আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার দিবস-আইনের শাসন চাই by তামান্না ইসলাম অলি

খুব সাদা চোখে যেকোনো অপরাধই মানবতাবিরোধী। আবার মানবতাবিরোধী যেকোনো ক্রিয়াই অপরাধের আওতায় পড়ে। তবে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত প্রতিষ্ঠার পর নতুন মাত্রা পেয়েছে 'মানবতাবিরোধী অপরাধ' শব্দবন্ধটি; বিশেষ করে আমাদের বাংলাদেশে। এই আদালতের সহায়তায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা ভয়ংকর সব যুদ্ধাপরাধ করেছিল,


তাদের অপরাধের তদন্ত এবং বিচার শুরু হয়েছে। এখন আমরা খুব সহজেই বুঝতে পারি, মানবতাবিরোধী অপরাধ বলতে বোঝায় এমন সব অন্যায় বা অত্যাচার, যার কারণে কোনো বিশাল জনগোষ্ঠী বা একটি জাতির জীবনযাপন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে, যার শিকার হয় নির্দোষ হাজার হাজার নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষ। বর্তমান আলোচ্য 'মানবতাবিরোধী অপরাধ' মূলত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল কিংবা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা কেন্দ্রিক। একে আমরা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা না বলে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা বলতে পারি। এর আওতায় পড়ে গণহত্যা, লুটপাট, ধর্ষণ ও ব্যাপক সম্পদহানি। এককথায় এটি যুদ্ধাপরাধ। মানবতার কল্যাণে এই হিংসুক অপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো প্রয়োজন। প্রয়োজন ন্যায়বিচারের। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অপরাধীরা ক্ষমতা ব্যবহার করে বিনা বিচারে পার পেয়ে যায়। আবার কখনো রাষ্ট্রশক্তির আশ্রয়ে অপরাধীরা শাস্তি পায় না। তাই মানবতাবিরোধী যেকোনো অপরাধের বিচার নিশ্চিতকরণে রোম সংবিধির ভিত্তিতে ১৯৯৮ সালের ১৭ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত। এই আদালতের সদর দপ্তর নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে। তবে পৃথিবীর যেকোনো দেশে এই আদালত কাজ করতে পারে। জাতীয় বা আন্তর্জাতিকভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোই এর কাজ। এই আদালত এটাই প্রমাণ করে, অন্যায় যেখানেই হোক আর অপরাধী যেখানেই থাকুক না কেন, সে কখনোই বিনা বিচারে পার পাবে না। ১৯৯৮ সালে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত প্রতিষ্ঠিত হলেও এটি কাজ শুরু করে ২০০২ সালের ১ জুলাই। এর মূল উদ্দেশ্য অপরাধী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সহযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করা। মোটামুটি সারা বিশ্বে ন্যায়বিচারের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই এ আদালতের কাজ। শুরুতে ১২০টি দেশ এই সংবিধি অনুমোদনে ভোট দেয়। কিন্তু ভোট দেওয়ায় বিরত থাকে ২১টি দেশ। আর প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেয় ইরাক, ইসরায়েল, লিবিয়া, চীন, কাতার, যুক্তরাষ্ট্র ও ইয়েমেন। ২০০৯ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ আমেরিকার সব দেশ, ইউরোপের বেশির ভাগ দেশ, আফ্রিকার প্রায় অর্ধেক দেশ এতে মত দেয়। এর পক্ষে দাঁড়ায় ১১০টি রাষ্ট্র। কয়েকটি বিষয়ে অস্বচ্ছতার অভিযোগে ভারতও এই সংবিধির বিরোধিতা করে। পাকিস্তান সমর্থন দিলেও এখনো এতে সই করেনি। এই সংবিধিতে সমর্থন, স্বাক্ষর এবং অনুমোদনকারী এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এর কারণ আমাদের সবার জানা। এই সংবিধি বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সময়োপযোগী। কারণ ১৯৭১ সালে ইতিহাসের বর্বরোচিত নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল আজকের বাংলাদেশ তথা সে সময়ের পূর্ব পাকিস্তানে। এই অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য। কিন্তু জাতি হিসেবে আমরা সৌভাগ্যবান যে কিছুটা দেরিতে হলেও এ দেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়েছে। আমরা আশাবাদী, খুব দ্রুত এই বিচার শেষ হবে। বিচার দেখতে পাবেন হাজারো জীবিত মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু বহু দেশের মানুষ এই সুযোগ পায়নি। 'মানবতা' শব্দটি সেখানে অনুপস্থিত। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অপরাধীর বিচারের নামে হচ্ছে প্রহসন। তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রকাশ্যে। এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের শিকড় রয়েছে ১৯৪৮ সালের জেনোসাইড কনভেনশনের মধ্যে। কারণ জাতিসংঘ নির্যাতনবিরোধী কনভেনশন কিংবা আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত ন্যায়বিচারের জন্যই প্রতিষ্ঠিত। তবে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের সঙ্গে অন্যান্য আদালতের পার্থক্য রয়েছে। এটি মূলত দুটি রাষ্ট্রপক্ষের বিচার করে; কোনো ব্যক্তির নয়। আইসিসির মধ্যে উগান্ডা, কঙ্গো, সুদানের দারফুর এবং কেনিয়ায় মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত শুরু হয়েছে। সারা বিশ্বে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে এই আদালতকে পরিচিত করা উচিত। এ কারণে প্রতিবছর ১৭ জুলাই দিবসটি পালন করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার দিবস হিসেবে।
তামান্না ইসলাম অলি

No comments

Powered by Blogger.