সাক্ষাৎকার-পরনির্ভর অর্থনীতির পথে দেশ by অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ

দুর্বল রাজনৈতিক এবং গতিহীন প্রশাসনিক কাঠামো উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পণ্যের বাজার ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। উচ্চশিক্ষা চলে যাচ্ছে বিত্তবানদের হাতে। অব্যবস্থাপনার কারণে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। দেশে তৈরি হচ্ছে ব্যয়বহুল হাসপাতাল। শিক্ষার প্রসার ঘটলেও মান বাড়ছে না। দুর্নীতির কারণে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুফল পাচ্ছে না প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। পরনির্ভর অর্থনীতির পথে হাঁটছে


বাংলাদেশ। রাজনীতিতে যে সাংঘর্ষিক ধারা চলছে, তাতে শিল্প খাতে উন্নয়নের আশা করা যৌক্তিক নয়। বর্তমান সরকারের তিন বছরে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির এভাবেই মূল্যায়ন করলেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ফারজানা লাবনী।

অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বলেন, মানুষের আশা ছিল বর্তমান সরকার স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি, এ সরকার ক্ষমতায় এলে তাদের ভাগ্যের বিশেষ পরিবর্তন হবে। কিন্তু গত তিন বছরে আপেক্ষিকভাবে এসব মানুষের অবস্থান আগের চেয়েও নিচে নেমে গেছে। নানাভাবে হতাশা তৈরি হয়েছে মানুষের মধ্যে। আমাদের বিচারালয়, সংসদ যথাযথভাবে কার্যকর না হওয়ায় অনিশ্চয়তায় আছে তারা। কোথায় গেলে বিচার পাবে, স্বস্তি পাবে বা অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবে এগুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সাধারণ মহলে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পর্কে তিনি বলেন, যারা দেশ স্বাধীনের আগে, পরে বা যুদ্ধ চলাকালে অপরাধ করেছে তাদের বিচার এ দেশের মানুষ চায়। কিন্তু সরকারের গ্রহণ করা বিচার প্রক্রিয়ায় অনেকে মনে করে থাকতে পারে, এটা সাজানো নাটক। গত তিন বছরে আমাদের সুশাসনের বড় অভাব তৈরি হয়েছে। তা দিনে দিনে তীব্র হচ্ছে। সুশাসনের এ অভাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনীতি। এতে তৈরি হয়েছে সাংঘর্ষিক এক পরিস্থিতি। এ পরিস্থিতিতে শিল্পের বিকাশ আশা করা যৌক্তিক নয়।
মোজাফ্ফর আহমদ বলেন_'এ দেশের কৃষক-শ্রমিকরা ক্ষমতার আশেপাশে থাকেন না। ক্ষমতার পাশে যাঁরা থাকেন তাঁদের দলেও নেই তাঁরা। এসব মানুষ তখনই প্রতিবাদের ভূমিকায় নামেন যখন তাঁদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়। গত তিন বছরে মৌলিক পরিবর্তন তো আসেইনি, বরং সমাজে একটা বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। তাই কৃষক-শ্রমিকের মধ্যে ক্ষোভ দেখতে পাই।'
এ অর্থনীতিবিদের দৃষ্টিতে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে এ সরকার ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। এরা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে। কৃষককে ফসল মাঠে ফেলে রাখতে বাধ্য করছে এরা। শহরে পণ্য আসবে কী পরিমাণে তারাই নিয়ন্ত্রণ করে। শক্তিশালী ভোক্তা প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর আমাদের এখানে নেই। যদি শক্তিশালী ভোক্তা কণ্ঠস্বর আমাদের এখানে দেখতে পেতাম তবে দ্রব্যমূল্যের চাহিদা অনুযায়ী মূল্যেরও পরিবর্তন দেখতে পেতাম। সরকারও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হতো। যেহেতু ভোক্তারা বিভক্ত আর সরবরাহকারীরা সংযুক্ত, এখানে সরবরাহকারীর নির্দেশেই বাজার নিয়ন্ত্রণ হয়ে থাকে। আর এসব সরবরাহকারীর সঙ্গে সরকারের সব মহলের সংযোগ আছে। তাই সরকার এদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। সরকার বরং ব্যবসায়ীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি খাতে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা কমে গেছে। দ্রুত ধনী হওয়ার ইচ্ছা বেড়েছে। তাই বেসরকারি খাত নানা রকমের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। স্বাভাবিক ব্যবসার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি সরকার।
অধ্যাপক মোজাফ্ফর বলেন, গণতান্ত্রিক রাজনীতির কারণে গণতান্ত্রিক অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের দেশের কিছু মানুষ অতি ধনী হয়ে যাচ্ছে, কিছু মানুষ দরিদ্র ও আপেক্ষিক দারিদ্র্যে ভুগছে।
গত তিন বছরে শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, 'সরকারের নেওয়া পলিসিতে শিক্ষার বিস্তার হয়েছে। তবে মান ধরে রাখতে পারা যায়নি। ধনবানদের হাতে উচ্চ শিক্ষা কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। একমাত্র যাদের বিত্ত আছে তাদের ছেলেরা বিদেশে ভালো করছে। আর যাদের বিত্ত নেই কিন্তু মেধা আছে তাদের মেধা বিকাশের ব্যবস্থা রাষ্ট্র গত তিন বছরেও করতে পারেনি।'
যথাযথ নীতির অভাবে গত তিন বছরে গতানুগতিক ধারা থেকে দেশের স্বাস্থ্যসেবা বের হয়ে আসতে পারেনি বলে মনে করেন অধ্যাপক মোজাফ্ফর। তাঁর মতে, অনেক খরচ হয় এমন হাসপাতাল তৈরিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এসব হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ছে। সাধারণ মানুষের জন্য কম খরচে সুস্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা নেই। সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে পেঁৗছাতে পারছে না নানা অব্যবস্থাপনার কারণে। তাই আমাদের এখানে জীবনের আয়ু বাড়লেও অপুষ্টির হার বেড়েছে অনেক। রোগ নির্ণয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসেনি। স্বাস্থ্য খাতের যাঁরা নেতা তাঁরা শহরকেন্দ্রিক এবং বিশেষায়িত চিকিৎসায় বিশ্বাস করে। সাধারণ মানুষের জন্য যে জেনারেল ফিজিশিয়ানের দরকার তা এ দেশ থেকে প্রায় দূর হয়ে গেছে।
শিল্প খাত সম্পর্কে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, গত তিন বছরে ব্যাংক খাতের ঋণ বিবেচনায় দেখা যায়, বর্তমান সরকার বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। কিন্তু বাণিজ্যের সঙ্গে শিল্পের যোগাযোগ ঘটাতে সক্ষম হয়নি। জাহাজ নির্মাণ শিল্প বা জাহাজভাঙা শিল্প আজকে যে অবস্থায় উঠছে তাতে আহ্লাদিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। অন্যের প্রযুক্তি নিয়ে আজকে আমরা চলছি। এ দেশে আকরিক লোহা নেই বা ইস্পাত শিল্প সমৃদ্ধ নয়। তাই জাহাজ নির্মাণ বা জাহাজভাঙা শিল্পকে শিল্পের মর্যাদা দেওয়ার পক্ষে নন তিনি।
ওষুধ শিল্পে অর্জিত সাফল্যও হুমকির মুখে বলে মনে করেন অধ্যাপক মোজাফ্ফর। 'অন্য দেশ থেকে কাঁচামাল আনছি, বোতলজাত করছি আর ট্যাবলেট বানাচ্ছি। এতে লাভ হচ্ছে কী! ভ্যালু অ্যাডিশন কত সেটাই প্রশ্ন।'
এখনো এ দেশের সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে পাট, চামড়া, হালকা শিল্প এবং বস্ত্র খাতকে বিবেচনা করে তিনি বলেন, এসব খাতে বর্তমান সরকার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পেঁৗছায়নি।
তিনি বলেন, 'গত তিন বছরে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে অনেক খাতে। কিন্তু তার সঠিক ব্যবহার হয়েছে কিনা তার যথার্থ মূল্যায়ন হয়নি। প্রণোদনা দিলে বা বন্ধ কারখানা চালু করলেই একটি শিল্প দাঁড়িয়ে যায় না। বরং শিল্প খাতটি কতটা সক্ষমতা অর্জন করেছে তা বিবেচ্য বিষয়। সে বিবেচনায় আশানুরূপ সাফল্য আসেনি সরকারি-বেসরকারি কল-কারখানায়।'
রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল করার চেষ্টা থাকলেও যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে তা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন। বেসরকারি খাতের কল-কারখানা পরিচালনায়ও সুনির্দিষ্ট কোনো দর্শন আছে বলে মনে হয় না। ফলে দেশে গড়ে উঠেছে পরনির্ভরশীল অর্থনীতি। এতে স্থায়ী সুফল আসে না।
দেশে শিল্পায়নের গতির সঙ্গে সাধারণ অর্থনীতির তত্ত্বের যোগাযোগ খুব একটা দেখতে পান না অধ্যাপক মোজাফ্ফর। শিল্প খাতে যাঁরা বিনিয়োগে আসছেন বা রয়েছেন তাঁদের মধ্যে বাণিজ্যিক মনোভাব লক্ষণীয়। বর্তমান সরকারের নেওয়া পদক্ষেপে শিল্পের জন্য যে ঝুঁকি প্রয়োজন তা নিতে উদ্যোক্তারা সাহস হারাচ্ছেন। সারা বিশ্বে শিল্পোন্নয়নে গবেষণার কদর বাড়লেও তা আমাদের দেশে দেখা যাচ্ছে না। আবার জীবনের জন্য যে আয় বৃদ্ধি হওয়া উচিত ছিল সে ক্ষেত্রেও যথাযথ বিকাশ দেখতে পাই না। আমরা নানাভাবে পশ্চিমা ধ্যানধারণায় উজ্জীবিত হই, কিন্তু আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি সুসংহত করতে গত তিন বছরে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে মনে করেন মোজাফ্ফর আহমদ।
তিনি আরো বলেন, 'গত তিন বছরে দরিদ্রবান্ধব সামাজিক নিরাপত্তাকে বিস্তৃত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে আমাদের দুর্নীতির কারণে সে সাফল্য সাবলীলভাবে আসতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে যে জাতীয় মনিটরিং ব্যবস্থা থাকা দরকার তা গড়ে তুলতে পারেনি বর্তমান সরকার।'
সামাজিক পুঁজি সৃষ্টির ক্ষেত্রেও কোনো সফলতা দেখতে পাননি অধ্যাপক মোজাফ্ফর। তিনি বলেন, 'আমাদের যে সামাজিক পুঁজি ছিল সেগুলোও গত তিন বছরে বিনষ্ট হয়ে গেছে। যে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষ নির্ভর করত সেগুলোও অতীতের তুলনায় নড়বড়ে হয়ে গেছে।'

No comments

Powered by Blogger.