বীর মুক্তিযোদ্ধা-তোমাদের এ ঋণ শোধ হবে না

৩০৯ স্বাধীনতার চার দশক উপলক্ষে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ধারাবাহিক এই আয়োজন। সিরাজুল হক, বীর প্রতীক এক মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বকথা রাতের অন্ধকারে মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকটি দল অবস্থান নিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থানের চারদিকে। মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দলে আছেন সিরাজুল হক।


সকাল থেকেই তাঁদের ওপর শুরু হলো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বোমাবর্ষণ। বিরামহীনভাবে সারা দিন ধরে চলল। সিরাজুল হক ও তাঁর সহযোদ্ধারা দমে গেলেন না। সাহসিকতার সঙ্গে পাকিস্তানি আক্রমণ মোকাবিলা করলেন। একপর্যায়ে পাকিস্তানি সেনারা পালানোর চেষ্টা করতে থাকল। কিন্তু সে পথ রুদ্ধ। তখন ভেঙে পড়ল পাকিস্তানিদের প্রতিরোধ। এ ঘটনা পরশুরামে। ১৯৭১ সালের ৮-১১ নভেম্বর।
পরশুরাম ফেনী জেলার অন্তর্গত। এর অবস্থান বিলোনিয়া পকেটে। ফেনীর উত্তরে ভারত সীমান্তে বিলোনিয়া। বিলোনিয়া উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ১৬ মাইল লম্বা এবং পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ছয় মাইল বিস্তৃত। এর তিন দিকেই ভারত। ১৯৭১ সালে বিলোনিয়া পকেটের বিভিন্ন স্থানে ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শক্ত প্রতিরক্ষা অবস্থান।
নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে মুক্তিযোদ্ধারা বিলোনিয়া পকেটে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদের অবরোধ করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিতি টের পেয়ে ৯ নভেম্বর থেকে পাকিস্তানি সেনারা বোমাবর্ষণ শুরু করে। সারা দিন তাদের বোমাবর্ষণ অব্যাহত থাকে। দুপুরের পর পাকিস্তানি সেনারা সরাসরি আক্রমণ শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি আক্রমণ সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিহত করেন। এ সময় পরশুরামে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে সিরাজুল হক ও তাঁর সহযোদ্ধারা বীরত্ব প্রদর্শন করেন। তাঁদের বীরত্বে পাকিস্তানি সেনাদের মনোবল ভেঙে পড়ে। এরপর পাকিস্তানি সেনারা পরশুরাম থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেন।
পরদিন ১০ নভেম্বর যুদ্ধ থেমে থেমে চলতে থাকে। রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পরশুরাম ঘাঁটির ওপর মুক্তিযোদ্ধারা প্রচণ্ড আক্রমণ চালান। এ আক্রমণে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বেশির ভাগ সদস্য নিহত হয়। বাকিরা আত্মসমর্পণ করে। সকাল হওয়ার পর সেখানে দেখা যায়, চারদিকে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে পাকিস্তানি সেনাদের লাশ। ধানখেত, বাংকার, খাল—কোথাও ফাঁকা নেই।
সিরাজুল হক চাকরি করতেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে। কর্মরত ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে (বর্তমান পাকিস্তান)। ১৯৭১ সালের মার্চে ছুটিতে বাড়িতে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে। প্রতিরোধ-যুদ্ধ শেষে যুদ্ধ করেন ২ নম্বর সেক্টরের রাজনগর সাবসেক্টরে।
মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য সিরাজুল হককে বীর প্রতীক খেতাব দেওয়া হয়। ১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী তাঁর বীরত্বভূষণ নম্বর ৯৫। গেজেটে নাম সিরাজ। প্রকৃত নাম সিরাজুল হক।
সিরাজুল হক ১৯৯৭ সালে মারা যান। স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতেই চাকরি করেন। ১৯৯৩ সালে অনারারি ক্যাপ্টেন হিসেবে অবসর নেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি ফেনীর সদর উপজেলার মোটবী ইউনিয়নের শিলুয়া গ্রামে। বাবার নাম আফজালুর রহমান। মা বদরের নেছা। স্ত্রী জরিনা আক্তার বেগম। তাঁর এক ছেলে ও তিন মেয়ে।
সূত্র: প্রথম আলো ফেনীর নিজস্ব প্রতিবেদক আবু তাহের এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর ২।
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
trrashed@gmail.com