পররাষ্ট্র-সফরে সফরে ঘুরপাক খেয়েছে কূটনীতি by মেহেদী হাসান

কলের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়'_নীতির আলোকে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করার কথা নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছিল আওয়ামী লীগ। সরকার গঠনের পর গত তিন বছরে প্রতিবেশী ভারতসহ অন্য দেশগুলোর প্রতি বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধুত্বের হাত বাড়ানো হয়েছিল। বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আগের চেয়ে উজ্জ্বল করার মতো বড় প্রাপ্তি যেমন আছে, তেমনি আছে শত চেষ্টার পরও তিস্তার পানিবণ্টনের মতো বহুল প্রত্যাশিত চুক্তি না হওয়ার অপ্রাপ্তিও।


গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অপসারণ এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ইস্যুতে অন্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিদের কাছে বাংলাদেশকে রীতিমতো ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনির শতাধিকবার বিদেশ সফর নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা হলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সফরগুলো বহুমাত্রিক কূটনৈতিক তৎপরতারই অংশ।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, বর্তমান সরকার নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থেকে আবার সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরেছে। ফলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার অনুকূল এক আবহ নিয়েই বর্তমান সরকার দায়িত্ব পালন শুরু করেছিল। বাংলাদেশ জোর দিয়ে বলতে পেরেছে, সরকার জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দেয়নি, দমন করেছে। এ ছাড়া সন্ত্রাসবিরোধী উদ্যোগও জোরদার করেছে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাহবা পেয়েছে নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের। দেশটির বিচ্ছিন্নতাবাদী অনেক নেতাই আদালতে বলেছেন, এ দেশে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁদের ভারতের কাছে তুলে দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান সরকার দেশে ভারতবিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দেয়নি, বরং তাদের দমন করার মধ্য দিয়ে সরকার বড় ঝুঁকি নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সন্ত্রাস দমনে দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক টাস্কফোর্স গঠিত না হলেও বৃহৎ পরিসরে সন্ত্রাস দমনে সহযোগিতার বিষয়ে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের পররাষ্ট্রনীতি অংশের শুরুতেই বলা হয়েছিল, বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশ তার ক্ষমতা অনুযায়ী বিশ্বশান্তি রক্ষায় প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি সৈন্য প্রেরণকারী দেশ হিসেবে অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। গত বছর জাতিসংঘের ৬৬তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার 'জনগণের ক্ষমতায়ন' শীর্ষক শান্তির মডেল প্রস্তাবনা আকারে চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ বর্তমান দশকজুড়ে সাধারণ পরিষদে প্রস্তাবনাটি উত্থাপন করতে পারবে এবং জাতিসংঘের সমর্থন নিয়ে ১৯৪টি সদস্য রাষ্ট্রে প্রস্তাবনাটি বাস্তবায়নের পক্ষে অগ্রগামী কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করতে পারবে।
রাষ্ট্রের সুস্পষ্ট পররাষ্ট্র নীতি থাকার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন বিশ্লেষকরা। গত বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের আগে সাবেক কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বারবার বলেছেন, সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে বৈদেশিক সম্পর্ক সুস্পষ্টভাবে কোনো দেশের দিকে ঝুঁকে যাওয়া ভালো নয়। দেশওয়ারি রাষ্ট্রের নিজস্ব সুদূরপ্রসারী পররাষ্ট্রনীতি থাকা উচিত, যাতে সরকার বদল হলেও পরবর্তী সরকার রাষ্ট্রের লক্ষ্য অর্জনের পথে থাকে। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খান অবশ্য বলেছেন, 'সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়' নীতি যুক্তিসংগত নয়। কারণ এ যুগের কূটনীতিতে কেউ সারা জীবনের বন্ধু বা সারা জীবনের শত্রু নয়।
গত তিন বছরে ওই দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ অত্যন্ত উদার ও বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে ওই দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসেছে। ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক ভারত সফরে ঘোষিত যৌথ ইশতেহার দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে রূপরেখা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়ের আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়নে বাদ সেধেছে আমলাতন্ত্র। ২০১১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর নিয়ে প্রত্যাশা তুঙ্গে উঠলেও তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি না হওয়ায় রীতিমতো হতাশ হয়েছে এ দেশের মানুষ। স্বাক্ষরিত স্থল সীমান্ত চুক্তির প্রটোকল গুরুত্ব বিবেচনায় ঐতিহাসিক হলেও ভারতের পার্লামেন্টে তা কবে অনুমোদন করবে সে বিষয়ে কোনো ধারণা নেই সংশ্লিষ্ট মহলের। তবে ভারতের সঙ্গে ভবিষ্যতে বহুমাত্রিক সহযোগিতার লক্ষে একটি রূপরেখা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় পাশাপাশি আঞ্চলিক অন্যান্য রাষ্ট্রেরও সম্পৃক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিন বিঘা করিডর সার্বক্ষণিক খুলে দেওয়ার ফলে ছিটমহলবাসীর বন্দিদশার অবসান হয়েছে।
তবে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আশ্বাস সত্ত্বেও গত তিন বছরে 'আত্মরক্ষার্থে' ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর গুলিতে নিহতের সংখ্যাও কম নয়। বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রেই সীমান্তে হতাহতের ঘটনার জোরালো প্রতিবাদ করতে পারে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
টিপাইমুখ বাঁধ ইস্যুতে বাংলাদেশকে না জানিয়ে ভারতের চুক্তি স্বাক্ষরে হতাশ হয়েছে বাংলাদেশ। ওই বাঁধ বাস্তবায়নের আগে যৌথ সমীক্ষা চালানোর আহ্বান জানালেও কূটনৈতিক চ্যানেলে ভারত এখনো সুস্পষ্ট ইতিবাচক সাড়া দেয়নি।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে ঘিরে পেশাদার কূটনীতিকদের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর দুই উপদেষ্টাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। গত বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের সফরের আগে বিভিন্ন ইস্যুতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যখন ছিল দৃশ্যত নীরব, তখন গণমাধ্যমে রীতিমতো সরব ছিলেন ওই দুই উপদেষ্টা। পররাষ্ট্রসচিব মোহাম্মদ মিজারুল কায়েসকে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছেন, 'পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আসলে কে চালান?' পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনিই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চালান বলে মিজারুল কায়েস উত্তর দিলেও পেশাদার কূটনীতিকদের বাইরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের দিলি্লতে যাওয়া-আসা বিভিন্ন সময় বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। অনলাইনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম উইকিলিকসের ফাঁস করা নথিতেও দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর দিলি্ল সফরের আগেই তাঁর একজন উপদেষ্টা ঢাকায় তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতকে সম্ভাব্য চুক্তিগুলো সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন। অথচ বিষয়টি রাষ্ট্রের অত্যন্ত গোপন বিষয়। ফাঁস হওয়া নথিতে আরো দেখা গেছে, ওই উপদেষ্টা বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দূরদর্শিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
পররাষ্ট্রসচিব মোহাম্মদ মিজারুল কায়েস বলেছেন, বিদেশে বর্তমান বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ সরকারের ইতিবাচক ভাবমূর্তির কারণেই এ দেশের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা বেড়েছে।
নির্বাচনী ইশতেহারে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও কানাডাসহ উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগিতার সম্পর্ক জোরদার ও ব্যাপকভাবে বিস্তৃত করার কথা বলেছিল আওয়ামী লীগ। এ ছাড়া রাশিয়া, চীন এবং আশিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক সুদৃঢ় করা এবং অস্ট্রেলিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর এলাকার সঙ্গে অধিকতর যোগাযোগ ও নিবিড় সম্পর্ক স্থাপনে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছিল দলটি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য, নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন এবং বিনিয়োগ প্রভৃতি বিষয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হয়েছে। গত বছরের যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনির বৈঠকটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মন্ত্রণালয় আরো জানায়, ৫৪ বছর পর ক্ষমতায় আসা 'ডেমক্রেটিক পার্টি অব জাপানের' সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি হয়েছে। শেখ হাসিনার টোকিও সফরে জাপান সরকার পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য অতিরিক্ত ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রদানের অঙ্গীকার করেছে। এ ছাড়া বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পদ্মা সেতু নির্মাণে জাপান ৪১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা প্রদান করার জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। কানাডার সঙ্গেও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরো নিবিড় করতে সরকার বিশেষভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্য গত বছর ১৬০ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা ২০০৫ সালের দ্বিগুণ। তবে অব্যাহত কূটনৈতিক প্রয়াস সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি নূর চৌধুরীকে ফেরত দিতে বাংলাদেশের অনুরোধের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্তের কথা জানায়নি কানাডা।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিলিস্তিনের পক্ষে বাংলাদেশ সরব ভূমিকা পালন করছে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে স্থল সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে সরকার যেমন উদ্যোগ নিয়েছে, তেমনি সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তিতে সমুদ্র আইনবিষয়ক আন্তর্জাতিক আদালত ও স্থায়ী সালিস ট্রাইব্যুনালে গিয়ে শুনানিতে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ।
গত তিন বছরে ভুটানের রাজা, তুরস্ক, শ্রীলঙ্কা ও জার্মানির প্রেসিডেন্ট, ভারত ও চীনের উপরাষ্ট্রপতি, ভারত ও ভুটানের প্রধানমন্ত্রী, জাতিসংঘ মহাসচিবের ঢাকা সফরে দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ইতিবাচক আবহ সৃষ্টি হয়েছে।

No comments

Powered by Blogger.