রাজনীতি-ছায়া সরকারের ভূমিকা পালনে ব্যর্থ বিএনপি by আবদুল্লাহ আল ফারুক

দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি পুরো শক্তি নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি গত তিন বছরেও। ওয়ান-ইলেভেনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর মাত্র ৩০টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে যাত্রা শুরু করে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। সেই যাত্রাপথে বারবারই হোঁচট খেতে হয়েছে। ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার, সাংগঠনিক শক্তি ফিরিয়ে আনা এবং নানা ইস্যুতে মাঠের আন্দোলন থেকে শুরু করে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও অনেকটা অসহায়ত্ব


ফুটে উঠেছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কঠোর মনোভাবের কাছে এই অসহায়ত্ব আরো পরিস্ফুটিত হয়েছে। রাজনৈতিক সঙ্গী হিসেবে জামায়াত বা ইসলামী ঐক্যজোটকেও তেমনভাবে পাচ্ছে না। ফলে এই অসহায়ত্ব বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি আইন জারি করার পর রাজনীতিকরা একের পর এক গ্রেপ্তার হতে থাকেন। আত্মগোপনে চলে যান অনেকে। বাকি নেতারা জরুরি আইনের সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে 'সংস্কারপন্থী' বনে যান। এর সবটাতেই বিএনপি ছিল অগ্রগামী। দলের নেতা খালেদা জিয়া, দুই ছেলে তারেক ও আরাফাত, ভাই শামীম, ভাগ্নে ডিউকসহ বহু নেতা গ্রেপ্তার হন। হারিছ চৌধুরী, শাহজাহান ওমর ও জিয়াউল হক জিয়াসহ অনেক নেতা দেশ-বিদেশে আত্মগোপন করেন। প্রচারমাধ্যমে যত খবর প্রকাশিত হয় তার বেশির ভাগ ছিল বিএনপির বিরুদ্ধে। চারদলীয় জোটের প্রধান শরিক জামায়াতে ইসলামী ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের সঙ্গে গোপনে হাত মেলায় এবং বিএনপির কাছ থেকে কিছুটা দূরে সরে যায়। কথাবার্তায় এমন ভাব প্রকাশ করে যে, ক্ষমতায় থাকতে যা কিছু দুর্নীতি বিএনপি করেছে, জামায়াত এর সঙ্গে ছিল না। অসহায় বিএনপি ২০০৮ সালের নির্বাচনেও আসতে রাজি ছিল না। তাদের নির্বাচনে নিয়ে আসার পেছনে এই জামায়াতই বড় ভূমিকা রেখেছে। যুক্তি এই ছিল, আওয়ামী লীগ এলেও ক্ষমতা থেকে সেনাবাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিদায় তাদের জন্য বেশি জরুরি।
কিন্তু সুদিন আসেনি। প্রতি মুহূর্তে পোহাতে হচ্ছে মামলার ঝামেলা। সংসদে ৩০ সদস্য নিয়ে শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করা সম্ভব হচ্ছে না। গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থায় বিরোধী দলকে ছায়া সরকারের ভূমিকা পালন করতে হয়। সেই ভূমিকা পালনেও ব্যর্থ বিএনপি। অভিজ্ঞ সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী যুদ্ধাপরাধের দায়ে কারাবন্দি। ফলে স্থায়ীভাবেই সংসদ বর্জনের পথে যেতে বাধ্য হয়েছে। সংসদের বাইরে এসে রাজপথেও দাঁড়াতে পারছে না। দলের মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ারের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র নেতাকে দায়িত্ব প্রদান করা হলেও এ নিয়ে দলে ক্ষোভ-বিক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। দলের মধ্যে সংস্কারপন্থীদের দুর্বল অবস্থান, লন্ডন থেকে একটি গ্রুপের নেতাদের 'প্রমোট' করায় দ্বন্দ্ব-কোন্দল বেড়ে যাচ্ছে। জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব তিন বছরের মাথায় ঘুচে গেলেও সেই জামায়াতকে পাওয়া যাচ্ছে না। বিএনপির সঙ্গে মিশে কখনো কখনো মাঠে থাকলেও জামায়াত তাদের সুবিধামতো কাজটিই করছে, যা বিএনপির জন্য ক্ষতিরও কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সর্বশেষ গত ১৮ ডিসেম্বর রাজধানীতে যে তাণ্ডব চালানো হয়েছে তার সঙ্গেও জামায়াত ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলে বিএনপি মনে করছে এবং এ কাজটি বিএনপির জন্য অনেক ক্ষতি ডেকে এনেছে।
যুদ্ধাপরাধের বিচারের মুখোমুখি জামায়াতের শীর্ষ নেতারা। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য আটক দ্বিতীয় সারির কয়েক নেতা। নেতৃত্বশূন্য জামায়াত বিএনপিকে আন্দোলনের মাঠে তেমন সঙ্গ দিতে পারছে না। মুফতি ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্যজোট চারদলীয় জোটের শরিক হলেও জোটগত কার্যক্রম তাঁদের নেই বললেই চলে। বাকি যাঁরা সমমনা দল তাদের ভিত অনেক দুর্বল। ফলে বিএনপি অনেকটা একাকী হয়ে পড়েছে। আন্দোলনে তাদের সঙ্গে পাচ্ছে না। দলের নেতা-কর্মীরাও মামলা এবং পুলিশের ভয়ে মাঠে নামতে সাহস পাচ্ছেন না। রাজধানী ঢাকার প্রধান দুই নেতা মির্জা আব্বাস ও সাদেক হোসেন খোকা দুজন দুই মেরুতে। কর্মীরা দ্বিধাবিভক্ত। প্রধান শক্তি ছাত্রদল ও যুবদল অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। দুটি সংগঠনেরই নেতৃত্ব পর্যায়ে চরম দ্বন্দ্ব-কোন্দল বিরাজ করছে। আন্দোলনে তাঁরাও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারেন না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল, খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ, জ্বালানি তেল ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, গুপ্তহত্যা ইত্যাদি বড় বড় ইস্যুতেও বিএনপি ঘরে ফসল তুলতে পারেনি। হরতাল, রোডমার্চ, জনসভা, গণ-অবস্থান, গণমিছিল, বিক্ষোভ-সমাবেশ, পথসভা ও মানববন্ধনের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সে চেষ্টা ছিল অনেক দুর্বল। আবার কখনো কখনো ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেনি। ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারা, কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি এবং কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগসহ ছোট দলগুলোকে কাছে টেনে শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু রাজপথের শক্তি বাড়েনি। এভাবেই তিনটি বছর পার করেছে।
বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান এখন দলের 'সেকেন্ডম্যান'। কিন্তু তিনি লন্ডনে অবস্থান করায় দল অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সবকিছু সামলাতে হচ্ছে বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়াকেই। খালেদা জিয়া নিজেও একাকী জীবন কাটান। দুই ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতনিরা দেশের বাইরে অবস্থান করছে। এই মানসিক অবস্থা নিয়েও তাঁকে দল পরিচালনা করতে হচ্ছে। আবার অনেক নেতা তারেক রহমানের 'নাম ভাঙিয়ে' নিজেদের স্বার্থরক্ষা করছেন বলেও অভিযোগ আছে। তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারবেন কি না, পারলে কবে নাগাদ আসতে পারবেন, তা ভেবে অনেকে হতাশ। তবে এ মুহূর্তে নেতারা ব্যস্ত তারেক রহমানের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে। বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে তারেক রহমানের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার ছাড়া কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন নেতারা।
দলের কয়েকজন নেতা কালের কণ্ঠকে বলেছেন, আন্দোলনের চেয়ে বিএনপির বড় 'প্লাস পয়েন্ট' হচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যর্থতা। সরকার যত ব্যর্থ হবে বিএনপি ততই লাভবান হবে। আওয়ামী লীগের যত 'মাইনাস' হবে বিএনপি তত 'প্লাস' হবে। সেটি অনেকটাই স্পষ্ট। সুতরাং মাঠের আন্দোলন জমাতে না পারলেও বিএনপিকে সফল করে দেবে আওয়ামী লীগ সরকার।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, 'গত তিন বছরে বর্তমান সরকার দেশ পরিচালনায় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু সরকার গঠনের পরই সরকারকে সহযোগিতা করতে চেয়েছি। কিন্তু আমাদের সহযোগিতা নেয়নি, আলোচনাও করেনি। তাই সরকারের তিন বছরে সংসদে ও সংসদের বাইরে কোথাও কোনো অর্জন দেখাতে পারেনি। এ অবস্থায় জনগণের দাবি নিয়ে আমরা আন্দোলন করছি। জনগণ আমাদের দাবির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, এটাও একটা সফলতা। সংসদে আমাদের কথা বলতে দেয়নি সরকার। মাঠে ময়দানে সভা-সমাবেশ, মিছিলে বাধা দিয়েছে। পুলিশ দিয়ে দলীয় কার্যালয় অবরুদ্ধ করে রেখেছে। এতকিছুর মধ্য দিয়ে বিভিন্ন বিভাগ অভিমুখে বিএনপির রোডমার্চ ও জনসভা সফল হয়েছে। রোডমার্চের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করে মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। দলের সাংগঠনিক জেলা কমিটি গঠনের মাধ্যমে দলকে শক্তিশালী করা হয়েছে। সব মিলিয়ে তিন বছরে পুরোপুরি সফল হয়েছে।' অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'আওয়ামী লীগের সবক্ষেত্রে ব্যর্থতার ফল এখনই পাওয়া যাবে না। দেশে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে জনগণ এর জবাব দেবে।'
দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকারের কোনো সফলতা নেই। সব খাতেই ব্যর্থতায় পরিপূর্ণ। সবচেয়ে বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে সরকার। তিনি বলেন, 'আমরা জনগণের দাবি নিয়ে আন্দোলন করি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবি শুধু বিএনপির নয়, সারা দেশের মানুষের দাবি। সারা দেশের মানুষকে আমরা এ দাবিতে ঐক্যবদ্ধ করতে পারছি_এটা একটা বড় অর্জন এবং বিএনপির সফলতা বলে মনে করি আমরা। সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের মাইক বন্ধ করে দেওয়া হয়। শতাধিক নোটিশ দিলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। দেশবাসী তা ভালো করে জানে, এখানে বিরোধী দলের লাভক্ষতি বলে কোনো কথা নেই। কারণ আমরা সংসদ বর্জন করিনি। সরকারই চায় না, বিরোধী দল সংসদে যোগ দিক। সরকার সংসদ অকার্যকর করে রেখেছে।'

No comments

Powered by Blogger.