ষড়যন্ত্র চলবে, রুখতে হবে আওয়ামী লীগকেই by আবদুল মান্নান

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন, ওয়ান-ইলেভেনের মতো আবার অনির্বাচিতদের ক্ষমতায় আনার ষড়যন্ত্রসহ নানা ‘খেলা’ চলছে । বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, দেশের


বৃহত্তম রাজনৈতিক দল, দেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, বাঙালী জাতিকে উপহার দিয়েছে বঙ্গবন্ধুর মতো একজন কালজয়ী নেতা, এটি একটি ঐতিহাসিক সত্য । ১৯৫৪ সালে প্রথমবার তৎকালীন পূর্ব বাংলায় যুক্তফ্রন্টের শরীক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ প্রাদেশিক সরকারের অংশ হয়েছিল । যুক্তফ্রন্টে আরও ছিল, কৃষক শ্রমিক পার্টি, গণতন্ত্রী দল ও নেজামে ইসলামী । যুক্তফ্রন্ট নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছিল এবং নির্বাচনে মুসলিম লীগের মতো পরম পরাক্রমশালী রাজনৈতিক দলকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেছিল । বিজয়ের পর ১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট পূর্ব বাংলায় প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা গঠন করে। সেই নির্বাচনে ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট লাভ করেছিল ২২২ টি । পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠীর কাছে এটি কল্পনাতীত ছিল যে দেশ ভাগের এত কম সময়ের মধ্যে পাকিস্তান আন্দোলনের একক রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ পূর্ব বাংলায় যুক্তফ্রন্টের কাছে পরাজিত হবে। শুরু হলো হরেক রকমের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র। কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়তায় পূর্ব বাংলায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য প্রণয়ন করা হয় বিভিন্ন পরিকল্পনা । প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা গঠনের কয়েক সপ্তাহ আগে প্রথমে খুলনা ম্যাচ ফ্যাক্টরিতে শ্রমিক সংঘর্ষ এবং পরে কর্ণফুলী কাগজ কলে বাঙালী-অবাঙালী দাঙ্গার সূত্রপাত ঘটে । সরকার গঠনের এক মাসের মাথায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সংঘটিত হলো পূর্ব পরিকল্পিত বাঙালী-অবাঙালী দাঙ্গা । এর রেশ ধরেই কয়েকদিনের মাথায় প্রথমে দেশের বিভিন্ন জেলায় শুরু হলো বাঙালী-অবাঙালী এবং পরে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। দাঙ্গায় অনেক নিরীহ মানুষ প্রাণ হারায় । দাঙ্গা-হাঙ্গামার সঙ্গে যুক্ত হয় সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় তীব্র ভারতবিরোধী প্রচারণা। এত ষড়যন্ত্রমূলক ঘটনা ঘটিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার জনগণকে এ কথাটিই বোঝাতে চেয়েছে যে পাকিস্তানে একমাত্র মুসলিম লীগ সরকারই সুষ্ঠুভাবে দেশ শাসন করতে পারে । পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, সে সময় যুক্তফ্রন্টের কোন শরিক দল কেন্দ্রীয় সরকারের এসব ষড়যন্ত্র কার্যকরভাবে মোকাবেলা করতে পারেনি। কেন্দ্রীয় সরকার ও মুসলিম লীগ সৃষ্ট এসব ষড়যন্ত্রের কারণে দেশে এক চরম অরাজক অবস্থার সৃষ্টি হয় । এই প্রেক্ষাপটে ৩০ মে, ১৯৫৪ সালে কেন্দ্রীয় সরকার ফজলুল হক মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করে এবং পূর্ব বাংলায় গবর্নরের শাসন জারি করে । একই সঙ্গে গ্রেফতার করা হলো শেখ মুজিবসহ যুক্তফ্রন্টের প্রাদেশিক পরিষদের ত্রিশ সদস্যকে। ফজলুল হক মন্ত্রিসভার মেয়াদ ছিল মাত্র ৪৮ দিন।
সত্তরের নির্বাচনের পূর্বে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ষড়যন্ত্রটি ছিল ১৯৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন করার জন্য শেখ মুজিব আগরতলায় বসে ষড়যন্ত্র করেছেন এই অভিযোগে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়। ঢাকা সেনানিবাসে শুরু হয় বিশেষ ট্রাইব্যুনালে তাঁর এবং তাঁর সঙ্গীদের বিচার। কিন্তু আইউব খানের সেই ষড়যন্ত্র ভেস্তে যায় ছাত্রজনতার ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের তোড়ে ।
সত্তরের নির্বাচনের পর এটি প্রত্যাশিত ছিল যে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আওয়ামী লীগই কেন্দ্রে সরকার গঠন করবে। কিন্তু অনেকটা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের অগোচরেই কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের সরকার গঠনের বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক আমলা গোষ্ঠী, জুলফিকার আলী ভুট্টো আর ইয়াহিয়া খানের সমন্বিত প্রচেষ্টা শুরু হয়ে যায়। মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর মতো নেতা পর্যন্ত বুঝতে পারেননি বাঙালী আর আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নানা রকমের ষড়যন্ত্র হচ্ছে । যখন বুঝতে পারলেন তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে । নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের সময়ও মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ ও বানচাল করতে কলকাতায় বসে বিরাট এক ষড়যন্ত্রের জাল পেতেছিল আওয়ামী লীগেরই ঘরের লোক খোন্দকার মোশতাক । মোশতাক কলকাতায় মার্কিন কন্স্যাল জেনারেলের মাধ্যমে পাকিস্তানের সামরিক জান্তার কাছে এই সংবাদ পাঠাতে চেয়েছিলেন যে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিলে মুক্তিযুদ্ধ বন্ধ করা হবে এ প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের বিচক্ষণতার কারণে মোশতাকের সেই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হতে পারেনি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকার গঠন করার পর পরই শুরু হয়ে গিয়েছিল তাঁর নিজের এবং সরকারের বিরুদ্ধে নানামুখী ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রের প্রধান শক্তি ছিল চীনপন্থীদের একটি অংশ, যার নেতৃত্বে ছিলেন আবদুল হক, তোহা, আলাউদ্দিন আর সিরাজ সিকাদারের মতো হঠকারী অতি বামপন্থীরা। তাদের সঙ্গে শামিল হয়েছিল একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী পলাতক জামায়াত আর আলবদরদের একটি বিরাট অংশ । আবদুল হক চিঠি লিখে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোকে, যিনি কিনা সত্তর আর একাত্তরের ষড়যন্ত্রেও একজন বড়মাপের খলনায়ক ছিলেন তার কাছে বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাত করার জন্য অস্ত্র ও অর্থ চেয়ে পত্র লিখেছিলেন। ভুট্টো এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে তাঁর কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ সময় গঠিত হয়েছিল বাংলাদেশের প্রথম সরকারবিরোধী দল জাসদ যারা শুরুতে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নাম করে অনেক প্রতিভাবান তরুণকে বিভ্রান্ত করেছিল। শুরুতে জাসদের নাম ছিল এনএসডি (ঘধঃরড়হধষ ঝড়পরধষরংঃ চধৎঃু)। বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সারাদেশে শুরু হয়ে গিয়েছিল বিভিন্ন ধরনের নাশকতামূলক কর্মকা- । আজ এই পাটকল বা পাটের গুদামে আগুন তো কাল কোন একটি বিদ্যুত উৎপাদন কেন্দ্রে বিস্ফোরণ । আশুগঞ্জ সার কারখানার কন্ট্রোল রুমে এক ভয়াবহ বিস্ফোরণে শুধু কারখানাটিরই মারাত্মক ক্ষতি হলো না নিহত হলো সদ্য স্বাধীন দেশের বেশ কয়েক মেধাবী প্রকৌশলী । বন্ধ হয়ে গেল দেশের জন্য এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারখানাটি । বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানোর চেষ্টা করা হয়েছে । বাহাত্তর সালে শারদীয় দুর্গোৎসবের সময় চট্টগ্রামের বিভিন্ন পূজাম-পে হামলা চালান হয় ।
১৯৭৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রে বাংলাদেশে সৃষ্টি হলো এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। সৃষ্টি করা হলো মাছধরার জাল পরা বাসন্তী নামের এক চরিত্র শুধু এটি বোঝানোর জন্য যে বঙ্গবন্ধু সরকারের পক্ষে বাসন্তীর মতো একজন নিম্নবিত্ত মহিলাকে তার আব্রু ঢাকার জন্য একটুকরা কাপড় দেয়ার মতো মুরোদ নেই । পরে সেই ফটোগ্রাফার নিজে স্বীকার করেছেন বাসন্তী ছিল রংপুরের মানসিক ভারসাম্যহীন একজন অপ্রকৃতিস্থ মহিলা। কিছু অর্থের বিনিময়ে সেই ফটোগ্রাফার সেই ছবি তুলেছিলেন শ্রেফ বঙ্গবন্ধু আর তাঁর সরকারকে জনসমক্ষে হেয় করার জন্য । ১৯৭৪ সালে বিএনপির বর্তমান ডাকসাইটে নেতা ড. আবদুল মইন খানের পিতা আবদুল মোমেন খান ছিলেন বঙ্গবন্ধু সরকারের খাদ্য সচিব। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির পেছনে তার একটা বিরাট ভূমিকা ছিল। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর ১৯৭৫ সালের ৩ নবেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করা হয়। ৭ নবেম্বর জেনারেল জিয়া মোশতাককে ক্ষমতাচ্যুত করে ওই দিনই একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছিলেন। ওই উপদেষ্টা পরিষদে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছিলেন সেই আবদুল মোমেন খানকেই। বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবদ্দশায় অনেক সময় শত্রু-মিত্র চিনতে ভুল করেছেন। এদের অনেকেই স্বেচ্ছায় বঙ্গবন্ধুর রক্তাক্ত লাশের ওপর দিয়ে মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন। অনেক সময় মনে হয় বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনারও এই দুর্বলতা আছে এবং তিনি সব সময় ছদ্মবেশী বন্ধুদের প্রভাবমুক্ত থাকতে পারেন না।
স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সব চেয়ে বড় ষড়যন্ত্রটা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার। এই প্রসঙ্গে তাঁকে দেশের বাইরের কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা সতর্ক করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু বিষয়টাকে তেমন কোন গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। নিজের জীবন দিয়ে তাঁকে তার মূল্য দিতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য নানামুখী ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাসনে থাকতে বাধ্য করা হয়েছে। ১৯৮১ সালে তিনি দেশে ফিরে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করেছেন। ১৯৮৬ সালে এরশাদের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলে আওয়ামী লীগকে ষড়যন্ত্র করে মিডিয়া ক্যুর মাধ্যমে হারানো হয়েছে ।
একানব্বইয়ের পরাজয়ের পেছনে যেসব কারণ কাজ করেছে তার মধ্যে ছিল দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ভুগছিল এক ধরনের অতিমাত্রার আত্মপ্রত্যয়ে (ড়াবৎপড়হভরফবহপব) আর তার সঙ্গে ছিল বিদেশী অর্থ। এ সময় পাকিস্তানের আইএসআই এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে পরাজিত করার জন্য বিরাট অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছে বলে জানা যায়। এসবের সঙ্গে যোগ হয়েছিল জামায়াতের সঙ্গে কমপক্ষে একশ’টি আসনে বিএনপির গোপন আঁতাত। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় খুব সহজ ছিল না। নির্বাচনের সময় দল হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ হিসেবে জামায়াত-বিএনপি তো ছিলই তার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল প্রগতিশীল শক্তির একটি অংশ। এরা অনেক আসনে নিজেরা প্রার্থী দিয়েছিল এবং আওয়ামী লীগবিরোধী প্রচারণায় অংশ নিয়েছিল। আওয়ামী লীগকে সে সময় সরকার গঠন করতে হয়েছিল আসম আবদুর রবের জাসদ ও এরশাদের জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে।
২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় না পাওয়াটাও অনেকের কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে এটি পরিষ্কার ছিল যে সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যাতে বিজয়ী হতে না পারে তার জন্য চতুর্মুখী ষড়যন্ত্রের জাল বিছানো হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে শেখ হাসিনা বিচারপতি সাহাবুদ্দীনকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দিলে সকলে বেশ বাহ্বা দিয়েছিলেন। এটি ছিল শেখ হাসিনার একটি বড়মাপের উদারতা এবং একই সঙ্গে একটি কৌশলগত ভুল। আমার কখনও মনে হয়নি সাহাবুদ্দীন সময়ের প্রয়োজনে ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিতে এগিয়ে আসবেন। ১৯৯৭ সালের ফ্রেব্রুয়ারি মাসে দেশের সকল সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সংগঠন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত করতে যায়। আমি তখন এই পরিষদের চেয়্যারম্যান। ঠিক আগের দিন বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে নি¤œ আদালতে সরকার একটি দুর্নীতির মামলা দায়ের করে। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আমাদের সামনেই এই মামলার বিষয়ে তাঁর তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এবং বলেন এই সময় সরকারের এই মামলা করা উচিত হয়নি। তখনই বোঝা গিয়েছিল প্রয়োজনের সময় তিনি শেখ হাসিনা সরকারের কোন কাজে আসবেন না। ঠিক তেমনটি হয়েছিল ২০০১ সালের নির্বাচনের সময়। সাহাবুদ্দীন-লতিফুর রহমান-আবু সাঈদ সকলেই ছিলেন অনেকটা শেখ হাসিনার কৃপাধন্য। আবু সাঈদকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার করার পেছনে অন্যতম যুক্তি ছিল তাঁর বাড়ি গোপালগঞ্জে। শেখ হাসিনার শুভাকাক্সক্ষীরা অন্তত তাই মনে করেন। গোপালগঞ্জে বাড়ি হলেই সকলে বঙ্গবন্ধু হন না এই কথাটি সব সময় অনেকের মনে থাকে না। শেখ হাসিনাকে যে ব্যক্তিটি হত্যা করার জন্য একাধিকবার পরিকল্পনা করেছিল সেই মুফতি আবদুল হান্নানের বাড়িও কিন্তু গোপালগঞ্জে। প্রশাসনের অন্দরমহলে এখনও অনেক আবু সাঈদ আছেন যাঁরা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় না থাকলে স্বমূর্তিতে আবির্ভাব ঘটবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ২০০১ সালের নির্বাচনের পূর্বে দেশের সকল মিডিয়াই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অনেকটা যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এটি অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে আওয়ামী লীগ কখনও মিডিয়াকে তার কাছে রাখতে পারেনি অথচ ১৯৯৬ সালের পর হতে আওয়ামী লীগ যখনই সরকার গঠন করেছে সব সময় মিডিয়া নানাভাবে লাভবান হয়েছে। একজন সিনিয়র সাংবাদিক বর্তমান সরকারের আমলে একটি টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স পাননি বলে প্রতিরাতে বিভিন্ন টিভি টকশোতে এসে শেখ হাসিনা এবং তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন। তাঁকে ওই লাইসেন্সটা দিয়ে দিলে সরকারের তেমন কোন ক্ষতিবৃদ্ধি হতো না যদিও ওই সাংবাদিককে সামনে রেখে ওই টিভির চ্যানেলের আবেদনের পেছনে ছিলেন হাওয়া ভবন ঘনিষ্ঠ একজন ব্যবসায়ী।
২০০১-০৬ মেয়াদকালের বিএনপি-জামায়াত জোটের দুঃশাসনের ফলে এটি অবধারিত ছিল যে সেই নির্বাচনে তাদের বিজয়ের কোন সম্ভাবনা নেই। আওয়ামী লীগকে ঠেকাতে আবার ষড়যন্ত্র। সে ষড়যন্ত্রে তখন আওয়ামী লীগ পা দেয়নি ঠিক তবে পা দিয়েছিল ফখরুদ্দীন মঈনুদ্দিনের পাতা ফাঁদে। তিন মাসের সাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার যখন দুই বছর ক্ষমতায় থেকে গেল তখন তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের পক্ষে কোন আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। কারণ শেখ হাসিনাসহ তখন দলের সকল গুরুত্বপূর্ণ নেতা কারাগারে। দলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদকসহ ক’জন আবার দেশের বাইরে নিরাপদ অবস্থানে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ছাত্রলীগেরই একটি আন্দোলন গড়ে তোলার কথা কিন্তু ছাত্রলীগ নামধারী বর্তমানে এবং সে সময় যারা ছিল তাদের সেই ক্ষমতা ছিল না। কারণ তাদের নৈতিক স্খলন হয়েছে অনেক আগেই।
আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে নানামুখী ষড়যন্ত্র যে শুরু হয়েছে তা তো এখন পরিষ্কার। দুর্নীতির সম্ভাবনা আছে সেই অভিযোগে বিশ্বব্যাংক কর্তৃক পদ্মাসেতুর অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়ে সম্ভবত এই দফার ষড়যন্ত্রের যাত্রা শুরু। বিশ্বব্যাংকের একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টিম এই দুর্নীতি বিষয়ে দুদকের সঙ্গে প্রাথমিক সলাপরামর্শ করে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গেছে। বর্তমান সরকারের আমলে সেই অর্থ আদৌ পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে যদিও অর্থমন্ত্রী আশাবাদী। মধ্যরাতের কিছু কিছু টকশো শুনলে মনে হবে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় ফিরলে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটার আর অস্তিত্ব থাকবে না। জামায়াত দু’হাতে টাকা ছড়াচ্ছে চলমান মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার বানচাল করার জন্য।
২০০১ সালের নির্বাচনের পূর্বেও টিআইবি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। এবার তারা তা করল যখন বিশ্বব্যাংকের একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টিম পদ্মাসেতুর কথিক দুর্নীতির বিষয়ে দুদকের সঙ্গে কাজ করতে এসেছে। টিআইবি’র ‘গবেষণালব্ধ’ প্রতিবেদন প্রকাশ করার সময়টাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। টিআইবি আর তার সদস্যদের আবার আমরা কুলীন ব্রাহ্মণের মর্যাদা দিয়ে থাকি। মাঝে মাঝে তারা অনেক ভাল কাজ করেন তবে তাদের সব কাজ সমালোচনার উর্ধে নয়। ইতোমধ্যে টিআইবির চেয়ারপারসন তাদের ‘গবেষণার’ একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এটি গ্রহণ করা না করা সম্পূর্ণভাবে পাঠক বা সংসদ সদস্যদের ব্যাপার। এটি ঠিক, সব সংসদ সদস্য ধোয়া তুলসীপাতা নয়।
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলবে। তার বিরুদ্ধে সচেতন হওয়া এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলা দলের দায়িত্ব আর তা করতে হলে দলকে আরও বেশি কার্যকর করে তুলতে হবে। দলের এবং সভানেত্রীর শত্রু আর মিত্রদের চিহ্নিত করতে না পারলে বিপদ অনিবার্য। আগামী ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন। দলকে শক্তিশালী করার এটি একটি বড় সুযোগ। আশা করা যায় শেখ হাসিনা এই সুযোগটা কাজে লাগাবেন। শুধু ষড়যন্ত্র ষড়যন্ত্র বলে চিৎকার করলে ষড়যন্ত্র থেমে থাকবে না। এই দফায় ষড়যন্ত্রকারীরা সফল হলে দেশে অনেকগুলো ১৯৭১-এর ১৪ ডিসেম্বর সংঘটিত হবে আর কয়েক লাখ মানুষ হয়ত আবার উদ্বাস্তু হবে।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক। অক্টোবর ১৮, ২০১২

No comments

Powered by Blogger.