ওদের রোখে শক্তি কার by কনিকা হক

ওরা আনন্দের বাঁধভাঙা জোয়ারে ভাসছে কাঙ্ক্ষিত ফল পেয়ে। ওদের কণ্ঠে উচ্ছ্বাস ঝরে ঝরে পড়েছে। কিন্তু বিস্মিত না এতটুকু। এমন কথা শোনাই যায়নি বা যায় না_ ভাবিনি এতটা ভালো করব। আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠধ্বনি, যা ভেবেছি তাই হয়েছে। বিশ্বাস ছিল ভালো করব, করেছি। লেখাপড়া ভালোভাবে করেছি, কাজেই রেজাল্ট ভালো হবে_ বিশ্বাস ছিল।


নিজের মেধার ওপর, নিজের পরিশ্রমের ওপর এমনই আস্থা ওদের। দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই। স্পষ্ট ওদের চাওয়া। কেউ চায় প্রকৌশলী হতে, কেউ শিক্ষক, কেউ চিকিৎসক, কেউ গবেষক, কেউ বা সফল ব্যবসায়ী। স্বপ্ন ওদের প্রত্যেকের নিজের মতো করে আকাশ ছোঁয়ার। ২০-২৫ বছর আগেও মেয়েদের চাওয়াগুলো এত দৃঢ় ছিল না। বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হতো অনেককে। পারিবারিক সিদ্ধান্তে। কিন্তু এখন এ সময়ে বিয়ে ভাবাই যায় না। নিজের একটা শক্ত জায়গা তৈরি করার সংকল্পে প্রতিযোগী ওরা। ওরা জানে, ইচ্ছা আর চেষ্টা পেঁৗছে দিতে পারে ওদের লক্ষ্যে। জেনে গেছে সব যোগ্যতা আছে ওদের। ওরা মেধাবী, সাহসী, শক্তিশালী। কারণ ওদের সামনে এভারেস্ট সমান উদাহরণ এখন ভূরি ভূরি। কাজেই থামা বলে কোনো শব্দ নেই ওদের জীবনের অভিধানে। ওরা দুরন্ত, দুর্বার_ ওদের রোখে শক্তি কার! এগিয়ে চলায়
এবারের এইচএসসির রেজাল্ট অন্য বছরগুলো থেকে অনেক বেশি ভালো হয়েছে। মেয়েদের রেজাল্ট হয়েছে আরও ভালো। গড় পাসের হারে ছাত্রদের চেয়ে ছাত্রীরা এগিয়ে। ছাত্রীদের পাসের হার ৭৭ দশমিক ২৫ শতাংশ। আর ছাত্রদের গড় পাসের হার ৭৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মেয়েদের গড় রেজাল্ট ভালো হওয়ার আর একটি কারণ ছিল মানবিক শাখার রেজাল্ট অন্য বছরের তুলনায় ভালো হওয়া। মানবিক শাখায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বেশি। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই মানবিক শাখায় পড়ে। আর গ্রামাঞ্চলে ছাত্রীসংখ্যাও বেশি। তবে জিপিএ ৫ প্রাপ্তিতে মেয়েরা কিছুটা পিছিয়ে। আট বোর্ডে ২৬ হাজার ৯৫৫ জন জিপিএ ৫ পেয়েছেন। আর ২৪ হাজার ৫১৪ ছাত্রী পেয়েছেন জিপিএ ৫।
প্রতিনিয়ত এই যে মেয়েদের এগিয়ে যাওয়া, এর পেছনের কারণটা আসলে কী?
ভিকারুনি্নসা নুন স্কুল অ্যাণ্ড কলেজের প্রিন্সিপাল মঞ্জুআরা বেগম বললেন, আমরা সবাই এখন মেয়েদের প্রতি খুব যত্নশীল হয়েছি। আমাদের ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে যে, মেয়ে আর ছেলেতে কোনো পার্থক্য নেই। মেধার ক্ষেত্রে দু'জনই সমান। ফলে বাবা -মায়েরা মেয়ের লেখপড়ার বিষয়টি হালকাভাবে নিচ্ছেন না। তাদের সিরিয়াস মনোভাবের কারণে মেয়েরা যোগ্যতার প্রমাণ দেখাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
জিপিএ ৫ (গোল্ডেন) পাওয়া শ্রাবন্তীর মা লায়লা ফেরদৌস বলেন, আমার দুই মেয়ে। শিক্ষিত পরিবারে বিয়ে হয়েছে আমার। কিন্তু আমার দুই মেয়ে, বিষয়টি আমার শ্বশুর বাড়ির লোকজন এখনও ভালোভাবে নেয় না। কারণ তাদের একমাত্র ছেলে। সেই ছেলের ঘরে দুই মেয়ে মেনে নিতে কষ্ট হয় তাদের। আমার ভেতর একটা জেদ কাজ করে সব সময়। আমি দেখিয়ে দেব আমার মেয়েরা ছেলের চেয়েও অনেক বেশি যোগ্য হবে সবদিক থেকে । সেভাবে ওদের গড়ে তুলছি। নিজেকে ভুলে গেছি। এ নিয়ে আফসোস নেই, ওরা মানুষ হলেই আমি সার্থক।
মেয়েদের সাফল্যে আমাদের আনন্দের মাত্রা বেশি হওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো, তাদের এগোনোর ওপর নির্ভর করছে সমাজ তথা রাষ্ট্রের উন্নতি। জনসংখ্যার অর্ধেক জনগোষ্ঠী যদি পিছিয়ে থাকে তাহলে দেশের অগ্রগতি আশা করাই ভুল । দীর্ঘদিনের পুরুষতান্ত্রিকতার বেড়াজালে আবদ্ধ সমাজের মানসিকতা বদলে ফেলা সহজ বিষয় নয়। কিন্তু বদলাতে শুরু করেছে বেশ দ্রুতলয়ে। এটা আশার কথা । সেই আশাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে আমাদের সোনার মেয়েরা। তারা বদলে দেবে সমাজ। সেই দিনের অপেক্ষায় আমরা সবাই।

No comments

Powered by Blogger.