সরকারের ৩ বছর: স্বাস্থ্য খাত-কোনো নীতিই চূড়ান্ত হয়নি by শিশির মোড়ল

তিন বছর পার করলেও সরকার স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও ওষুধ—এই তিনটি নীতি চূড়ান্ত করতে পারেনি। এই সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে ৪৫ হাজার পদে নিয়োগ হয়েছে। কিন্তু এই নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়ে অনিয়ম-দলীয়করণের অভিযোগ উঠেছে।
আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছিল, ‘জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি পুনর্মূল্যায়ন করে যুগের চাহিদা অনুযায়ী নবায়ন করা হবে।’ ইশতেহারে জনসংখ্যা নীতি ও ওষুধনীতি যুগোপযোগী করার প্রতিশ্রুতিও ছিল।


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহ-উপাচার্য অধ্যাপক রশিদ-ই-মাহবুব প্রথম আলোকে বলেন, ক্ষমতায় আসার আগে তারা স্বাস্থ্য খাত দুর্নীতিমুক্ত ও অব্যবস্থাপনা দূর করার কথা বলেছিল, কিন্তু তা হয়নি। তবে মন্ত্রণালয়ের সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, স্নাতকোত্তর চিকিৎসা-শিক্ষার ক্ষেত্রে যে অনিয়ম চলছিল, তা এখন বন্ধ হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক বলেন, ক্ষমতায় এসে স্বাস্থ্য খাতে মৌলিক কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা গত ৪০-৫০ বছরে হয়নি। তবে দরিদ্রদের স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, তা পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, ১১ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করা এবং প্রায় ৪৫ হাজার কর্মী নিয়োগ এই মন্ত্রণালয়ের বড় সাফল্য।
নীতি হয়নি: ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, তিন মাসের মধ্যে স্বাস্থ্যনীতি চূড়ান্ত করা হবে। কিন্তু তা করা হয়নি। কয়েক মাস আগে স্বাস্থ্যনীতি মন্ত্রিপরিষদ সভায় উত্থাপন করা হয়। মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, ওই সভায় প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্যনীতির ব্যাপারে কিছু পর্যবেক্ষণের কথা বলেছিলেন। তা অন্তর্ভুক্ত করে স্বাস্থ্যনীতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্যনীতি এখন শুধু সংসদে তোলার অপেক্ষায়।
জনসংখ্যার নীতি যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর একাধিক সভা ও কর্মশালা করেছে। কিন্তু ওষুধনীতি নিয়ে এখনো কিছু হয়েছে বলে শোনা যায়নি। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, নীতিগুলো খুব শিগগির চূড়ান্ত করা হবে।
নিয়োগ হয়েছে, দুর্নীতিও হয়েছে: স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসক, নার্স, চিকিৎসা সহকারী, কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার পদে প্রায় ৪৫ হাজার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) মাধ্যমে প্রায় এক হাজার চিকিৎসককে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
এসব নিয়োগ-পদোন্নতিতে দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্পে সাড়ে ১৩ হাজার কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার নিয়োগ দেওয়ার কথা। ইতিমধ্যে ১২ হাজার ৭৪১ জন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রথম আলোর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থক বা দলটির সমর্থক পরিবারের সদস্যরা বেশি চাকরি পেয়েছেন।
সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর পুলিশ ওই ব্যক্তি সম্পর্কে তথ্য যাচাই করে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পুলিশ তথ্য যাচাইয়ের পর তার চাকরি নিশ্চিত হয়েছে। পছন্দের লোক নিয়োগের জন্য এটা করা হয়েছে বলে অভিযোগ আছে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে নিয়োগের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়নি এমন ব্যক্তিরা চাকরি পেয়েছেন। তবে দুর্নীতির বেশি অভিযোগ ওঠে বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) মাধ্যমে ২০১০ সালে প্রায় এক হাজার চিকিৎসকের পদোন্নতি দেওয়ার পর। এ ক্ষেত্রে যোগ্যদের বাদ দিয়ে দলীয় ও প্রকল্পের চিকিৎসকদের পদোন্নতি দেওয়া হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এম এ সবুর বলেন, জোট সরকারের দলীয়করণের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন আওয়ামী লীগ-সমর্থক চিকিৎসকেরা। কিন্তু তাঁরাও এখন একই কাজ করলেন। তিনি বলেন, সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে পদোন্নতি ছিল সাংবিধানিক ব্যবস্থা। ডিপিসির মাধ্যমে পদোন্নতি দিয়ে বর্তমান সরকার স্বাস্থ্যব্যবস্থায় স্থায়ী ক্ষতি করেছে। এর সুদূরপ্রসারী খারাপ প্রভাব পড়বে স্বাস্থ্য খাতে।
নিয়োগ-পদোন্নতিতে ব্যাপক দুর্নীতি হওয়ার অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করেছেন রুহুল হক। তিনি বলেন, পুরো বিষয়টি দেশের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বিচার করতে হবে।
গ্রামে চিকিৎসক থাকছেন না: ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে ও উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক-সংকট দূর করার জন্য মন্ত্রণালয় অস্থায়ী ভিত্তিতে (অ্যাডহক) চার হাজার ১৩৩ জন চিকিৎসক নিয়োগ দেয়। নিয়োগ পাওয়ার পরই আওয়ামী লীগ-সমর্থক চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) নেতাদের তদবিরে বড় শহর, বিশেষ করে ঢাকায় চলে আসেন এসব চিকিৎসকের অনেকেই। একাধিক সভায় প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসকদের সতর্ক করেছেন, নিজ নিজ কর্মস্থলে থাকার নির্দেশও দিয়েছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি।
তবে স্বাস্থ্য খাতে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আছে, এমন দাবি করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
মৌলিক উদ্যোগ ও সাফল্য: তিন বছরের অগ্রগতি সম্পর্কে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, কিছু মৌলিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ওষুধ চুরি ও সরকারি হাসপাতালের আশপাশের দোকানে তা বিক্রি হতো। ওষুধের লাল-সবুজ মোড়ক ব্যবহারের পর এটা বন্ধ হয়েছে। এই মোড়ক সহজে চেনা যায় বলে দোকানিরা আর সরকারি ওষুধ রাখছেন না।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনতে সরকার স্বাস্থ্য বিমার ধরনে অর্থায়নের উপায় খুঁজছে। এটা এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। তবে কাজ শুরু হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, অনিয়ম-দুর্নীতি, দুর্ভোগের আরেকটি জায়গা ক্রয় খাত। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের হাতে হাসপাতাল অনেক সময় জিম্মি হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে দীর্ঘ মেয়াদে রূপরেখা চুক্তি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয় থেকে তিন বছরের সাফল্যের যে চিত্র দেওয়া হয়েছে তাতে বলা আছে, বর্তমানে ১১ হাজার ২৬২টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু আছে। ক্লিনিকগুলোতে ৩০ ধরনের ওষুধ দেওয়া হয়। গত তিন বছরে এই ক্লিনিকগুলোতে প্রায় ছয় কোটি মানুষ সেবা পেয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ১২ জেলায় ১২টি নার্সিং ইনস্টিটিউট এবং চারটি সরকারি ও চারটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের কার্যক্রম চালু করা, তিনটি সরকারি ও চারটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া, সাতটি সরকারি হাসপাতালে ৫০ আসনবিশিষ্ট নতুন ডেন্টাল ইউনিট চালু করা, উপজেলা-জেলা পর্যায়ে ২৫০টি অ্যাম্বুলেন্স এবং পানিবেষ্টিত এলাকায় ১০টি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহ করা, ৪৮২টি হাসপাতালে মুঠোফোনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা চালু করা সরকারের অন্যতম সাফল্য।
রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে ব্যাপক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ বহুদিনের। এর কোনো সুরাহা না করে সরকারও নতুন নতুন মেডিকেল কলেজের অনুমতি দিচ্ছে। এটা দক্ষ জনসম্পদ ও মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবার জন্য হুমকি।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন) এস এম আশরাফুল ইসলাম বলেন, মাতৃস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্য খাতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার—এসব বিষয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে, পুরস্কারও পেয়েছে। এটা সাফল্যের ইঙ্গিত বহন করে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী রুহুল হক বলেন, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চিকিৎসকদের নিবন্ধনকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) অকার্যকর ছিল। সরকার আইন পরিবর্তন ও নতুন কাউন্সিল তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি সচল করেছে। এটাও বড় সাফল্য।

No comments

Powered by Blogger.