অনশন-রঙ্গ by জামান সরদার

ভারতের নয়াদিলি্লর রামলীলা ময়দানে যোগগুরু স্বামী রামদেবের অনশন কর্মসূচি আহ্বান যেমন, তেমনই নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে শনিবার মধ্যরাতে সেটি সম্পন্ন কিংবা পণ্ড হয়েছে। ওই ময়দানটিতে স্বামীজির পক্ষে ২০ দিনের যোগশিবির পরিচালনার অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। সেটা নতুনও নয়।


যোগশিক্ষার জন্য স্বামী রামদেব ভারতের ভেতর-বাইরে বিখ্যাত। আত্মা ও দেহের রোগ সারাতে তিনি চালু করেছেন বিশেষ চিকিৎসা পদ্ধতি ও ওষুধ। ফলে ২০ দিনের যোগশিবির নিয়ে বিশেষ চিন্তা-ভাবনা ছিল না সরকারের। কিন্তু নির্ধারিত তারিখের কয়েক দিন আগে স্বামী রামদেব হঠাৎ ঘোষণা করেন, তিনি আসলে ভারতের বাইরে মজুদ কালো টাকা ফিরিয়ে আনার দাবিতে অনশন করতে যাচ্ছেন। জন লোকপাল বিল উত্থাপনের ব্যাপারে মহারাষ্ট্রের গান্ধীবাদী সমাজকর্মী আন্না হাজারের অনশন কর্মসূচির সাফল্যেই সম্ভবত স্বামী রামদেব এমন কর্মসূচির প্রতি আগ্রহী হন। কিন্তু আন্নার মতো একা নন, তিনি অন্যদেরও ডাক দেন তার সঙ্গে যোগ দিতে। ঘোষণা দেন, ভারতের ছয় শতাধিক জেলায় তার অনুসারীরা যেন একই সময়ে অনশনে বসে।
সরকার আন্না হাজারের দাবি মেনে নিয়ে গেজেট নোটিফিকেশন করেছিল। ফলে এপ্রিলের ৫ তারিখে সূচিত অনশন কর্মসূচি ৯ এপ্রিল পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছিল। স্বামী রামদেবের দাবিকেও গুরুত্ব দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার প্রথম থেকে ওই অনশন কর্মসূচি প্রত্যাহার করানোর চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। ২৮ মে কালো টাকা পাচার নিয়ন্ত্রণে সরকার একটি প্যানেলও গঠন করে। পরে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং স্বামী রামদেবকে অনশন কর্মসূচি প্রত্যাহারে চিঠি লিখে অনুরোধ করে প্রত্যাখ্যাত হন। জুনের এক তারিখ তিনি যখন দিলি্ল বিমানবন্দরে এসে নামেন, প্রণব মুখার্জি ও পি চিদাম্বরমসহ কেন্দ্রীয় সরকারের চারজন সিনিয়র মন্ত্রী তাকে কর্মসূচি থেকে নিবৃত্ত থাকার অনুরোধ জানান। কিন্তু স্বামী রামদেব ছিলেন 'অটল'।
ওয়াকিবহাল মহল বলছে, এরপরই সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। শনিবার মধ্যরাতে শত শত পুলিশ রামলীলা ময়দানে পেঁৗছলে অপ্রত্যাশিত ও নাটকীয়ভাবে রামদেব রণে ভঙ্গ দেন। প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকরা বলছেন, পুলিশ দেখামাত্রই অনশনে থাকা যোগগুরু দৌড়ে মাইক্রোফোনের কাছে যান এবং 'বন্দেমাতরম' স্লোগান দিয়ে মাঠজুড়ে ঘুমিয়ে থাকা ভক্তদের জাগাতে থাকেন। পুলিশ বাহিনী যখন তার দিকে এগোতে থাকে, সবাইকে বিস্মিত করে তিনি তিন মিটার উঁচু মঞ্চ থেকে লাফ দিয়ে মহিলা ভক্তদের মাঝে লুকিয়ে পড়েন। শত শত মহিলার মধ্যে ঘণ্টাখানেক খুঁজে পুলিশ দেখতে পায় স্বামীজি তার চিরাচরিত গেরুয়া রঙের কাপড়ের পরিবর্তে সাদা শাড়ি পরে দোপাট্টায় মুখ ঢেকে মহিলা সেজে লুকিয়ে আছেন! পরে পুলিশ তাকে আটক করে বিমানে তুলে দেয়।
হরিদ্বারে নিজের আশ্রমে বসে পরদিন তিনি অশ্রুসিক্ত চোখে ও বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে সাংবাদিকদের জানান, সরকার তাকে অপহরণ ও হত্যা করতে চেয়েছিল। তিনি কোনোরকমে বেঁচে এসেছেন। তবে 'সত্যাগ্রহ' চলবে। অন্যদিকে সরকারও জানিয়ে দিয়েছে, স্বামী রামদেবের সঙ্গে আর কোনো আলোচনা নয়।
স্বামী রামদেবকে নিয়ে আগে থেকেই নানা প্রশ্ন ছিল। এখন কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, তিনি আসলে ডানপন্থি বিজেপির পক্ষ হয়ে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করেছিলেন। কংগ্রেসের অন্যতম সাধারণ সম্পাদক সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, রামদেব আসলে জোচ্চোর। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আন্না হাজারে তার অনশনের মধ্য দিয়ে দেশের মধ্যমণিতে পরিণত হলেও তাকে অনুসরণ করতে গিয়ে স্বামীজি যে বিপাকে পড়েছেন, তা থেকে সহসা মুক্তি পাবেন বলে মনে হয় না।