শেকড়ের ডাক-ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য by ফরহাদ মাহমুদ

প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের মূল্য যে আমরা বুঝি না, তা নয়। কিছুদিন আগে বিশ্বের প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের সময় আমাদের তরুণ সমাজ যেভাবে ভোট সংগ্রহের জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল, তা আমাদের মুগ্ধ করেছে। এর পেছনে কাজ করেছে আমাদের এই প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি তাদের ভালোবাসা, তাদের আবেগ-অনুভূতি।


কিন্তু সেই অনুভূতি যদি আরো 'ডিপ রুটেড' বা গভীরে প্রোথিত হতো, তাহলে আরো ভালো হতো। কারণ এই আবেগের অধিকাংশটাই খুব ভাসা ভাসা, যার ফলে আমরা কখনো সমস্যা উপলব্ধি করার, সমস্যার গভীরে যাওয়ার কিংবা সংকট থেকে উত্তরণের চেষ্টা করি না। গত ৭ ফেব্রুয়ারি একটি টিভি চ্যানেলে অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম বলেছিলেন, সুন্দরবন থেকে প্রতিবছর চোরাশিকারিরা ১০ থেকে ১২ হাজার হরিণ শিকার করে। ১০ বছরে বাঘ মারা পড়েছে অর্ধশতাধিক। দেদার পাচার হচ্ছে নানা রকম গাছ। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের গর্বের, ভালোবাসার সুন্দরবন কত দিন টিকে থাকবে?
একটি দেশের নানা রকম ঐতিহ্য থাকে। এর অন্যতম হচ্ছে প্রাকৃতিক ঐতিহ্য, সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং অবকাঠামোগত ঐতিহ্য। এর মধ্যে প্রাকৃতিক ঐতিহ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর ওপরই নির্ভর করে সভ্যতার বিকাশ, মানুষের জীবনযাত্রা, এমনকি সুস্থতাও। আর এই প্রাকৃতিক ঐতিহ্য গঠিত হয় একটি দেশের নদীনালা, হাওর-বাঁওড়, জলাশয় থেকে শুরু করে বন, বৃক্ষলতা, পশুপাখি, মৎস্যসম্পদ থেকে কীটপতঙ্গ পর্যন্ত প্রাণিজগৎ ও উদ্ভিদজগৎ নিয়ে। আমরা ইতিমধ্যে অনেক প্রাকৃতিক ঐতিহ্যই ধ্বংস করে ফেলেছি। শতাধিক প্রজাতির উদ্ভিদ প্রায় নাই হয়ে গেছে। চিতা, গণ্ডার, গয়াল, বুনো মোষসহ অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণী হারিয়ে গেছে। জংলি কুকুর, হাতি, মেছো কুমির, লজ্জাবতী বানর, ভালুকসহ অনেক প্রজাতির প্রাণী হারিয়ে যাওয়ার পথে। অতীত রেকর্ডে পাওয়া যায়, আমাদের সাত শতাধিক প্রজাতির পাখি ছিল, এখন তিন থেকে চার শ প্রজাতির পাখি দেখা যায়, তাও যথেষ্ট সংখ্যায় নয়। আমাদের ছয় শতাধিক প্রজাতির মাছ ছিল, এখন পাওয়া যায় মাত্র দুই শ প্রজাতির মতো। প্রজাপতি, ফড়িংয়ের ওড়াউড়ি এখন কমই দেখা যায়। আর এর সব কিছু মিলে প্রকৃতিতে যে ভারসাম্য তৈরি হয়েছিল, সেই ভারসাম্যও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে বন ধ্বংস, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, অর্থনৈতিক মূল্যহীন উদ্ভিদের টিকে থাকার মতো সুযোগ না থাকা, নদীগুলো ভরাট হতে হতে শুকিয়ে যাওয়া, অবশিষ্ট নদীগুলোতেও অব্যাহত পানিদূষণ, জলাশয়-জলাভূমি ভরাট বা নষ্ট হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। কোনো কোনো প্রজাতির প্রজাপতি বা মথ একটিমাত্র প্রজাতির গাছকে কেন্দ্র করেই বেঁচে থাকে। সেই গাছটি না থাকলে ওই প্রজাপতিও থাকবে না। আমাদের দেশে ১৮ প্রজাতির পেঁচা ছিল বলে নিকট-অতীতের রেকর্ডেও জানা যায়। এখন মাঝেমধ্যে পাঁচ-সাতটি প্রজাতির পেঁচা দেখা যায়। একইভাবে ধনেশ, ময়না, জংলি শালিক, কাঠঠোকরা, টিয়াসহ অনেক কোটরবাসী প্রজাতির পাখির সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। কারণ তারা বাসা বানাতে পারছে না, প্রজনন করতে পারছে না। কোটরসম্পন্ন গাছই এখন দুর্লভ হয়ে পড়েছে। অর্থকরী কাঠের গাছগুলোয় সাধারণত কোটর হয় না, তদুপরি পরিণত হওয়ার আগেই সেসব গাছ বিক্রি করে দেওয়া হয়।
বিদেশি দাতা সংস্থা বা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কনভেনশনের কারণে এর আগে সরকার কিছু বনকে নামে মাত্র সংরক্ষিত বন ঘোষণা করেছে। এটি বরং হিতে বিপরীত হয়েছে। এর ফলে সেই বনগুলো আরো দ্রুত ধ্বংস হয়েছে। আগে বন বিভাগের অধীনে থাকা সেই বনগুলো থেকে কিছু রাজস্ব পাওয়া যেত। তখন বন বিভাগ সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যায় কিছুটা হলেও সচেষ্ট থাকত। সংরক্ষিত বনাঞ্চল করার ফলে সেখান থেকে গাছ কাটা নিষিদ্ধ হয়ে যায়। রাজস্ব আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে তদারকি-পরিচর্যাও সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। সেই সুযোগে কিছু অসাধু কমকর্তা ও কর্মচারীর যোগসাজশে চোররা বনগুলোর গাছ কেটে সাবাড় করে দিয়েছে। টেকনাফ গেম রিজার্ভে ১৯৮০ সালের দিকেও যেখানে শতভাগ বন ছিল, ২০০৫ সালে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী সেখানে প্রাকৃতিক বনের পরিমাণ ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। ভাওয়াল গড়ের যেভাবে দ্রুত অবনতি হচ্ছে এবং যেভাবে বনের জমি দখলের প্রক্রিয়া চলছে, তাতে দু-এক দশক পর একটি প্রদর্শনী এলাকা ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। মধুপুর সংরক্ষিত বনাঞ্চলেরও একই অবস্থা। চুনতি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের নামমাত্র অস্তিত্ব আছে। সামাজিক বনায়নের নামে একাশিয়া নামক বিদেশি প্রজাতির ক্ষতিকর গাছ লাগানো হচ্ছে, যা আমাদের বন্য প্রাণীদের আবাসযোগ্যতা নষ্ট করছে। তদুপরি আইন অনুযায়ী বনাঞ্চলের সীমানার তিন কিলোমিটারের মধ্যে কোনো ইটখোলা থাকতে পারবে না। কিন্তু কেবল টেকনাফ ও চুনতি বনাঞ্চলের সীমানা ঘেঁষেই রয়েছে ১৮টি ইটখোলা। এদের ইট পোড়ানোর প্রধান জ্বালানি হচ্ছে এসব বনের কাঠ। এসব নিয়ে পত্রপত্রিকায় বহু লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু জেলা প্রশাসন নিয়মিত এসব ইটখোলার লাইসেন্স নবায়ন করে যাচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তর বিশেষ কারণে ছাড়পত্র দিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ একটি ছোট্ট দেশ, অথচ এর রয়েছে বিশাল জনসংখ্যা। এই জনসংখ্যা আবার অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে চলেছে। তাই ছোটখাটো গ্রামীণ বন অনেক আগে থেকেই উজাড় হতে শুরু করেছে। বর্তমানে গ্রামীণ বনের খুব একটা অবশিষ্ট নেই। অথচ এসব গ্রামীণ বন ছিল বহু প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল। জনসংখ্যার অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মালিকানাধীন এসব বন রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব। তাই গ্রামীণ বনাঞ্চলের সেসব প্রাণী ও উদ্ভিদ রক্ষা করাটাও সম্ভব হবে না। এ কারণে সরকারিভাবে সম্ভব হলে প্রতিটি উপজেলায়, তা না হলে কমপক্ষে প্রতিটি জেলায় গ্রামীণ বনের আদলে একটি সংরক্ষিত গ্রামীণ জঙ্গল স্থাপন করা যেতে পারে। এর জন্য খুব বেশি জমিরও প্রয়োজন নেই, ১০-২০ একর জমিই যথেষ্ট। উপজেলা প্রশাসনই এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে পারে। একইভাবে শীতের অতিথি পাখিদের, বিশেষ করে হাঁসজাতীয় জলচর পাখিদের জন্যও সারা দেশে অন্তত ১০-২০টি জলাশয় হলেও চিহ্নিত করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাখিগুলো এখন যেখানে যায়, সেখানেই শিকারিদের উৎপাতের শিকার হয়। তখন শিকারিদের উৎপাত হলে এবং কাছাকাছি কোনো সংরক্ষিত জলাশয় থাকলে সেগুলোয় গিয়ে সাময়িক আশ্রয় নিতে পারবে।
অনেককেই বলতে শোনা যায়, আগে মানুষের সমস্যার সমাধান হোক, পরে প্রাণী ও উদ্ভিদের সমস্যা নিয়ে চিন্তা করা যাবে। এর চেয়ে বড় মূর্খতা আর কিছু হতে পারে না। উদ্ভিদ ও প্রাণিজগৎ তথা প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করা না গেলে মানুষও টিকে থাকতে পারবে না, সেই সত্যটি আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। মানুষের সব সমস্যার পরিপূর্ণ সমাধান কোনো দিনই হবে না। আর প্রাণী ও উদ্ভিদবৈচিত্র্য একবার হারিয়ে গেলে তা ফিরিয়েও আনা যাবে না। কাজেই এটি আলাদাভাবে না দেখে দ্রুত দেশে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে আমাদের উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সুন্দরবন নিয়ে তরুণ সমাজের মধ্যে যে রকম উৎসাহ আমরা দেখেছিলাম, দেশের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তাদের একইভাবে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে। সরকারের কাছে দাবি জানাতে হবে। মানুষকে সচেতন করতে হবে। শুধু সুন্দরবন নয়, আমাদের সব সংরক্ষিত বনাঞ্চলকেই উপযুক্তভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। আর তা করা গেলে বিশ্বে আমাদের সম্মান অনেক বেড়ে যাবে।
fmahmud53@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.