দলকে সন্ত্রাসীমুক্ত করা সরকারের স্বার্থেই প্রয়োজন-সন্ত্রাস-খুন-টেন্ডারবাজি

‘পঞ্চগড়ে ছাত্রলীগ নেতা খুন’—শুক্রবারের প্রথম আলোর এই শিরোনাম এবং সঙ্গে দিনাজপুরে চকচকে চাপাতি হাতে সাধারণ ঠিকাদারদের ধাওয়ার ছবিটিই সব কথা বলে দিচ্ছে। দরপত্র দাখিল নিয়ে পঞ্চগড়ে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সংঘাতে ঝরে গেল একটি প্রাণ।


এবং সঙ্গে আহত হয়েছেন ১১ জন। রাজনৈতিকভাবে তাঁরা এক পক্ষের হলেও ১০টি সরকারি পুকুর ইজারার দরপত্র দাখিল নিয়ে তাঁরা নেমেছেন রক্তারক্তি প্রতিযোগিতায়। ওই দিনের প্রথম আলোর আরও কিছু সংবাদ এ রকম—দিনাজপুরে ভূমি প্রতিমন্ত্রীর এপিএসের নেতৃত্বে ঠিকাদারদের ওপর হামলা, চট্টগ্রামে ঠিকাদারকে হত্যার সঙ্গে জড়িত ‘যুবলীগ নামধারী সন্ত্রাসীরা’, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের হাতে প্রক্টর ও প্রাধ্যক্ষের লাঞ্ছনা। সব দেখেশুনে কেবল এটিই বলার রয়েছে, ‘এখনো গেল না আঁধার’; শেষ হলো না টেন্ডারবাজি-দখলবাজির রক্তারক্তির ধারা।
পঞ্চগড়ের ঘটনায় সারা শহরে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে, চলেছে উত্তেজনা ও ঘরবাড়ি ভাঙচুর। প্রশ্ন উঠতে পারে, ঠিকাদারেরা ছাত্রলীগ-যুবলীগ নাকি ছাত্রলীগ-যুবলীগই ঠিকাদার-ব্যবসায়ী? দেশের ঠিকাদারি কাজে তো বটেই, অন্যান্য ব্যবসাক্ষেত্রেও দলীয় আধিপত্য স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। সন্ত্রাসের এই বাণিজ্যিক খেসারতের দিকটিও উপেক্ষণীয় নয়।
বাংলাদেশে দুর্নীতি ও সন্ত্রাস যেন মানিকজোড়। কোথাও সন্ত্রাস হলে ধরে নিতে হবে, তার কার্যকারণগুলোর মধ্যে দুর্নীতিও রয়েছে। আর তাতে অনিবার্যভাবে আসবে সরকারি দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের নাম। দুঃখজনক যে, বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলের এই ধারাবাহিকতা এখনো চলতে পারছে। সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের সোয়া এক বছরে ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্মীদের নিজেদের ও প্রতিপক্ষের মধ্যকার সন্ত্রাসে কম রক্ত ঝরেনি, কম প্রাণ অকালে হারিয়ে যায়নি। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং তাদের কঠোর ভাষায় থামতে বলেছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ‘সকলই গরল ভেল’। দুর্নীতির রজ্জুটি যেমন ওপর থেকে মধ্যম পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ের ক্যাডার পর্যন্ত নেমে এসেছে, তাদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই তেমনি সন্ত্রাস হয়ে উঠছে বেপরোয়া। সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাকাঠামোর মধ্যে শেকড় গেড়ে বসা সন্ত্রাস ও দুর্নীতির এই পৃষ্ঠপোষকদেরই আগে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কেননা তাদের জন্যই সরকারের অনেক শুভ উদ্যোগও কলঙ্কিত হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে ভাবমূর্তি। এ বিষয়ে প্রথম আলো গোড়া থেকেই দায়িত্বশীল সমালোচনার মাধ্যমে প্রতিকারের চাহিদা ব্যক্ত করে আসছে।
এ অবস্থা যতটা অসহনীয় ও লজ্জাকর, প্রতিকারে ততটাই কঠোর ও লক্ষ্যভেদী হওয়া চাই। সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আদালতে বিচারের পাশাপাশি দল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও বহিষ্কার করতে হবে। এটা করার জন্য প্রশাসনসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পক্ষপাতহীন ও দক্ষ শিক্ষক-প্রশাসকদের দায়িত্ব দিতে হবে। তেমনি পুলিশ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাও জরুরি। দেখতে হবে যাতে রাজনৈতিক চাপ তাঁদের বিব্রত ও ভীত না করে। সন্ত্রাসের এই কলঙ্কিত উত্তরাধিকার ত্যাগ করতে জাতীয় সঙ্কল্প প্রয়োজন। প্রয়োজন দল ও সরকারকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থে ব্যবহারের পথ বন্ধ করা।