রস, কষ, শিঙাড়া, বুলবুলি, মস্তক by হুমায়ূন আহমেদ

গল্প লেখার পেছনের গল্প: বিশ্বসাহিত্যে কল্পবিজ্ঞানের গ্র্যান্ড মাস্টার আমেরিকান লেখক আইজ্যাক অ্যাসিমভ। ভূতের গল্পের আরেক গ্র্যান্ড মাস্টার হলেন স্টিফান কিং। ইনিও আমেরিকান। এই দুই লেখকই গল্প লেখার গল্প লিখতে পছন্দ করেন। আইজ্যাক অ্যাসিমভ আবার স্টিফান কিংয়ের এক কাঠি এগিয়ে। তিনি গল্পটি লিখে কত টাকা পেয়েছিলেন, কত পাওয়া উচিত ছিল, তাও লিখেন।


আমি এই দুজনের অনুপ্রেরণায় মাঝে মাঝে গল্প লেখার পেছনের গল্প লিখি। আমার গল্পগ্রন্থ আজ দুপুরে তোমার নিমন্ত্রণ-এ এই কাজটি করেছি। কারও দ্বারা অনুপ্রাণিত হওয়া দোষের কিছু না, হজম হয়ে যাওয়াটা দোষের।
‘রস কষ শিঙাড়া বুলবুলি’ লেখার পেছনে আছে প্লাটিনামঘটিত একটি রসায়নিক যৌগ। প্লাটিনাম অতি মূল্যবান ধাতু। ধনবান তরুণীদের গায়ে প্লাটিনামের তৈরি গয়না রুচি ও বিত্তের বিজ্ঞাপন হিসেবে কাজ করে। দেখো, আমার কী রুচি, আমার কত টাকা। আমি প্লাটিনামের গয়না পরি।
সমস্যা হয়, এই প্লাটিনাম যখন শরীরের বাইরে না থেকে কেমোথেরাপির একটি যৌগ হিসেবে শরীরের রক্তে মেশানো হয়, তখন। এ শরীর বিষাক্ত করে তোলে। নার্ভের ওপর চেপে বসে। হাত এবং পায়ের আঙুল অবশ হতে শুরু করে। অবস্থা একপর্যায়ে এমন হয় যে, কোনো কিছু হাতের আঙুল ব্যবহার করে ধরা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। যেমন, এখন আমি শার্টের বোতাম নিজে লাগাতে পারি না। অন্যকে এগিয়ে আসতে হয়। পুত্র নিষাদ জুতার ফিতা লাগাতে পারে না, তবে শার্টের বোতাম লাগাতে পারে। জুতার ফিতা বাঁধার কাজটি আদর্শ পত্নীর মতো শাওন করে। তার এবারের আমেরিকা ভ্রমণ হলো শিক্ষাসফর।
কেমোথেরাপি যে আমাকে এই পর্যায়ে নিয়ে যাবে, তা আমার অনকোলজিস্ট প্রথম দিনেই বলেছেন। আমি লেখক এবং কম্পিউটারে লিখি না, আঙুলে কলম ধরে লিখি শুনে তিনি কিছুটা চিন্তিত হলেন। আমাকে বললেন, তুমি আঙুল দিয়ে লেখার চেষ্টা করে যাবে। এটা ব্যায়ামের মতো কাজ করবে। আর যদি এমন হয়, তুমি একেবারেই লিখতে পারছ না, তখন তুমি মুখে বলবে, তোমার স্ত্রী লিখবে। এই বুদ্ধি কেমন?
আমি বললাম, ভালো বুদ্ধি। ‘রস, কষ, শিঙারা, বুলবুলি’ গল্পটি আমি নিজের আঙুল ব্যবহার করেই লিখছি। ভবিষ্যতে কী হবে, তা বলতে পারছি না। গল্প কী লিখব ঠিক করা আছে। জাপানি কথাশিল্পী হারুকি মোরাকামির একটি গল্পের ছায়ায় ব্যাঙ নিয়ে গল্প। আদি গল্পে টোকিও শহরের এক লোক তার অ্যাপার্টমেন্টের দরজা খুলে দেখে ঘরে প্রকাণ্ড এক ব্যাঙ। ব্যাঙ মানুষের ভাষায় কথা বলতে থাকে। নিতান্তই রূপকথা-টাইপ গল্প, কিন্তু গল্প শেষ করার পর মনে হবে—এমন হতেও তো পারে। গল্পকারের এখানেই বাহাদুরি।
আমি ঠিক করেছি, ক্যানসারে আক্রান্ত এক যুবক তার অ্যাপার্টমেন্টের দরজা খুলে দেখবে, প্রকাণ্ড এক ব্যাঙ তার বসার ঘরের সোফায় বসে কফি খেতে খেতে খবরের কাগজ পড়ছে। মামুনকে ঢুকতে দেখে সে বলল, আহারে, পুরা তো ভিজে গেছেন। জ্বর তো বাঁধাবেন। গরম পানিতে একটি হট শাওয়ার নিন। আমি এর মধ্যে চা বানিয়ে দিচ্ছি। চায়ে চুমুক দিন। চায়ে চিনি ক’চামচ খান?
কলম হাতে নেওয়ার পর মনে হলো, আরেকজনের গল্পের ছায়ায় গল্প লেখার দরকারটা কী? আমি আমার মতো করে লিখি না কেন? জাপানি কথাশিল্পী ব্যাঙ নিয়ে গল্প ফেঁদেছেন, আমি ফাঁদব বিড়াল নিয়ে। সে মানুষের ভাষায় কথা বলবে না। তার মানুষের ভাষায় কথা বলার প্রয়োজন নেই। বিড়াল হচ্ছে বিড়াল। তার জন্য এক শব্দের ভাষা ‘ম্যাঁও’ যথেষ্ট। তবে বিড়ালটা মোরাকামির ব্যাঙের মতো কথা বলা শুরুও করতে পারে। লেখক কলম হাতে নেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই কলমের নিয়ন্ত্রণ অন্য কারোর কাছে চলে যায়। এ জন্যই গল্পে কী ঘটবে না ঘটবে, তা আগ বাড়িয়ে বলা যাবে না।
ভালো কথা, গল্পের নামকরণ আমি ধার করেছি, এটা বলা দরকার। নিউইয়র্ক মুক্তধারার বিশ্বজিৎ সাহা আমাকে একগাদা বইয়ের তালিকা দিয়ে গেছে। কলকাতা বইমেলায় এই সব বই প্রকাশিত হবে, আমি চাই কি না! একটি প্রকাশিতব্য বইয়ের নাম—রস কষ শিঙাড়া বুলবুলি মস্তক। আমি ভাবলাম, ভালো তো। নাম হজম করে ফেললাম।
আরেকটা কথা, এই গল্প উত্তম পুরুষে শুরু করে থার্ড পারসনে চলে গেছি। বিষয়টা ইচ্ছাকৃত না, নিজের অজান্তেই ঘটেছে।
আসুন এখন মূল গল্পে—

আমার নাম মামুন। আমার বয়স ত্রিশ, তবে সার্টিফিকেটে আছে সাতাশ। এসএসসির ফরম ফিলাপের সময় আমাদের হেডস্যার সবার বয়স তিন বছর কমিয়ে দিলেন। এতে নাকি পরে অনেক সুবিধা পাওয়া যাবে। তিনি শুধু যে বয়স কমালেন, তা-না, সবার জন্মতারিখ করে দিলেন ১ জানুয়ারি। এই কাজটি তিনি কেন করলেন, তা ব্যাখ্যা করলেন না। কুতুবপুর আদর্শ বালক বিদ্যালয়ের আমার ব্যাচের সব ছাত্রের জন্মতারিখ ১ জানুয়ারি।
আজ পয়লা জানুয়ারি। সার্টিফিকেট হিসাবে আমার জন্মদিন। মূল জন্মদিনের তারিখ (১২ অক্টোবর, তুলা রাশি) আমার প্রায়ই মনে থাকে না, তবে ১ জানুয়ারি মনে থাকে। এই উপলক্ষে কেক কাটা হয় না, তবে আমি আগোরা সুপার মার্কেট থেকে এক পিস পেস্ট্রি কিনি, দাম ১০ টাকা।
জন্মদিন পালন করি একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে। না, আমার সঙ্গে কেউ থাকে না। আমি একা মানুষ। জ্বলন্ত মোমবাতি ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে বেসুরা গলায় গান ধরি।
হ্যাপি বার্থ ডে ডিয়ার মামুন
হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ।
তারপর পেস্ট্রি খাওয়া। পেস্ট্রি খাওয়ার সময় মাথা দুলাতে দুলাতে গাই—আই অ্যাম এ জলি গুড ফেলো...
আমার পড়াশোনা, বিদ্যা-বুদ্ধি সম্পর্কে এখন বলা যেতে পারে। এসএসসিতে ফার্স্ট ডিভিশন, পাঁচটি লেটার। এইচএসসিতে ফার্স্ট ডিভিশন, লেটার নেই। বিএতে সেকেন্ড ক্লাস। এমএতে টেনেটুনে থার্ড ক্লাস। এমএ থার্ড ক্লাস হলো, এমএ ফেলের চেয়েও নিচে। কাজেই আমি কাউকে এমএ রেজাল্টের কথা বলি না।
যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করি, তাদের বিএ পাসের কথা জানাইনি। জানলে তারা আমাকে চাকরি দিত না। আমি ওভার কোয়ালিফাইড হয়ে যেতাম। আমি একটা প্রতিষ্ঠানের টি ম্যান বাংলায় কী হবে? চাওয়ালা? অফিস চলাকালে যে চা চায় তাকে চা বানিয়ে দিই। কফি বানিয়ে দিই। প্রতিষ্ঠানের নাম ‘অন্য প্রকাশ’। এরা নানা বইপত্র ছাপায়। বইয়ের প্রুফ নিয়ে মাঝে মাঝে অনেক লেখককে বাসায় যেতে হয়। হুমায়ূন স্যারের বাসায় আমি অনেকবার গিয়েছি। তিনি আমাকে নামে চেনেন। আমার সঙ্গে রসিকতাও করেন। একদিন আমাকে বললেন, তোমার মামুন নাম শর্ট করে দাও। শেষের ‘ন’টা ফেলে দাও। তাহলে সবাই তোমাকে মামু ডাকবে। আমি মাজহারকে বলে দেব, সেও তোমাকে মামু ডাকবে।
মাজহার স্যার হচ্ছেন আমাদের প্রতিষ্ঠানের মালিক। হুমায়ূন স্যার এই কথা বললে তিনি অবশ্যই আমাকে মামু ডাকা শুরু করবেন।
মামু ডাকার দরকার নেই, আমাকে তিনি যে তুই তুই করে বলেন, এটা অসহ্য লাগে। আমি একজন গ্র্যাজুয়েট, এই খবরটা জানলে তিনি অবশ্যই তুই বলতেন না, তবে আমাকে চাকরিতেও রাখতেন না। এই ধরনের প্রতিষ্ঠানে কিছু লোক দরকার, যাকে মালিকপক্ষ তুই-তোকারি করতে পারে। মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করায় আনন্দ আছে।
আচ্ছা, থাক উনার কথা। আমি জন্মদিনের কথা বলি। অফিস থেকে বের হয়ে একটা চায়ের দোকানে ঢুকলাম। আমি টি ম্যান। সারা দিন অন্যের চা বানাই বলেই মনে হয় নিজের বানানো চা খেতে ভালো লাগে না। ‘বিসমিল্লাহ’ হোটেলে পাঁচ টাকা দিয়ে একটা মালাই চা খাই। এরা চা-টা ভালো বানায়। দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করে। সেই দুধে চা-পাতা দিয়ে আবার জ্বাল দেওয়া, জ্বাল দেওয়া। যারা এই চায়ের মজা পেয়ে যায়, তারা অন্য চা মুখে দিতে পারে না। মনে হয় এরা চায়ে সামান্য আফিমও দেয়, কারণ চা খাওয়ার পরপর নেশার মতো হয়।
চা শেষ করার আগেই ঝুম বৃষ্টি লেগে গেল। বৃষ্টি না থামা পর্যন্ত আমি বের হতে পারব না। আমার সঙ্গে ছাতা নেই। আমাকে যেতে হবে হেঁটে হেঁটে। রিকশায় করে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
আমি পাঞ্জাবির পকেটে হাত দিয়ে চুপ করে বসে রইলাম। পাঞ্জাবির পকেটে হাত দেওয়ার বিষয়টা বলি। পাঞ্জাবির পকেটে আমার ধানমন্ডি ৩/এ-র অ্যাপার্টমেন্টের দুটো চাবি। একটা তালারই দুটো চাবি। প্রথমে একটা চাবি দিয়ে ক্লক ওয়াইজ ঘোরাতে হয়, তারপর দ্বিতীয় চাবি অন্য একটা ফুটায় ঢুকিয়ে এন্টিক্লক ওয়াইজ ঘোরাতে হয়। এই চাবি আমার দূরসম্পর্কের মামা হাশেম আলী খান জার্মানি থেকে এনেছেন। তাঁর অ্যাপার্টমেন্টের মূল দরজার চাবি।
আপনারা কি বুঝে ফেলেছেন আমি হাশেম মামার অ্যাপার্টমেন্টের একজন কেয়ারটেকার? হাশেম মামা থাকেন জার্মানিতে। আমি হাশেম মামার অ্যাপার্টমেন্টে থাকি। তিন হাজার বর্গফুটের বিশাল অ্যাপার্টমেন্ট। ফ্রিজ আছে দুটো। একটা ফ্রিজের বোতাম টিপলে হড়হড় করে বরফ বের হয়। বসার ঘরে সোফার দাম এক লাখ পঁচাত্তর হাজার টাকা। বসলে মনে হয় মাখনের দলায় বসেছি। এ থেকেই বোঝা যায় ঘটনা কী?
মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের মাজহার স্যারের অ্যাপার্টমেন্ট ৩/এ-র গলিতে। আমি যে একই গলিতে থাকি, তা তাঁকে জানাইনি। জানালেই ঝামেলা। নতুন অনেক কাজ ঘাড়ে নিতে হবে। তাঁর জন্য বাজার করে দেওয়া। তাঁর দুই ছেলেকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া-আসা। মাজহার স্যার অবশ্য কয়েকবার আমাকে এই গলিতে দেখেছেন। প্রথম যেদিন দেখেন, সেদিন বলেছিলেন, এদিকে কী?
আমি বললাম, স্যার, আমার এক দূরসম্পর্কের মামার বাসা এই গলিতে। তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম। এখন চলে যাচ্ছি।
তিনি বললেন, ও, আচ্ছা আচ্ছা।
আমি বললাম, কিছু লাগবে, স্যার? আমার কোনো কাজ কি আছে?
তিনি বললেন, না। তুই কাল সকাল সাতটার আগে বাসায় চলে আসবি। ছেলে দুটোকে স্কুলে নিয়ে যাবি। তাদের মায়ের জ্বর।
আমি বললাম, জি, আচ্ছা, স্যার।
আমি নিশ্চিন্ত হয়ে গেলাম, তিনি এ গলিতে আমাকে দেখলেও কখনো ভাববেন না এখানকার কোনো অ্যাপার্টমেন্টে আমি মোটামুটি রাজার হালেই বাস করি এবং আমার অ্যাপার্টমেন্ট তাঁরটার ডাবল। প্রতিটি ঘরে ফ্ল্যাট স্ক্রিন টিভি আছে। মূল শোবার ঘরের খাটে আছে ওয়াটার বেড, তোষকের ভেতর তুলার বদলে পানি ভরা। বিছানায় শুলে মনে হয় পানির ওপর শুয়ে আছি। এই জিনিস মাজহার স্যার চোখে দেখেছেন বলেও মনে হয় না। উনাকে একবার আমার অ্যাপার্টমেন্ট দেখাতে পারলে ভালো লাগত। না, উনাকে আনা যাবে না। উনাকে যেদিন আনব, তার পরদিন আমার চাকরি চলে যাবে। তবে হুমায়ূন স্যারকে একদিন দাওয়াত করে খাওয়াব। উনি আসবেন কি না, জানি না। মনে হয়, আসবেন না। উনাকে মাই ডিয়ার মনে হলেও উনি ভয়ংকর অহংকারী। তবে তিনি যদি আসতেন, তাঁকে একটা বিড়ালের গল্প শোনাতাম। বিড়াল নিয়ে দুটো উপন্যাস লিখেছেন। একটার নাম বিড়াল, আরেকটার নাম পুফি। দুটো আমি পড়েছি। তেমন কিছু হয়নি। আমি যে গল্পটা জানি, সেটার কাছে বিড়ালের কোনো গল্প দাঁড়াবে না। আল্লাহর কসম, নবীজির কসম।
অনেকক্ষণ হলো মামুনের চা শেষ হয়েছে, বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই। পৌষ মাস, বৃষ্টির মাস না। কোনো কারণে নিম্নচাপ সৃষ্টি হলে যে বৃষ্টি হয়, সেটা থামে না। যতক্ষণ নিম্নচাপ, ততক্ষণ বৃষ্টি।
রাস্তায় নেমে মামুনের শরীর হিম হয়ে গেল। বৃষ্টির পানিতে না, আসমান থেকে বরফ পড়ছে। সেই সঙ্গে ঠান্ডা হওয়া। এই ঠান্ডায় হেঁটে ধানমন্ডি পর্যন্ত যাওয়া যাবে না, তার আগেই নিউমোনিয়া ধরে যাবে। মামুনের শরীরের অবস্থা যা, তাতে নিউমোনিয়া ধরলে আর বাঁচানো যাবে না। তার পাকস্থলীতে ক্যানসার হয়েছে। সে কেমোথেরাপি শুরু করেছে। নীলগঞ্জে বসতবাড়ি বিক্রি করে কেমোর খরচ চালাচ্ছে।
প্রতি পনেরো দিন পরপর একবার করে কেমোর ডেট থাকে। মামুনের কাছে আটটা কেমো দেওয়ার মতো টাকা আছে। তবে তার ধারণা, চারটা কেমোর পরপরই সে শেষ হয়ে যাবে। বাকি টাকাটা তখন কী হবে?
ক্যানসার ও কেমোর ব্যাপারটা সে সবার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছে। এই সব বলে বেড়ানোর বিষয় না।
প্রথম কেমোর পর তাকে তিন দিন বিছানায় শুয়ে থাকতে হলো। চতুর্থ দিনে অফিসে যাওয়ার পর মাজহার স্যার বললেন, ঘটনা কী? অফিসে আসিসনি কেন? মামুন বলল, আমার খালাতো বোন বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে। তাকে ধরার জন্য দিনাজপুর গিয়েছিলাম।
মাজহার স্যার বললেন, পাওয়া গেছে?
মামুন বলল, না। সে বর্ডার ক্রস হয়ে ইন্ডিয়া চলে গেছে। যার সঙ্গে পালিয়েছে, সে হিন্দু। নাম বিকাশ। আমার মনে হয় রুবিনা এই হিন্দুটাকেই বিয়ে করবে।
মামুন জানে নতুন ধরনের অপ্রচলিত গল্প বললে সহজে পার পাওয়া যায়। ‘জ্বর হয়েছে বলে তিন দিন আসতে পারি নাই’—এই ধরনের গল্প পাত্তা পায় না। দ্বিতীয় কেমোর সময় অফিস কামাইয়ের গল্প সে তৈরি করে রেখেছে।
কোনো রিকশা নেই। মামুন হাঁটতে হাঁটতে এগোচ্ছে। রাস্তায় পানি জমে গেছে। খানাখন্দের মধ্যে পা পড়লে জীবাণু সংক্রমণ হবে। তখন আর রক্ষা নেই। কেমোথেরাপি চলার সময় শরীরের ডব্লিউবিসি কমে যায়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
ঝোড়ো বাতাসের কারণে কারেন্ট চলে গেছে। চারদিক হঠাৎ অন্ধকার। যখন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, তখন আলো হচ্ছে। মোটরগাড়ির হেডলাইটের আলো থাকায় রক্ষা। মামুন বুঝতে পারছে সে কোথায় যাচ্ছে।
পানিতে-কাদায় মাখামাখি হয়ে, গায়ে প্রবল জ্বর নিয়ে মামুন শেষ পর্যন্ত তার অ্যাপার্টমেন্টের সামনে এসে দাঁড়াল। চাবি দিয়ে তালা খোলাটাই এখন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্বরের ঘোরে হাত কাঁপছে। চাবি ঘোরানো যাচ্ছে না। মামুনের কাছে মনে হচ্ছে, সে অনন্তকাল ধরে চাবি ঘোরাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত দরজা খুলল। মামুন বসার ঘরের বাতি জ্বালাল। ঘর আলো হওয়ামাত্র তার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। ঘরের এক লাখ পঁচাত্তর হাজার টাকা দামের সোফায় নোংরা একটা বিড়াল বসে আছে। বিড়ালটা তার মতো পানি-কাদা মাখানো। তারও হাত-পা কাঁপছে। মামুন ভেবে পেল না, এই বদবিড়াল ঢুকল কীভাবে? বন্ধ ঘরে কুকুর-বিড়াল ঢোকার উপায় নেই। মামুন কঠিন গলায় বলল, নাম। সোফা থেকে নাম বদের বাচ্চা।
মামুনকে হতভম্ব করে দিয়ে বিড়াল বলল, এক্সাইটেড হবেন না। এক্সাইটেড হওয়া কোনো কাজের কথা না। ওভার এক্সাইটেড হলে মাইল্ড স্ট্রোক হয়ে যেতে পারে। আপনি বরং হট শাওয়ার নিন। হট শাওয়ার নিয়ে গরম এক কাপ চা খান। আমাকেও দিতে পারেন। আমার অবস্থাও আপনার মতো।
মামুন নিশ্চিত, তার মাথা এলোমেলো হয়ে গেছে। তার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। পৃথিবী রূপকথার রাজত্ব না। এখানে পশুপাখি কথা বলে না।
বিড়ালটা সোফা থেকে নেমে বসার ঘর থেকে রান্নাঘরের দিকে গেল। আবার ফিরে এসে শরীর টান দিয়ে বলল, আমাকে কথা বলতে দেখে কি অবাক হচ্ছেন, মামুন ভাই?
তাকে মামুন ভাই ডাকছে? বিড়াল তাকে মামুন ভাই ডাকছে?
বিড়াল আবার সোফায় উঠতে উঠতে বলল, আমরা বিড়ালেরা মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারি, তবে সচরাচর বলি না। মানুষকে চমকে দেওয়ার প্রয়োজন কী! মামুন ভাই, আপনি মনে হয় ঠান্ডা না লাগিয়ে ছাড়বেন না। ছোট ভাইয়ের একটা কথা শুনুন, টেক এ হট শাওয়ার, প্লিজ।
মামুন একদৃষ্টিতে বিড়ালের দিকে তাকিয়ে আছে। সে ইংরেজি বলছে। মামুনের মাথা কি পুরো খারাপ হয়ে গেছে! উত্তেজিত হলে চলবে না। নিজেকে শান্ত রাখতে হবে। ‘ঘরে কোনো বিড়াল নেই, সবই তার উত্তেজিত মস্তিষ্কের কল্পনা’—এই ভাবতে ভাবতে সে বাথরুমের দিকে রওনা হলো। বিড়ালটা পেছন থেকে বলল, মামুন ভাই, আপনি কি আমাকে চিনতে পেরেছেন? আমরা দুই বোন এক ভাই ছিলাম। আপনি আমাদের বস্তায় ভর্তি করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ফেলে দিয়ে এলেন। মনে পড়েছে?
মামুন হট শাওয়ার নিচ্ছে। তার সারা শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। গরম পানির আরামদায়ক উষ্ণতায় তার ঘুম পেয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, বস্তায় ভর্তি করে তিন বিড়াল ফেলে দেওয়ার কথা তার মনে আছে।
বিড়াল বাথরুমে চলে এসেছে। সেখান থেকে বলল, মামুন ভাই! আপনার উচিত ছিল বস্তার মুখ খুলে দিয়ে আসা। খুলে দিয়ে যদি আসতেন আমার বোন দুটো মারা যেত না। তিন দিন পর এক পাগল বস্তার মুখ খুলল বলে আমি বেঁচে গেলাম।
মামুন বলল, চুপ। এই হারামজাদা, চুপ।
বিড়াল বলল, অনেকক্ষণ শাওয়ার নিয়েছেন, এখন শুকনা টাওয়েল দিয়ে গা-টা মুছুন। গরম চা বা কফি কিছু একটা খান। শরীরের কাঁপুনি কমবে।
আমি কী করব, কী করব না, তা তোকে বলতে হবে না। বদের বাচ্চা!
বিড়াল বলল, ল্যাঙ্গুয়েজ প্লিজ। মানুষের উচিত সব সময় সব অবস্থায় ভদ্র ব্যবহার করা। আপনার মাজহার স্যার যখন আপনাকে তুই ডাকে, তখন আপনার খারাপ লাগে না? আমারও লাগে।
মামুন বলল, চুপ।
বিড়াল বলল, একটি বিশেষ দিকে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আপনারা যেমন তিন ভাইবোন, আমরাও তাই ছিলাম। আমার দুই বোন মারা যাওয়ার পরপর আপনার দুই বোন মারা যায়। মিলটা কি লক্ষ করছেন, মামুন ভাই? আপনি বেঁচে আছেন, আমি বেঁচে আছি। আপনার শরীর ভালো না, আমারও শরীর ভালো না। দুধ ছাড়া কিছুই খেতে পারি না। রোজ রোজ কে আমাকে দুধ দেবে?
আপনার চিকিৎসা শুরু হয়েছে, আমার হচ্ছে না। তবে আমরা দুজন একই সময়ে মারা যাব। মামুন ভাই! আপনার বাসায় কি দুধ আছে? আমাকে এক বাটি গরম দুধ কি দেওয়া যাবে?
মামুন শাওয়ার থেকে বের হয়েছে। সে ঠিক করেছে, বিড়াল কী বলছে না বলছে, তা নিয়ে মাথা ঘামাবে না। তার প্রচণ্ড ক্ষুধা লেগেছে। ঘরে কোনো খাবার নেই, তবে পাউডার মিল্ক আছে। এক গ্লাস গরম দুধ খাওয়া যেতে পারে।
মামুন দুটো টোস্ট বিস্কুট আর আধা গ্লাস দুধ খেল। বিড়ালটা সারাক্ষণই তার সামনে নানা কথা বলে যাচ্ছে। মামুন জানে, এই সবই হ্যালুসিনেশন। এই গলিতেই লেখক হুমায়ূন আহমেদ থাকেন। তাঁর কাছে গেলে তিনি মিসির আলীর মতো সব বুঝিয়ে দেবেন। বিড়াল যা ইচ্ছা বলুক, তার কথায় কান না দিলেই হবে। বিড়াল কথা বলেই যাচ্ছে।
মামুন ভাই! আধা গ্লাস দুধ আমার জন্য রেখে দিয়েছেন? আপনি পুরো গ্লাস শেষ করুন। আপনার শরীরে পুষ্টি দরকার। আমাকে আধা গ্লাস দুধ দিলে খেতে পারব না। বাটিতে ঢেলে দিন। সঙ্গে একটা টোস্ট বিস্কুটও দিতে পারেন। একটু কষ্ট করে বিস্কুটটা যদি দুধে ভিজিয়ে দেন, আমার জন্য সুবিধা হয়।
মামুনের কাছে এখন মনে হচ্ছে, বিড়ালের মানুষের মতো কথা বলা অনেক পরের ব্যাপার, তার কোনো অস্তিত্বই নেই। তার পরেও মামুন বাটিতে গ্লাসের দুধ ঢেলে একটা টোস্ট বিস্কুট ছেড়ে দিল। বিড়াল বলল, থ্যাংক ইউ, ভাইয়া।
মামুন নিজের অজান্তেই বলে ফেলল, বস্তায় ভরে তোমাদের ফেলে আসাটা আমার অন্যায় হয়েছে। আই অ্যাপোলোজাইজ।
বিড়াল বলল, নো মেনশন। ভাইয়া, দুধে এক চামচ চিনি দিয়ে দেবেন? ঘরে চিনি কি আছে?

মামুন এক চামচ চিনি দুধে ঢেলে ঘুমাতে গেল।
ঘরে ভয়াবহ ঠান্ডা। লেপের নিচেও মামুন কাঁপছে। বিড়ালটা খাটের নিচে। কার্পেটে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে কথা বলেই যাচ্ছে। মামুন এখন কথার জবাবও দিচ্ছে।
মামুন ভাই! আপনাকে একটা বুদ্ধি দেব?
কী বুদ্ধি?
মাজহার স্যার মাঝে মাঝে চেক দিয়ে টাকা ভাঙানোর জন্য ব্যাংকে পাঠান না?
হুঁ।
বড় অ্যামাউন্টের চেক দিলে টাকা নিয়ে ডুব দেবেন। আপনার চিকিৎসা চলছে, এখন টাকা দরকার।
অন্যের টাকা নেব?
বিড়াল বলল, আগে তো জানে বাঁচবেন, তারপর অন্য বিবেচনা। আপনার বেঁচে থাকা আমার জন্য জরুরি। আপনি বেঁচে থাকলে আমি বেঁচে থাকব।
তোমার অসুখটা কী?
আপনার যা, আমারও তাই। তফাত একটাই—আপনার চিকিৎসা হচ্ছে, আমার হচ্ছে না।
মামুন বলল, তুমি চাইলে তোমাকে ভেটেরিনারি চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে পারি।
বিড়াল হাই তুলতে তুলতে বলল, ওকে।
মামুন বলল, বাইরে প্রচণ্ড ঠান্ডা। লেপের ভেতর ঢুকবে? এসো, চলে এসো। মামুন লেপ উঁচু করল। বিড়ালটা লাফ দিয়ে লেপের ভেতর ঢুকে কুণ্ডলী পাকিয়ে পেটের কাছে শুয়ে পড়ল।
মামুন বলল, সরি!
বিড়াল বলল, সরি কেন বলছেন, ভাইয়া?
তোমাদের বস্তায় ভরে ফেলে দিয়েছিলাম, এই জন্য, সরি।
পুরোনো কথা ভেবে মনে কষ্ট পাবেন না। আরাম করে ঘুমান।
মামুন ঘুমাচ্ছে। ক্যানসার রোগীর পরাবাস্তব জগতে আরামের ঘুম। এই জগতে তার পেটের কাছে কালো একটা বিড়াল একই সঙ্গে আছে এবং নেই। শ্রোডিনজারের বিড়ালের মতো।
ঘুমের মধ্যে মামুন সুখের এক স্বপ্ন দেখল। তার বড় দুই বোন রস কষ শিঙাড়া বুলবুল খেলছে। কালো বিড়ালটা তার দুই বোনকে নিয়ে খেলা দেখছে। বিড়াল ভাইবোন খুবই আনন্দ পাচ্ছে।
অনেক দূর থেকে গম্ভীর গলায় কেউ একজন বলল, খেলা বন্ধ। টাইম ইজ আপ।
মামুনের দুই বোন খেলা বন্ধ করছে না। খেলেই যাচ্ছে—রস কষ শিঙাড়া বুলবুল মস্তক। রস কষ শিঙাড়া বুলবুল মস্তক। রস কষ শিঙাড়া বুলবুল মস্তক।
মাজহার স্যার দুই লাখ টাকার একটা চেক দিয়েছেন, ক্যাশ টাকা আনার জন্য। তিনি বললেন, সঙ্গে কাউকে দিতে হবে, না একা আনতে পারবে?
মামুন বলল, একাই আনতে পারব, স্যার।
গাড়ি আছে কি না দেখো। গাড়ি না থাকলে রিকশা নিয়ে যাও।
মামুন চেক ভাঙিয়ে অফিসে গেল না। দুই হাফ তেহারি কিনে তার অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে গেল। টাকাটা তার কাজে লাগবে। পাসপোর্ট করাই আছে। সে চিকিৎসার জন্য ইন্ডিয়া চলে যাবে। বিড়ালটাকে সঙ্গে নিতে হবে। ট্রাংকে ভরে নিয়ে যাবে, সমস্যা হবে না।
মামুন একাই দুই হাফ তেহারি খেল। বিড়ালটা তেহারি খেল না। তার জন্য দুধ। দুপুরে আরামের ঘুমের জন্য সে শুয়েছে। বিড়ালটা আবারও তার পেটের কাছে। মামুন বলল, ভয় নেই। আমি তোমার চিকিৎসা করাব।
বিড়াল বলল, থ্যাংক ইউ, ভাইয়া।
মামুনের চোখ ঘুমে বন্ধ হয়ে আছে। আগের রাতের স্বপ্ন ফিরে এসেছে। মামুনের দুই বোন অতি দূরের কোনো অঞ্চল থেকে অলৌকিক সুরে গাইছে—রস কষ শিঙাড়া বুলবুল মস্তক। রস কষ শিঙাড়া বুলবুল মস্তক।

No comments

Powered by Blogger.