। এ জন্য গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত সুলভ মূল্যে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সার্ভিস পেঁৗছাতে হবে, কম্পিউটারের দাম মানুষের নাগালে আনতে হবে। স্কুল পর্যায় থেকে কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনামূল্যে ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবস্থা করতে হবে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রচুর আইটি ইনস্টিটিউট গড়ে তুলতে হবে। দেশের আইটি উদ্যোগগুলোর বিকাশে পার্ক গঠন করে দিতে হবে। দেশের এক্সপার্টরা যাতে সহজে আউটসোর্সিং করতে পারে সে জন্য ইন্টারনেটে লেনদেনকে উন্মুক্ত করতে হবে। ভারতের মতো দেশগুলো বিপুলসংখ্যক আইটি শিক্ষিত মানুষ তৈরি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। এক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতি সামান্য। বর্তমান সরকারের 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' গঠনের প্রত্যয়টি প্রশংসিত হয়েছে। সেটি যদি কথায় উল্লেখ করার জন্য গালভরা বুলি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে, সেটি হবে দুঃখজনক। কঠিন হলেও প্রতিশ্রুতিকে কাজে রূপান্তরিত করতে হবে। বাংলাদেশকে ডিজিটাল দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে উন্নয়ন ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে দেশটি এগিয়ে যাবে। তৈরি হবে অমিত সম্ভাবনা। ফলে এ বাজেট থেকেই সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে সরকারের এগিয়ে যাওয়া উচিত। প্রয়োজনে আইটি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে তাদের মত নিয়ে নীতিনির্ধারণ ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হোক।
 

No comments

Powered by Blogger.