ধর্ম-আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা পালন by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত নবী-রাসুলগণ সবাই রোজা পালন করেছেন। ইসলামের প্রাথমিক যুগে তিন দিন রোজা রাখার ধর্মীয় বিধান ছিল। পরে দ্বিতীয় হিজরিতে উম্মতে মুহাম্মদীর ওপর মাহে রমজানের ৩০ দিন রোজা ফরজ করা হয়। ‘রোজা’ ফারসি শব্দ। আরবিতে রোজাকে ‘সাওম’ বলা হয়।


এর আভিধানিক অর্থ অবিরাম চেষ্টা, আত্মসংযম, বিরত থাকা, সংযত রাখা প্রভৃতি। প্রত্যেক বয়ঃপ্রাপ্ত, সক্ষম, সুস্থ, মুকিম ও বুদ্ধিমান মুসলমান নর-নারীর ওপর রমজান মাসে রোজাব্রত পালন করা ফরজ বা অবশ্যকর্তব্য। এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ইসলাম পাঁচটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ১. ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং হজরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর বান্দা ও রাসুল’ বলে সাক্ষ্য দেওয়া, ২. নামাজ প্রতিষ্ঠা করা, ৩. জাকাত প্রদান করা, ৪. রমজান মাসে রোজা পালন করা ও ৫. সামর্থ্যবান ব্যক্তির বায়তুল্লাহ জিয়ারত বা হজ করা।’ (বুখারি ও মুসলিম)
ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় রোজার গুরুত্ব, তাৎপর্য ও ভূমিকা অপরিসীম। রোজা হলো এমন এক সবর্জনীন ইবাদত, যা রোজাদারকে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধন, ইসলামি মূল্যবোধ, নীতিনৈতিকতা, অন্তরের সজীবতা, হূদয়ের পবিত্রতা ও চিন্তাধারার বিশুদ্ধতা প্রদান করে। রোজা পালনের মাধ্যমে তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন করা যায়। রোজাদার যখন রমজান মাসে রোজা রাখেন তখন তিনি আত্মশুদ্ধি লাভ করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেন। রোজা পালনের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের কথা উল্লেখ করে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হলো যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের (নবীগণের উম্মত) ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া বা পরহেজগারি অর্জন করতে পারো।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত-১৮৩)
কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ প্রভৃতি কুপ্রবৃত্তির হাত থেকে আত্মরক্ষার অন্যতম হাতিয়ার হলো রোজা। মাসব্যাপী রোজায় অভ্যস্ত হয়ে সর্বাবস্থায় ধৈর্যধারণ, আধ্যাত্মিক শক্তি ও শোকর আদায়ের সৌভাগ্য রোজাদার ব্যক্তি অর্জন করেন। রমজান মাসে ধর্মভীরু মানুষ লোক দেখানোর জন্য পানাহার ত্যাগ করেন না, ক্ষুধা-তৃষ্ণার কষ্টও সহ্য করেন না। রোজাদার ব্যক্তি একমাত্র মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য রোজাব্রত পালন করে থাকেন। এ জন্য আল্লাহ তাআলা রোজাদার ব্যক্তিকে অত্যন্ত ভালোবাসেন। রোজা একমাত্র আল্লাহর ভালোবাসারই পরিচায়ক। তাই আল্লাহ তাআলা রোজাদার ব্যক্তিকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করবেন বলে ঘোষণা করেছেন। হাদিসে কুদসিতে বর্ণিত আছে যে আল্লাহ তাআলা বলেছেন: ‘রোজা শুধু আমারই জন্য এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।’ (বুখারি ও মুসলিম)
রমজান মাসের রোজাকে কেবল ইবাদত ও তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষণরূপেই সুনির্দিষ্ট করা হয়নি, বরং মহাগ্রন্থ আল-কোরআনরূপে মানবজাতির পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে যে বিরাট ও মহান ঐশী নিয়ামত আল্লাহ তাআলা দান করেছেন; রোজাকে এর শুকরিয়া আদায় করার উপায় বলেও ঘোষণা করা হয়েছে। এ জন্য মাহে রমজানে রোজাদার ব্যক্তি বেশি বেশি পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করেন। আর তাই রোজা ও কোরআন শরিফ কিয়ামতের দিন রোজাদারের জন্য আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করবে এবং আল্লাহ তাআলা তাদের সুপারিশ কবুল করবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রোজাসমূহ এবং আল-কোরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজাসমূহ বলবে, হে প্রতিপালক! আমি এই ব্যক্তিকে দিনে খাবার ও অন্যান্য কামনা-বাসনা থেকে ফিরিয়ে রেখেছি। আপনি আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল-কোরআন বলবে, আমি এই ব্যক্তিকে রাতের নিদ্রা থেকে ফিরিয়ে রেখেছি। আপনি আমার সুপারিশ কবুল করুন। আল্লাহ তাআলা তাদের সুপারিশ কবুল করবেন।’ (বায়হাকি, মুসনাদে আহমাদ)
নবী করিম (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘যারা রমজান মাসের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত রোজা পালন করেছে, তারা ওই দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে যাবে, যেদিন তাদের মাতা তাদের নিষ্পাপরূপে প্রসব করেছিলেন।’ মাহে রমজানে রোজাদার ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য ধৈর্যধারণপূর্বক সকল প্রকার পাপকাজ, পানাহার, ইন্দ্রিয় তৃপ্তি, ভোগ বিলাসিতা ও লোভ-লালসা থেকে বিরত থাকেন। সে জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাকে প্রতিদানস্বরূপ জান্নাত প্রদান করবেন। এ সুসংবাদ দিয়ে রাসুলে করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন ‘এ মাস (রমজান) ধৈর্যের মাস এবং ধৈর্যের বিনিময় হচ্ছে বেহেশত।’ (মিশকাত)
রোজার সঙ্গে ঈমান ও ইহতিসাব (আত্মবিশ্লেষণ) তথা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও উত্তম বিনিময় লাভের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং রমজান মাসে রোজা পালনের যথেষ্ট ধর্মীয় গুরুত্ব বা আধ্যাত্মিক তাৎপর্য ও উদ্দেশ্য রয়েছে। বস্তুত, প্রকৃত রোজাদার ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করেন এবং তার জান্নাতের পথ সুগম হয়। মহানবীর (সা.) ফরমান, ‘আর এটি (রমজান) এমন একটি মাস যার প্রথম ভাগে আল্লাহর রহমত, মধ্য ভাগে গুনাহর মাগফিরাত এবং শেষ ভাগে জাহান্নামের আগুন থেকে নাজাত বা মুক্তি লাভ রয়েছে।’ (মিশকাত)
রোজার প্রকৃত হকিকত ও ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার বিশেষ তাৎপর্য হচ্ছে তাকওয়া ও হূদয়ের পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। তাই মুসলমানদের আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধন ও তাকওয়া অবলম্বনের জন্য অজস্র নিয়ামতে পরিপূর্ণ মাহে রমজানে সিয়াম পালন করা অত্যাবশ্যক।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.