সম্মাননা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী-যুদ্ধাপরাধের বিচারে জাতীয় সমঝোতার পথ খুলবে

মুক্তিযুদ্ধে অনন্য অবদান রাখা আরো ৬১ জন বিদেশি বন্ধুকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা দিল বাংলাদেশ। গতকাল শনিবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা


কৃতজ্ঞতার সঙ্গে বিদেশি বন্ধু ও তাঁদের প্রতিনিধিদের হাতে সম্মাননা স্মারক ও সাইটেশন তুলে দেন। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্যে বলেন, বিদেশি বন্ধুদের অবদান অমূল্য। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী বিদেশি বন্ধুদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের চলমান বিচার প্রসঙ্গে বলেছেন, এ বিচার জাতীয় সমঝোতার পথ খুলে দেবে।
মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে অনন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে গতকাল ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আই কে গুজরাল এবং নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গিরিজা প্রসাদ কৈরালাকে 'বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা' দেওয়া হয়। এ ছাড়া আরো ৫৯ জন বিদেশি বন্ধু পেয়েছেন 'মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা'।
সম্মাননা পাওয়া বিদেশি বন্ধুদের মধ্যে আছেন মুক্তিযুদ্ধকালীন বিবিসির সাংবাদিক মার্ক টালি, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া ভারতের সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অশোক তারা বীর চক্র। ভারতীয় কবি প্রয়াত কাইফি আজমীর পক্ষে সম্মাননা নেন বিশিষ্ট অভিনেত্রী ও সমাজকর্মী শাবানা আজমী।
রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান বলেন, 'মুক্তিযুদ্ধের সময় যেসব বিদেশি বন্ধু তাঁদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে আমাদের সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়েছেন আজ আমি তাঁদের অনন্য অবদানের কথা স্মরণ করছি।' বিদেশি বন্ধুদের উদ্দেশে তিনি বলেন, 'আপনাদের অপরিসীম অবদানের কথা চিরদিন আমাদের হৃদয়ে থাকবে। আমি বিশ্বাস করি, আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় বন্ধু হিসেবে আপনাদের সমর্থন ও সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।'
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যে বলেন, 'যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হচ্ছে।' তিনি আরো বলেন, 'আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইতিহাসের একটি অপ্রিয় অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটবে এবং আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে। জাতীয় সমঝোতার পথ উন্মুক্ত করবে।'
মহান মুক্তিযুদ্ধে যেসব বিদেশি বন্ধু সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেন, 'আমরা তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ এবং চিরঋণী।' তিনি বলেন, 'আজ থেকে ৪১ বছর আগে বাঙালি জাতি যখন গণহত্যার শিকার হয়েছিল তখন আপনারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আপনাদের সেই সমর্থন প্রমাণ করেছিল যে আমাদের সংগ্রাম ছিল ন্যায্য। ন্যায়বিচার, মর্যাদা এবং সম্মান রক্ষার আর্তি আপনাদের কাছে পৌঁছেছিল।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমরা অতীতের সেই নীতির প্রতি আমাদের অবিচল আস্থা পুনর্ব্যক্ত করছি। সমতা, গণতন্ত্র, সুষম উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসন হচ্ছে আমাদের আদর্শ এবং নীতি।' তিনি বলেন, 'আমাদের সংবিধান প্রণয়নের সময়ও এসব আদর্শকে আমরা সমুন্নত রেখেছি। আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এসব আদর্শের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে তুলেছি। অতীতে অপরাধ করে শাস্তি না পাওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, আমরা তার অবসান ঘটিয়েছি। যেকোনো অপকর্মের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেছি।'
শেখ হাসিনা বলেন, পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সুষম উন্নয়ন সুনিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নারী-পুরুষ ও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সমতা বিধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এ বি তাজুল ইসলাম। অনুষ্ঠান পরিচালনা ও সম্মাননা পাওয়া বিদেশি বন্ধুদের সাইটেশন পাঠ করেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব এম মোশারফ হোসেন ভুঁইয়া। বিদেশি বন্ধুদের পক্ষে বক্তব্য দেন যুক্তরাষ্ট্রের সমাজসেবী জোয়ান এ ডাইন।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এ বছর ডিসেম্বর মাসে সম্মাননা জানানোর চতুর্থ পর্বের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে। গতকাল পর্যন্ত তিন দফায় মোট ১৩৮ জনকে সম্মাননা জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
বিদেশি বন্ধুরা গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি হোটেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আয়োজিত নৈশ ভোজে যোগ দেন। আজ রবিবার তাঁদের নৌবিহারে যাওয়ার কথা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এ বি তাজুল ইসলামও তাঁদের সম্মানে আজ সন্ধ্যায় নৈশ ভোজ আয়োজন করছেন। বিদেশি বন্ধুরা আগামীকাল সোমবার ঢাকা ছাড়তে শুরু করবেন।
'জয় বাংলা' স্লোগানের জবাব প্রধানমন্ত্রীর : বিদেশি বন্ধুদের সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠান শেষে দর্শক সারি থেকে একজনের 'জয় বাংলা' স্লোগানের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী। সম্মাননা অনুষ্ঠানের সমাপনী ঘোষণা শেষে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মঞ্চ থেকে বাইরে যাচ্ছিলেন। সে সময়ই দর্শক সারিতে বসা অতিথিদের একজন চিৎকার করে স্লোগান দেন 'জয় বাংলা'। তখন শেখ হাসিনা আবার দর্শকদের দিকে ফিরে ডান হাত উঁচু করে তুলে জবাব দেন 'জয় বাংলা'। এরপর দর্শকরাও বলেন 'জয় বাংলা'। শেখ হাসিনা এভাবে তিন বার স্লোগান দেন। এ ধরনের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী সচরাচর এভাবে দর্শকদের স্লোগানের জবাব দেন।

No comments

Powered by Blogger.