শেষের আগে

কপোত-কপোতী ভালোবাসার শক্তি কতটা? জানতে চান? এই গল্পটা শুনুন। মাইকেল ফেল্প্স তখন সাঁতার-পুলে রীতিমতো ঝড় তুলে যাচ্ছেন। বেইজিং অলিম্পিকের সুখস্মৃতি নিয়েই ২০০৯ রোম বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে এসেছেন। কিন্তু রোমে ফেল্প্সকে তাঁর অন্যতম প্রিয় ইভেন্ট ২০০ মিটার ফ্রিস্টাইলে হারিয়ে দিলেন জার্মানির পল বিডারমান।


কেড়ে নিলেন ফেল্পেসর বিশ্ব রেকর্ডও। সেটি ছিল চার বছরের মধ্যে ফেল্পেসর প্রথম বড় কোনো পরাজয়!
অবিশ্বাস্য এই জয় তুলে নেওয়ার পর বিডারমান জানালেন, ফেল্পেসর মতো জলদানবকে হারানোর আত্মবিশ্বাস তাঁকে জুগিয়েছেন ব্রিটা স্টেফেন। স্টেফেন ততদিনে সাঁতারদলের সতীর্থ আর বন্ধু পরিচয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে হয়ে উঠেছেন বিডারম্যানের হূদয়ের স্পন্দন। ভালোবাসার অসম শক্তির পরিচয় দিয়ে সেবারের সাঁতার চ্যাম্পিয়নশিপে ৪০০ মিটার ফ্রিস্টাইলেও বিশ্ব রেকর্ড গড়ে সোনা জিতলেন বিডারম্যান। স্টেফেনও ৫০ ও ১০০ মিটার ফ্রিস্টাইলে বিশ্ব রেকর্ড গড়ে জিতলেন সোনা। এই দুই ইভেন্টে অবশ্য বেইজিংয়েও সোনা জিতেছেন জার্মান এই সাঁতারু।
এ তো গেল ভালোবাসার একটা দিক। মুদ্রার অন্য পিঠও নিশ্চয়ই আছে। অনেক কানাঘুষার পর ২০১০ সালে দুজনে প্রথম প্রকাশ্যে স্বীকার করে নেন, দুজনের মধ্যে হূদয়ের লেনাদেনা সত্যিই চলছে। ব্যস্, এর পর থেকেই দুজন যেন আলোকচিত্রীদের আরাধনার বিষয় হয়ে গেলেন। তাঁদের সাঁতাদের ছবি যত না ছাপা হলো, এর চেয়ে বেশি ছাপা হতে থাকল দুই জোড়া ঠোঁটের সেতু গড়ার সব রোমান্টিক ছবি। ফলাফল? ২০১১ সাংহাই বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে দুজনই ব্যর্থ। বিডারমান তবু ২০০ মিটারে একটা ব্রোঞ্জ জিতলেন। স্টেফেন ১০০ মিটারের বাছাইয়ে ১৬তম হওয়ার পর ৫০ মিটারের বাছাইয়ে অংশই নিলেন না!
তবে ভালোবাসা যে অন্ধকার নয়, আলোর সন্ধানই দেয়; সেটাই এবার প্রমাণের পালা তাঁদের। জার্মানির অলিম্পিক ট্রায়ালে দুজনই দুর্দান্ত করেছেন। লন্ডন অলিম্পিক যেন তাঁদের কপোত-কপোতীর পরিচয়ই দেয়, তবে সেই পরিচয়টা যেন হয় সাফল্য-মোড়ানোই।

ভালোবাসার জন্য
এবার ভালোবাসার জন্য আরেকটি আত্মোৎসর্গের গল্প শুনুন। যে গল্পটার জন্ম দিয়েছেন কিম সিয়ার্স।
চাইলে তিনি অভিনেত্রী হতে পারতেন। ‘এ’ লেভেলে নাট্যকলা, সংগীত ও শিল্প নিয়ে পড়েছেন। চাইলে তিনি লেখিকাও হতে পারতেন। ব্রাইটনের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে। আঁকাআঁকির হাতও তাঁর বেশ ভালো। নিজের আঁকা ছবি নিয়ে একটা ওয়েবসাইটও বানিয়েছেন—ব্রাশেজ অ্যান্ড পস।
অনেক কিছু হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের পরিচয়ে কিছুই হওয়া হয়নি। হয়েছেন ‘অ্যান্ডি মারের প্রেমিকা’। এই পরিচয়েই খুশি সিয়ার্স। মারে যেন নিজের ক্যারিয়ারে ঠিকমতো দাঁড়াতে পারেন, এ জন্য বিসর্জন দিয়েছেন নিজের ক্যারিয়ার, নিজের স্বপ্ন, চাওয়া।
দুজনের পরিচয় ২০০৫ সালে। মারে তখন নাইজেল সিয়ার্সের কাছে টেনিস শেখেন। নাইজেলেরই সুদর্শন, সুনয়না কন্যা কিম সিয়ার্স। তখন তাঁর বয়স ১৭ বছর। সুইট সেভেনটিন। নিজের জীবন নিয়ে অজস্র পরিকল্পনা।
কিন্তু মারের সঙ্গে পরিচয় তাঁর জীবনের গতিপথটাই পাল্টে দিল। পরিচয় দ্রুতই প্রণয়ে রূপ নিল। এখন তো মারের সার্বক্ষণিক ছায়াসঙ্গী হয়ে থাকেন তিনি। মারের সাফল্যে হাসেন। মারে কাঁদলে তিনিও কাঁদেন। যেমন কেঁদেছেন এবারের উইম্বলডন ফাইনালে রজার ফেদেরারের কাছে মারে হেরে যাওয়ার পর।
২০০৯ সালে দুজনের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল। অনেকেই বললেন, তাতেই নাকি মারের মঙ্গল। টেনিসে পুরো মনোযোগ দিতে পারবেন। ফল হলো উল্টোটা। সিয়ার্স-বিরহে মারের খেলায় পড়ল নেতিবাচক প্রভাব। সাত মাসের বিচ্ছেদের অবসান ঘটিয়ে দুজনে আবার ফিরে এলেন দুজনার হূদয়ে। মারে অকপটে স্বীকার করলেন, সিয়ার্স-বিহীন পৃথিবী তাঁর কাছে অর্থহীন।
সিয়ার্সও জানালেন, তাঁর পৃথিবীও এখন মারের কক্ষপথে আবর্তিত, ‘নিজেকে নিয়ে এখন আর কোনো বিশেষ পরিকল্পনা নেই আমার। আমার, আমাদের সবকিছুই এখন অ্যান্ডিকে নিয়েই। অ্যান্ডি খুব করে একটা গ্র্যান্ড স্লাম জিততে চাইছে। এই চাওয়া আমাদের সবারই।’

মেসির উৎপাদনশীলতা
স্প্যানিশ লিগে গোলের ফিফটি, মৌসুমে ক্লাবের হয়ে সব মিলে ৭৩ গোল...লিওনেল মেসির ‘উৎপাদানশীলতা’ বোঝার জন্য গবেষক হতে হয় না। রকেট বিজ্ঞানী হওয়ারও প্রয়োজন নেই। তার পরও গবেষণা যদি করতেই চান, সেখানেও মিলে যাবে উত্তর। লিওনেল মেসি-ই এই পৃথিবীর সবচেয়ে উৎপাদনশীল খেলোয়াড়।
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর স্পোর্টস স্টাডিজ (সিআইইএস) ফুটবল অবজারভেটরির গবেষণাতেও উঠে এসেছে এই তথ্য। বিশ্বের পাঁচটি শীর্ষ লিগ—ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, লা লিগা, সিরি ‘আ’, বুন্দেসলিগা আর লিগ-ওয়ানের খেলোয়াড়দের গত মৌসুমের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করে পাওয়া গেছে এই তথ্য। উৎপাদনশীলতা বলতে শুধু গোল করানোই বোঝানো হয়নি। প্রতি মিনিটে খেলোয়াড়দের শুটিং, সুযোগ তৈরি, প্রতিপক্ষের সামনা করা, পাস দেওয়া এবং নিজেকে সামলে নেওয়ার মতো দক্ষতাগুলো বিশ্লেষণ করে নম্বর দিয়েছেন গবেষকেরা।
সবচেয়ে উৎপাদনশীল খেলোয়াড়ের তালিকায় মেসির পরেই আছেন ডেভিড সিলভা। ম্যানচেস্টার সিটির এই স্প্যানিশ প্লে-মেকার ক্লাবের গত মৌসুমের সাফল্যে রেখেছেন বড় ভূমিকা। সিলভা চোটের কারণে দলের বাইরে চলে যাওয়ার পরই খেই হারিয়ে ফেলেছিল সিটি। সবচেয়ে উৎপাদনশীল খেলোয়াড়ের তালিকায় তিনে আছেন আন্দ্রে পিরলো। এসি মিলানে জায়গা হারানো পিরলো জুভেন্টাসে নাম লিখিয়ে পাল্টা জবাব দিয়েছেন তুরিনের ক্লাবটিকে চ্যাম্পিয়ন বানিয়ে।
সবচেয়ে উৎপাদনশীল খেলোয়াড়ের তালিকায় চারে আছেন ফ্রাঙ্ক রিবেরি। লিগ আর কাপ—দুটো শিরোপাই শেষ পর্যন্ত বায়ার্ন মিউনিখ জিততে পারেনি। জিততে পারেনি চ্যাম্পিয়নস লিগও। কিন্তু তিনটি শিরোপা জেতারই উজ্জ্বল সম্ভাবনা ছিল তাদের। রিবেরি ছিলেন এর নেপথ্য কারিগর।
উৎপাদনশীল খেলোয়াড়ের তালিকায় সেরা পাঁচেও জায়গা পাননি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। অবশ্য সবচেয়ে ভালো শুটার হয়েছেন তিনি। সবচেয়ে ভালো সুযোগ তৈরি করা খেলোয়াড় রোনালদোর রিয়াল-সতীর্থ মেসুত ওজিল। সবচেয়ে ভালো পাস দেন জাভি।
 রাজীব হাসান

No comments

Powered by Blogger.