এ সপ্তাহের সাক্ষাকার-প্রণোদনা চাই না চাই নীতি-সহায়তা

দেশে হালকা প্রকৌশল খাতে বিনিয়োগ ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা। আছে ৪০ হাজার ছোট-বড় কারখানা। এর বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রাজ্জাক প্রথম আলো: হালকা প্রকৌশল খাতে বিনিয়োগ ও উপাদনের বর্তমান অবস্থাটা কী? আবদুর রাজ্জাক: সারা দেশে হালকা প্রকৌশল খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা হবে। এ খাতে ব্যক্তিগত বিনিয়োগ ছোট।


সর্বনিম্ন পাঁচ লাখ থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়। সারা দেশে ৪০ হাজারের মতো ক্ষুদ্র কারখানা রয়েছে। অবশ্য এর ৯০ শতাংশই মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত। সেচ পাম্প, ধান মাড়াইসহ অধিকাংশ কৃষিযন্ত্রই এখন দেশে তৈরি হচ্ছে। চা রোপণ ও প্রক্রিয়াকরণের ৯০ শতাংশ যন্ত্রই এখন দেশে তৈরি হয়। এগুলো ব্যবহূতও হচ্ছে। আগে এসব যন্ত্রপাতির পুরোটাই আমদানি করতে হতো। দক্ষিণাঞ্চলের সমুদ্র অঞ্চলের মাছ ধরার ট্রলারের ৯০ শতাংশ যন্ত্রও এখন দেশে তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে দেশের হালকা প্রকৌশল খাতের বাজার প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার। এর ৩০ শতাংশ মেটায় দেশে তৈরি পণ্য। বাকি চাহিদা মেটাতে আমদানি করতে হয়। তবে আমরাই চাহিদার ৮০ শতাংশ পূরণ করতে পারতাম, যদি আমাদের প্রযুক্তিগত উকর্ষতা থাকত। অন্যান্য দেশে হালকা প্রকৌশল খাতে যেখানে পঞ্চম প্রজন্মের প্রযুক্তি ব্যবহূত হচ্ছে, সেখানে আমরা পড়ে আছি দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রযুক্তিতে। যেমন, প্রযুক্তির অভাবে গাড়ির ইঞ্জিনের কোনো যন্ত্রাংশই দেশে তৈরি হয় না। অথচ আমরা ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশের ৮০ শতাংশ স্থানীয়ভাবেই তৈরি করতে পারতাম।
প্রথম আলো: শিল্পমন্ত্রী বলেছেন, চলমান কোনো কারখানা গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে বন্ধ হয়নি। আপনাদের খাতের পরিপ্রেক্ষিতে এই মন্তব্য কতটা সত্য?
আবদুর রাজ্জাক: মন্ত্রীর এ কথায় আমরা খুশি না। তিনি তাঁর মতো বলেছেন। কিন্তু উদ্যোক্তাদের যে বিদ্যুতের অভাবে কী ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে, তা তিনি জানেন না। লোডশেডিংয়ের কারণে উদ্যোক্তাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। প্রতিদিন সাত থেকে আট ঘণ্টা বিদ্যু থাকে না। এতে কারখানাগুলোতে উপাদন অনেক ক্ষেত্রেই বন্ধ থাকে। নবাবপুরে এমনও কারখানা আছে, যেখানে লোডশেডিংয়ের কারণে জেনারেটর চালাতে প্রতিদিন সাত থেকে আট হাজার টাকার ডিজেল খরচ হচ্ছে। বিদ্যুতের অভাবে অনেক কারখানায় উপাদন বন্ধ থাকে। এভাবে আমরা পুঁজি হারাচ্ছি। কর্মচারীদের অনেক ক্ষেত্রেই বসিয়ে বসিয়ে বেতন দিতে হচ্ছে। কিন্তু তাঁদের বাদ দেওয়াও যাচ্ছে না। বিদ্যুতের অভাব দেখে অনেক উদ্যোক্তাই আগ্রহ থাকার পরও এ খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন না।
প্রথম আলো: কৃষি ও রপ্তানি বাদে সব ধরনের ঋণের সুদের হারের ঊর্ধ্বসীমা তুলে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই সিদ্ধান্ত প্রকৌশল খাতসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোপাদনে কীভাবে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন?
আবদুর রাজ্জাক: হালকা প্রকৌশল খাতে ব্যাংকের বিনিয়োগ খুব কম। আমরা সব সময় ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারি না। তা ছাড়া স্থানের অভাবে বড় পরিসরে কারখানা স্থাপন করতে না পারায় উদ্যোক্তারাও ঋণ নিতে চান না। ঋণ নিয়ে যন্ত্রপাতি কিনে তা বসাবেন কোথায়? তাই সুদের হার বাড়া-কমায় সরাসরি কোনো প্রভাব আমাদের খাতে নেই। তবে সার্বিকভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের উদ্যোক্তারা এই সিদ্ধান্তে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
প্রথম আলো: সরকারের কাছ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে কী কী নীতি-সমর্থন প্রত্যাশা করেন?
আবদুর রাজ্জাক: আমরা হালকা প্রকৌশলশিল্পের উদ্যোক্তারা সরকারের কাছে কোনো প্রণোদনা চাই না। তবে চারটি বিষয়ে পদক্ষেপ চাই। প্রথমত, এ খাতের জন্য শিল্প অবকাঠামো অর্থা আলাদা জায়গায় শিল্পপার্ক প্রয়োজন। শিল্পমন্ত্রী কয়েক দফা এ বিষয়ে আমাদের আশ্বাস দিলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখিনি; দ্বিতীয়ত, এ খাতের নতুন প্রযুক্তি আনতে বিনিয়োগের জন্য আর্থিক সুবিধা পাওয়া; তৃতীয়ত, প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ জনবল তৈরিতে প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করা; চতুর্থত, নিরবচ্ছিন্নভাবে সরকারের কাছ থেকে নীতি সহায়তা প্রয়োজন।
সাক্ষাকার নিয়েছেন আবুল হাসনাত

No comments

Powered by Blogger.