ট্যাবলেট মামা by বদরুন নাহার

টইটই আর হইচই ভাইবোন। টইটই ক্লাস ফোরে পড়ে আর হইচই সবে নার্সারিতে। ওদের এক ট্যাবলেট মামা আছে। ভাবছ, এ আবার কেমন নাম? হুম, নামটা আসলেই মজার। মামার অফিশিয়াল নাম কিন্তু এটা না। এটা পারিবারিক আদুরে নাম। তোমাদের নেই? হইচইকেই তো আদর করে অনেক সময় বাবা বুড়ি বলে ডাকে।


এই নামগুলোর পেছনেও একটা মজার কাহিনি থাকে। হইচই বাড়ির সবচেয়ে ছোট হলেও ওকে কেন বুড়ি বলা হয়, সেই মজার গল্পটা শোনো। বাবা অফিস থেকে ফিরলেই হইচই বলবে, ‘বাবা, তুমি হাত-মুখ ধুয়েছ? খেয়েছ তো?’ এমন সব পাকা পাকা কথা। তাই তো বাবা তাকে আদর করে ডাকে, ‘আমার বুড়িটা..., একেবারে যেন আমার মা।’ টইটই ভাইয়া যখন পড়াশোনায় ফাঁকি দিয়ে বসে বসে টিভি দেখে, তখনো হইচই বড়দের মতোই বলে, ‘ভাইয়া, এখন তোমার পড়ার সময়, পড়তে বসো, আমি কিন্তু আম্মুকে বলে দেব।’ তখন ভাইয়া রেগে গিয়ে বলে, ‘যা, বুড়ি কোথাকার!’ তেমনি আদুরে আবার খেপানো, যেটাই ভাবো না কেন, এমন সব নতুন নতুন নাম কিন্তু ছেলেবেলাতেই জুটে যায়। যেমন ট্যাবলেট মামা। ট্যাবলেট নিয়ে মজার গল্প তুমিও শুনে থাকবে। বিশেষ করে, ওই মিষ্টি খাবার গল্পটা। বাবলু-ডাবলু দুই ভাই যে কিছুতেই অসুখ হলে ট্যাবলেট খেতে চাইত না। তারা দুই ভাই মিষ্টি খেতে পছন্দ করত। তাই আম্মু তাদের মিষ্টির মধ্যে ট্যাবলেট ভরে দিল। তারা দুই ভাই মিলে মিষ্টিটা খেয়ে ফেলল, কিন্তু মিষ্টির ভেতরে পুরে দেওয়া ট্যাবলেটকে মিষ্টির বিচি মনে করে ফেলে দিল। কি, গল্পটা তোমারও জানা? কিন্তু টইটইয়ের ট্যাবলেট মামার গল্পটা বোধ হয় তোমার জানা নেই। টইটইয়ের নানাভাই ছিলেন একজন চিকিৎসক। বাসায় নানা রকম ওষুধের আনাগোনা ছিল। ট্যাবলেট মামা চান্স পেলেই ট্যাবলেট খেতেন, যদিও সেগুলো ভিটামিন সি, সিভিট—এসব। একবার তো ভুল ট্যাবলেট খেয়ে মরতে বসেছিলেন। হাসপাতালে নিয়ে নাড়ি পরিষ্কার করতে হলো, তবেই তিনি সেরে উঠলেন। নানাভাই বাড়িতে ওষুধ রাখা বন্ধ করে দিলেন। মামাকে দেখে চোখ কটমট করে ডাকতেন, ‘কই রে, হতচ্ছাড়া ট্যাবলেট...।’ আর বন্ধুরা বলত, ‘ট্যাবলেট ট্যাবলেট...মাথাটা গুবলেট।’ কিন্তু নানু বলতেন, ‘বাবা ট্যাবলেট, এদিকে একটু আয় তো, বাবা।’ দেখলে তো, একই নামের কত বাহার। এই হলো টইটই আর হইচইয়ের ট্যাবলেট মামা। সেই মামা কিন্তু এখন আর ছোট্টটি নেই। ইয়া বড় একটা ভুঁড়ি আর গোঁফওয়ালা মোটাসোটা লোক। আমেরিকা থেকে প্রতিবছর শীতে দেশে আসেন বেড়াতে। তাই ডিসেম্বরের বার্ষিক পরীক্ষা-পরবর্তী সময়টা টইটইদের মহা আনন্দে কাটে। মামা এলেই নানা রকম গল্প, ঘুরে বেড়ানো। এবারও টইটইরা অপেক্ষা করছে মামা আসার। আর সেই অপেক্ষার সময়টা আগামীকাল বেলা একটা নাগাদ শেষ হবে। একটার ফ্লাইটে মামা আসছেন।
মামা বাসায় এসে খাওয়াদাওয়া শেষে পুরো বিকেলই কাটিয়ে দিলেন লম্বা এক শ্রান্তির ঘুমে। এদিকে টইটই ও হইচই মামার ঘুম ভাঙার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ক্লান্ত। বিকেলের খেলা ভুলে দুজন মিলে পালা করে গেস্টরুমের দরজার দিকে নজর দিচ্ছে। কখন মামা উঠবেন, আর গল্প শোনা যাবে। অবশেষে সন্ধ্যার চা-নাশতা শেষে মামা হইচই আর টইটইকে নিয়ে গল্পের আসর জমালেন। সেই কতকাল আগের কথা, মামা তখন বাংলাদেশেই থাকতেন। সুন্দরবন ভ্রমণে গিয়ে কী মজাটাই না হলো তাঁর! শুনতে শুনতে টইটই আর হইচইয়ের গা কাঁটা দিয়ে উঠল। সুন্দরবনে মামা আর মামার বন্ধু কত-না ঘুরে বেড়ালেন। গোলপাতার ঘন বন পেরিয়ে একটা বড় গাছের ডালে মাচা বেঁধে পশুপাখিদের সঙ্গে কাটিয়ে দিলেন দুই দিন! ঘটনাটা ঘটে দ্বিতীয় দিন। মামার বন্ধু মাচা থেকে নেমে গেছে মাছ শিকারে। মামা বসে সকালের চা পানে ব্যস্ত। এমন সময় হম্বিতম্বি গর্জন দিয়ে একটা ডোরাকাটা বাঘ এসে হাজির। বাঘের চোখে মামার চোখ! মামার চোখে বাঘের চোখ পড়তেই বাঘ তীব্র হুংকারে ওপরের দিকে চেয়ে বড় হাঁ করল। কথাটা শুনে টইটই আর হইচই কেমন কেঁপে উঠল! মামা বললেন, ‘বুঝলি, আমার মাঝে ভয়ডর নেই। কিন্তু বাঘ বলে কথা, খিদে পেলে ও তো খেতে চাইবেই।’
টইটই কাঁপা গলায় বলল, ‘হুম, তা তো ঠিক। কিন্তু তুমি কী করলে, মামা?’
‘আমি আর কী করব। ছোটবেলায় পড়া একটা গল্প মাথায় এল।’
হইচই বলল, ‘কোন গল্পটা, মামা?’
‘ওই যে বাঁশের তৈরি বাড়িতে যে এক বুদ্ধিমতী মহিলা থাকতেন, সেই গল্পটা। যার বাড়িতে একদিন একটা বাঘ এসে হাজির! তার সামনে বাঘ তর্জন-গর্জন করল আর তিনি সাত রঙের ছাতা ফুটিয়ে ধরলেন বাঘের সামনে। রঙিন ছাতা দেখে বাঘ ভয়ে পালিয়ে গেল। বুঝলি, আমার কাছেও একটা ছাতা ছিল, কিন্তু আমি তা করলাম না। খালি খালি বাঘকে ভয় দেখিয়ে কী লাভ? বেচারার ক্ষুধা পেয়েছে, কিছু খেতে দিলেই হয়। যেই ভাবনা, সেই দুই টুকরো কেক ফেলে দিলাম বাঘের সামনে। অমনি সে চেটেপুটে খেয়ে নিল।’
টইটইয়ের চোখ বস্ফািরিত হয়ে গেল, যেন ও সত্যি সত্যি সুন্দরবনের সেই ভয়ংকর মুহূর্তটি দেখতে পেল, কণ্ঠের কাঁপুনিতে বিস্ময়! ‘—তারপর, মামা?’
মামা বললেন, ‘তারপর আবার কী, কেকটা খেয়ে বাঘটা চলে গেল।’
হইচইয়ের নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম, বলে, ‘চলে গেল?!’
মামা হাসতে হাসতে বললেন, ‘হ্যাঁ, চলে গেল, কেক খেয়েছে, এখন পানি খেতে হবে না? তাই পানি খেতে চলে গেল।’
টইটই আর হইচই কেমন হাঁ হয়ে গেল গল্প শুনে। তা দেখে মামা বেশ মজা পেলেন, তিনি জানালেন, ‘দুপুরে বাঘটা আবার এল। তখন আমরা শিকার করা মাছগুলোকে বারবি কিউ করে ফেলেছি। খাওয়াও শুরু করেছি মাত্র, অমনি বাঘ হাজির! দিলাম বাঘকে দুটো মাছ। বেচারা তো বেজায় খুশি। মাছ খেয়ে আবার চলে গেল পানি খেতে।’ টইটই আর হইচইয়ের মুখে বিস্ময়-বিমূঢ় ভঙ্গি জেগে থাকল। মামা বলে চললেন:
‘পরের দিনের কথা, আমরা চলে আসব। সবকিছু প্যাকিং করে নিচে নেমেছি। দূরের মনে হলো শব্দ হলো। এগিয়ে গিয়ে দেখি দূরের লম্বা লম্বা গোলপাতার ফাঁকে ডোরাকাটা গোল পানপাতার মতো মুখ। সেই বাঘটা দাঁড়িয়ে! কিছু দূর এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল, বেচারার চোখের কোল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে! আমারও ভীষণ কান্না পেল, আমাদের সঙ্গে বাড়তি কিছু পনির আর পাউরুটি ছিল, সেগুলো দিয়ে দিলাম ওকে। কিন্তু বাঘটা সেদিকে লক্ষও করল না। একদৃষ্টিতে আমাদের দিকে চেয়ে কাঁদতে লাগল। যতক্ষণ দৃষ্টির মধ্যে ছিল, বাঘটা একভাবে দাঁড়িয়েই কাঁদতে কাঁদতে আমাদের বিদায় জানাল।’
হইচই আর টইটই আর কোনো কথা বলতে পারল না। বাঘের মতো নির্বাক হয়ে কেবল ভাবছে, কী সাংঘাতিক কাণ্ডই না মামা ঘটিয়েছেন সুন্দরবনে! চোখের মধ্যে ভেসে উঠল বাঘের চোখের জল। আর মনের মাঝে শিরশিরে এক ভয়ের অনুভূতি।
রাতে শুয়ে শুয়েও তারা কেবল সেই কথায় ভাবছে। বাড়ির সবাই ঘুমিয়েছে। কিন্তু হইচই আর টইটইয়ের চোখে ঘুম নেই। তাদের যেন গল্পের ঘোর কিছুতেই কাটছে না। একটা গা শিরশিরের ভাব রয়ে গেছে, ফলে চোখ বন্ধ হতে চাইছে না। এমন সময় টইটইয়ের নতুন কুকুরছানা বান্টি ঘেউ করে ভয়ংকর এক চিৎকার দিল, মাঝেমধ্যেই বান্টি এমন চিৎকার করে। হয়তো কোনো মানুষের শব্দ বা ছায়া দেখতে পেয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি প্রতিদিনের মতো ছিল না। বান্টির চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে বাসায় কোথাও আরও জোরে কেউ চিৎকার দিয়ে উঠল। তারপর টানা চিঁ চিঁ একটা শব্দ হতে লাগল। সবাই উঠে খোঁজাখুঁজি শুরু করেছে। কিছুই পাওয়া গেল না। শেষ পর্যন্ত শব্দের উৎস যে গেস্টরুম, তা সবাই নিশ্চিত হলো। মামা সেখানে রয়েছেন, সবাই মিলে সেই রুমের কাছাকাছি যেতেই কটমট কটমট একটা শব্দ তীব্র হলো। ঘরে ঢুকে দেখে, মামা খাটের ওপর জড়সড় হয়ে বসে কাঁপছেন। কার্টুন টম অ্যান্ড জেরির টমের মতো মামার দুপাটি দাঁতে দাঁত লেগে কটকট শব্দ হচ্ছে! মা বললেন, ‘কি রে ট্যাবলেট, কী হয়েছে?’
মামা কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, ‘বুবু, বাঘ...বাঘ...।’
মা আশ্চর্য কণ্ঠে বলল, ‘বাঘ? এসব কী বলছিস?’
‘বুবু, কেবলই চিৎকার করছে...’
হইচই আর টইটই এতক্ষণে হাসিতে ফেটে পড়ল, ‘মামা...বাঘ নয়, ওটা তো বান্টি, আমাদের কুকুরছানা।’ সারা ঘরে একটা হাসির তুফান বয়ে গেল।
এই কাণ্ডকারখানার পর টইটই আর হইচই তাদের ট্যাবলেট মামার নতুন নামকরণ করল। কী নাম রেখেছিল, জানো? ট্যাবলেট মামা হয়ে গেল গুল হাসান!

No comments

Powered by Blogger.