দুই দলের রাজনৈতিক জমিদারি চলছে দেশে

বাংলাদেশে এখন দ্বি-দলীয় শাসনব্যবস্থা চলছে। এটা গণতন্ত্র নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা আইনে একে গণতন্ত্র বলে না। এটা হলো দুই দলের রাজনৈতিক জমিদারি। গতকাল শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে মুক্তচিন্তা ফোরাম আয়োজিত একক বক্তৃতা অনুষ্ঠানে সংবিধান প্রণেতা ও গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন এ অভিযোগ করেন।


পাশাপাশি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে আরো দুই মেয়াদের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থাকা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
পঞ্চম সংশোধনীর ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের প্রসঙ্গ টেনে কামাল হোসেন বলেন, আদালতের সংক্ষিপ্ত রায়ে দুই টার্ম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু ১৬ মাস পরে পূর্ণাঙ্গ রায় ঘোষণা হওয়ার আগেই সরকার তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আরো দুই মেয়াদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থাকা উচিত।
ড. কামাল বলেন, 'হঠাৎ করে বলা হলো- তত্ত্বাবধায়ক সরকার অবৈধ। আমাকে এমন একজন খুঁজে দেখান যিনি ২০০৮ সালে বলেছেন- তত্ত্বাবধায়ক সরকার অসাংবিধানিক। সেই সরকারের নির্বাচন মেনে নেওয়া হয়েছে। অথচ পরে বলা হলো- ওই ব্যবস্থা অসাংবিধানিক।'
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রস্তাব প্রসঙ্গ টেনে ড. কামাল বলেন, 'আওয়ামী লীগ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চায়, কিন্তু এই সরকারের অর্থ কী, এর সংজ্ঞা কী, তা আমি নিজেই বুঝি না।' তিনি বলেন, কোন দল কী চাইল সেটা কোনো ব্যাপার নয়। দেশের মালিক যদি জনগণই হয়, তাহলে জনগণ যেটা চাইবে, সেটাই হবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থায় যদি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতিনিধিত্বও থাকে তাহলেও তিনি এর বিরোধী- এ কথা জানিয়ে দেশের এই প্রখ্যাত আইনজীবী প্রশ্ন রাখেন, দেশটা কি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল? এটা কি দ্বিদলীয় গণতন্ত্র? রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা আইনে এই গণতন্ত্রের কোনো উল্লেখ নেই। কোনো দল যদি নিজেদের দেশ বা ক্ষমতার একমাত্র মালিক ভাবে, তাহলে সেটা অসাংবিধানিক।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রসঙ্গে ড. কামাল আরো বলেন, বাংলাদেশে নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের মিডিয়া ক্যু করার উদাহরণ আছে ১৯৮৬ সালে। আবার ১৫ ফেব্রুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনও মানুষ দেখেছে।
ড. কামাল বলেন, 'আমরা চাই টাকা, অস্ত্র আর পেশিশক্তিমুক্ত নির্বাচন। একটা দল বলছে- তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থায় আর নির্বাচন হবে না। অন্য দলের জেদ- তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া নির্বাচন হতে দেবে না। কেউ কেউ বলছেন, দুই দলকে একসঙ্গে বসতে হবে। অথচ ক্ষমতার মালিক জনগণ কী চায়, তা কেউই চিন্তা করছেন না।' আবারও এক-এগারোর মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে এবং এই প্রক্রিয়ায় তাঁর সংশ্লিষ্টতা আছে- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার করা এমন মন্তব্যের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে কামাল হোসেন বলেন, এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, সে ব্যবস্থা তাদেরই করতে হবে। তাঁর প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ইঙ্গিত প্রসঙ্গে তিনি এ ক্ষেত্রে নিজেকে ভাগ্যবান দাবি করে বলেন, 'দেশের প্রধানমন্ত্রী বারবার আমাকে নিয়ে কথা বলছেন; এটা অনেক বড় ব্যাপার।'
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার স্বচ্ছতার সঙ্গে করার ওপরও জোর দেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার এই সদস্য বলেন, বঙ্গবন্ধু এই বিচারের ঘোষণা দিলেও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বিভিন্ন শক্তি ক্ষমতায় থাকায় এই বিচার শুরু হয়েছে অনেক দেরি করে।
যুদ্ধাপরাধের বিচার ব্যাহত করার কোনো ষড়যন্ত্র হলে তা প্রকাশ করতে সরকারকে অনুরোধ জানিয়ে ড. কামাল বলেন, সরকারপক্ষের আইনজীবীরা অনেক কিছু দাবি করেছেন। সুষ্ঠু বিচারের জন্য এসব দাবি পূরণ করতে হবে সরকারকে।
তবে যুদ্ধাপরাধীদের যেনতেনভাবে দোষী সাব্যস্ত করে তাদের বিচার যাতে করা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখার অনুরোধ জানিয়ে ড. কামাল বলেন, 'আমরা আইনের শাসনে বিশ্বাস করি। যেনতেনভাবে শাস্তি দিলে তো এটা প্রথমেই দেওয়া যেত।'
সম্প্রতি রামুতে বৌদ্ধবিহারে হামলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ড. কামাল এর জন্য সংসদীয় তদন্ত দাবি করেন। তিনি বলেন, প্রথম তদন্ত সংসদের করা উচিত। সংসদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ডেকে জিজ্ঞাসা করবে- তিনি কী আদেশ দিয়েছিলেন? এই আদেশ কক্সবাজারে কয়টায় পৌঁছেছিল? কক্সবাজার থেকে রামুতে এটা কার্যকর করতে কত সময় লেগেছিল?
মুক্তচিন্তা ফোরামের আহ্বায়ক আশীষ কুমার সেনের সভাপতিত্বে একক এই বক্তৃতা অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. পিয়াস করিম, মুক্তচিন্তা ফোরামের সমন্বয়ক আমিরুল মোমেনিন মানিক প্রমুখ।

No comments

Powered by Blogger.